জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের বাড়তি দাম, আকাশছোঁয়া বাড়িভাড়া, দুর্বল শিক্ষাব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে ক্ষোভে ফুঁসছে ইউরোপের তরুণ প্রজন্ম। ফ্রান্সের রাজপথে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে ইতালি, পর্তুগাল, বেলজিয়াম, গ্রিস, স্পেন ও আলবেনিয়াসহ বিভিন্ন দেশে। কোথাও শিক্ষার্থীরা স্কুল-কলেজের দুরবস্থার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছেন, কোথাও আবাসন সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির বিরুদ্ধে গড়ে উঠেছে আন্দোলন। এর মধ্যেই ফ্রান্সের আদলে আগামী ৩১ অক্টোবর জার্মানির ২১টি শহরে একযোগে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে তরুণদের উদ্যোগ ‘জেন জি রেগেল্ট’ (Gen Z regelt)। বার্লিন, হামবুর্গ, মিউনিখ ও কোলনের মতো বড় শহরেও কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ফ্রান্স ও ইতালির সাম্প্রতিক সহিংসতার অভিজ্ঞতায় জার্মানির নিরাপত্তা সংস্থাগুলোও পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চলমান বিক্ষোভগুলোর মধ্যে এখনো কোনো একক নেতৃত্ব বা অভিন্ন সাংগঠনিক কাঠামো নেই। তবে মূল্যস্ফীতি, আবাসন সংকট, সরকারি ব্যয় সংকোচন, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের ঘাটতি এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ—এসব ইস্যু আন্দোলনগুলোর মধ্যে এক ধরনের অভিন্ন ক্ষোভ তৈরি করেছে।
ফ্রান্সে উত্তেজনা, শনিবারের কর্মসূচি ঘিরে কড়া নিরাপত্তা
ইউরোপের চলমান অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ফ্রান্স। প্রথমে স্কুলের অব্যবস্থাপনা, শিক্ষকসংকট ও জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হলেও পরে তাতে যুক্ত হয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি, জ্বালানির দাম, বৈষম্য ও সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ।
গত ১৭ অক্টোবর দেশজুড়ে বিক্ষোভের দিন ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন। আয়োজকদের দাবি ছিল, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা আরও বেশি। বেশ কয়েকটি স্থানে বিক্ষোভের একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশকে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করতে হয় এবং বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘাত হয়।
বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর প্যারিসে নতুন করে বিক্ষোভ ঘিরে উত্তেজনা দেখা দেয়। এর আগে পুলিশের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞা প্রশাসনিক আদালত বাতিল করলে ব্যাপক পুলিশি উপস্থিতির মধ্যে বিক্ষোভকারীরা সমবেত হন। আন্দোলনটি শিক্ষার্থীদের দাবি ছাড়িয়ে এখন বৃহত্তর জীবনযাত্রার সংকটের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। আগামী শনিবার, ২৪ অক্টোবর শ্রমিক সংগঠন ও ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনকারীদের নতুন কর্মসূচি ঘিরেও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে প্রশাসন।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর সরকার সহিংসতার জন্য উগ্রপন্থি গোষ্ঠী ও সুযোগসন্ধানী লুটেরাদের দায়ী করছে। অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক দুর্দশা ও শিক্ষা খাতের সমস্যার সমাধানে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে নিরাপত্তা জোরদার করেও পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
জার্মানিতে ২১ শহরে একই দিনে কর্মসূচি
ফ্রান্সের পরিস্থিতির মধ্যেই জার্মানিতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে তরুণদের আন্দোলন। ‘জেন জি রেগেল্ট’ উদ্যোগের ঘোষণায় বলা হয়েছে, আগামী ৩১ অক্টোবর শনিবার স্থানীয় সময় বেলা ২টা থেকে দেশের ২১টি শহরে একযোগে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হবে। বার্লিন, ফ্রাঙ্কফুর্ট, হামবুর্গ, মিউনিখ ও কোলনসহ বড় শহরগুলোতে কর্মসূচির মূল আয়োজন করবে উদ্যোগটি; অন্য শহরগুলোতে স্থানীয় সংগঠন ও সহযোগী গোষ্ঠীগুলো যুক্ত রয়েছে।
আন্দোলনকারীদের দাবির তালিকায় রয়েছে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষা ও সামাজিক খাতে বাজেট কাটছাঁট বন্ধ, সাশ্রয়ী জীবনযাত্রা নিশ্চিত করা, সামাজিক বৈষম্য কমানো, স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, জলবায়ু সুরক্ষা এবং বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার বিরোধিতা।
আয়োজকদের বক্তব্য, তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, অথচ সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তাদের মতামত যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, আবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্নে তরুণদের দাবি উপেক্ষিত হলে প্রতিবাদ আরও বিস্তৃত হতে পারে বলেও তাদের অবস্থান থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
তবে ৩১ অক্টোবরের কর্মসূচিতে ঠিক কত মানুষ অংশ নেবেন, তা এখনো নিশ্চিত নয়। আয়োজকদের ওয়েবসাইটে অংশগ্রহণের আগ্রহ ও নিবন্ধনের হিসাব দেখানো হলেও, সেটিকে চূড়ান্ত উপস্থিতির সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
সহিংসতার আশঙ্কা, সতর্ক জার্মান পুলিশ
ফ্রান্সের বিক্ষোভে ভাঙচুর ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের দৃশ্য জার্মানির নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর উদ্বেগ বাড়িয়েছে। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে সম্ভাব্য কর্মসূচির বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় চলছে। উগ্রপন্থি গোষ্ঠী যেন শান্তিপূর্ণ সমাবেশকে নিজেদের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
জার্মান ফেডারেল পুলিশের ইউনিয়ন জিডিপির প্রধান আন্দ্রেয়াস রসকপফ সতর্ক করে বলেছেন, বিক্ষোভের মধ্যে উগ্রপন্থিরা ঢুকে পুলিশকে আক্রমণ বা ভাঙচুরের চেষ্টা করলে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় পুলিশ কঠোর ও সিদ্ধান্তমূলক ব্যবস্থা নেবে। তবে আয়োজক উদ্যোগটি তাদের ওয়েবসাইটে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তারা ব্যক্তি বা সম্পত্তির বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের সহিংসতার বিরোধী।
অর্থাৎ, জার্মানিতে বড় সমাবেশের প্রস্তুতি থাকলেও ফ্রান্সের মতো সহিংসতা ঘটবেই—এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই। বরং প্রশাসনের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার বজায় রেখে সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা ঠেকানো।
গ্রিসে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
ফ্রান্সের বাইরে গ্রিসেও অর্থনৈতিক চাপ ও শিক্ষা খাতের সমস্যা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে। গত ২১ অক্টোবর রাজধানী অ্যাথেন্সসহ বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। তাদের দাবির মধ্যে ছিল জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা, শিক্ষায় সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের জন্য সাশ্রয়ী আবাসনের সুযোগ বাড়ানো।
শিক্ষকদের ধর্মঘট ও শিক্ষার্থীদের সমাবেশে সরকারি সহায়তার অপ্রতুলতা এবং পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি আর্থিক চাপের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। পুলিশের উপস্থিতিতে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হলেও সম্ভাব্য উত্তেজনার আশঙ্কায় কিছু এলাকায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও সতর্কতা অবলম্বন করে।
গ্রিসের আন্দোলনকারীদের একাংশ ফ্রান্সের বিক্ষোভের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করলেও দেশ দুটির আন্দোলনের সাংগঠনিক কাঠামো এক নয়। তবে শিক্ষা ও জীবনযাত্রার সংকট যে তরুণদের মধ্যে একই ধরনের অসন্তোষ তৈরি করছে, তা স্পষ্ট।
পর্তুগালে মাথাব্যথার কারণ আবাসন সংকট
পর্তুগালের রাজধানী লিসবনসহ বড় শহরগুলোতে আবাসন সংকট আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কারণ। বাড়িভাড়া ও বাড়ির দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে তরুণ ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য শহরে বসবাস ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কম মজুরি ও দৈনন্দিন ব্যয়ের চাপ।
লিসবনে সাম্প্রতিক বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীরা সাশ্রয়ী আবাসন, ন্যায্য মজুরি এবং উন্নত জীবনযাত্রার দাবি তোলেন। আবাসন সংকটের প্রতিবাদে তাঁবু স্থাপন করে অবস্থান কর্মসূচিও পালন করা হয়েছে। সরকারপক্ষ আন্দোলনের চাপে নতি স্বীকার না করার অবস্থান জানালেও বিক্ষোভকারীদের দাবি, বাস্তব সমস্যার সমাধানে দৃশ্যমান পদক্ষেপ প্রয়োজন।
ইতালি ও বেলজিয়ামেও রাজপথে ক্ষোভ
গত ১৭ অক্টোবর ইতালির মিলানে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি ও সরকারি সেবার সংকটের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। শুরুতে শান্তিপূর্ণ থাকলেও একপর্যায়ে কিছু এলাকায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, দোকানপাটে লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। বেলজিয়ামের লিয়েজেও বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে। এসব ঘটনা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
তবে সব বিক্ষোভের কারণ এক নয়। কোথাও শিক্ষা খাতের সংকট, কোথাও বাড়িভাড়া, কোথাও দুর্নীতি ও কর্মসংস্থানের অভাব আন্দোলনকে উসকে দিচ্ছে। আলবেনিয়ায় সরকারবিরোধী অসন্তোষের পেছনেও দুর্নীতির অভিযোগ, কর্মসংস্থানের সংকট এবং শিক্ষার মান নিয়ে ক্ষোভ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
স্পেনে আবাসন ও জীবনযাত্রার সংকট
স্পেনেও তরুণদের মধ্যে বাড়িভাড়া, আবাসনের অপ্রাপ্যতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। পর্যটননির্ভর শহরগুলোতে আবাসনের চাহিদা ও ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ দীর্ঘদিনের। সাম্প্রতিক ইউরোপীয় বিক্ষোভের ঢেউয়ে এই ক্ষোভ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তরুণদের একটি বড় অংশ মনে করছে, শিক্ষা শেষ করেও স্থিতিশীল চাকরি, সাশ্রয়ী বাসস্থান এবং আর্থিক নিরাপত্তা অর্জন আগের প্রজন্মের তুলনায় কঠিন হয়ে পড়েছে। এই হতাশা শুধু কোনো একটি সরকারের বিরুদ্ধে নয়; বরং ইউরোপের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
একক আন্দোলন নয়, ক্ষোভের বিস্তৃত বহিঃপ্রকাশ
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভের দৃশ্য কাছাকাছি হলেও এগুলোকে এখনই একক মহাদেশীয় আন্দোলন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দেশভেদে আয়োজক, দাবি, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং বিক্ষোভের ধরন আলাদা। তবে জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির দাম, আবাসন সংকট, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের ঘাটতি এবং সরকারি সেবার মান নিয়ে মানুষের অসন্তোষ একটি অভিন্ন সূত্র তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অভাব এই ক্ষোভকে আরও তীব্র করছে। ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের দাবি থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন যেভাবে বৃহত্তর জীবনযাত্রার সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, তা ইউরোপের অন্য দেশগুলোর সরকারের জন্যও সতর্কবার্তা।
এখন নজর ২৪ অক্টোবর ফ্রান্সের নতুন বিক্ষোভ এবং ৩১ অক্টোবর জার্মানির ২১ শহরের কর্মসূচির দিকে। জার্মানিতে এই কর্মসূচি কতটা বড় আকার ধারণ করে এবং তা শান্তিপূর্ণ থাকে কি না, সেটিই হবে আগামী দিনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তবে একটি বিষয় ইতিমধ্যেই স্পষ্ট—শুধু পুলিশি নিরাপত্তা দিয়ে ক্ষোভের বিস্তার থামানো কঠিন; মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সংকটের কার্যকর সমাধান না এলে ইউরোপের রাজপথে প্রতিবাদের চাপ আরও বাড়তে পারে।