উড়ন্ত বিমান থেকে লাফ দিয়ে উধাও! ২ লাখ ডলারের রহস্যে আজও অন্ধকার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

১৯৭১ সালের ২৪ নভেম্বর। যুক্তরাষ্ট্রের একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে চড়ে বসলেন স্যুট-টাই পরা এক ব্যক্তি। টিকিটে নাম লিখিয়েছিলেন ‘ড্যান কুপার’। উড়োজাহাজ

2026-10-22T15:38:54+00:00
2026-10-22T15:38:54+00:00
  বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬,
৬ কার্তিক ১৪৩৩
 
বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
উড়ন্ত বিমান থেকে লাফ দিয়ে উধাও! ২ লাখ ডলারের রহস্যে আজও অন্ধকার
প্যারাস্যুটে পালানো সেই ছিনতাইকারী বেঁচে ছিলেন, নাকি অন্ধকারেই শেষ হয়েছিল তাঁর জীবন?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৩৮ পিএম 
শিল্পীর কল্পনায় আঁকা ড্যান কুপারছবি: এফবিআই ওয়েবসাইট
১৯৭১ সালের ২৪ নভেম্বর। যুক্তরাষ্ট্রের একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে চড়ে বসলেন স্যুট-টাই পরা এক ব্যক্তি। টিকিটে নাম লিখিয়েছিলেন ‘ড্যান কুপার’। উড়োজাহাজ আকাশে ওঠার পর বিমানবালাকে জানালেন, তাঁর ব্রিফকেসে বোমা রয়েছে। দাবি করলেন ২ লাখ ডলার—সব নোট ২০ ডলারের—এবং চারটি প্যারাস্যুট।

কর্তৃপক্ষ তাঁর দাবি মেনে নিল। সিয়াটলে ৩৬ যাত্রীকে নামিয়ে দিয়ে উড়োজাহাজ আবার আকাশে উড়ল। এবার গন্তব্য মেক্সিকো সিটি। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই ঘটল অবিশ্বাস্য ঘটনা। রাতের অন্ধকারে উড়োজাহাজের পেছনের সিঁড়ি দিয়ে প্যারাস্যুট নিয়ে ঝাঁপ দিলেন ওই ব্যক্তি। সঙ্গে ছিল মুক্তিপণের টাকা।

তিনি কি পরিকল্পনা করেই অদৃশ্য হয়েছিলেন? নাকি অন্ধকারে ঝাঁপ দেওয়ার পর দুর্গম এলাকায় প্রাণ হারিয়েছিলেন? প্রায় সাড়ে পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত এই উড়োজাহাজ ছিনতাইয়ের রহস্যের নিশ্চিত সমাধান মেলেনি। লোকটি ইতিহাসে পরিচিত হয়ে আছেন ‘ডি বি কুপার’ নামে। তবে এই নামটিও তাঁর প্রকৃত পরিচয় নয়।

সেদিন পোর্টল্যান্ড, ওরেগন থেকে সিয়াটলগামী নর্থওয়েস্ট ওরিয়েন্ট এয়ারলাইনসের ৩০৫ নম্বর ফ্লাইটে উঠেছিলেন কুপার। উড়োজাহাজটি ছিল বোয়িং ৭২৭। তাঁর বয়স আনুমানিক চল্লিশের কোঠায় বলে ধারণা করেছিলেন বিমানবালারা। পরনে ছিল গাঢ় রঙের ব্যবসায়িক পোশাক, সাদা শার্ট ও কালো টাই।

উড়োজাহাজ ছাড়ার কিছুক্ষণ পর তিনি এক বিমানবালার হাতে একটি চিরকুট দেন। তাতে লেখা ছিল, তাঁর ব্রিফকেসে বোমা আছে। পরে ব্রিফকেস খুলে তার ভেতরে তার ও লাল রঙের কাঠির মতো বস্তু দেখান তিনি। এরপর নিজের দাবি পাইলটের কাছে পৌঁছে দিতে বলেন।

কুপারের দাবি ছিল স্পষ্ট—যাত্রীদের নিরাপত্তার বিনিময়ে ২ লাখ ডলার এবং চারটি প্যারাস্যুট দিতে হবে। কর্তৃপক্ষ অর্থ ও প্যারাস্যুটের ব্যবস্থা করে। সিয়াটলে অবতরণের পর ৩৬ যাত্রীকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে কয়েকজন বিমানকর্মীকে উড়োজাহাজে রেখে দেন কুপার।

এরপর তিনি উড়োজাহাজটিকে আবার ওড়ানোর নির্দেশ দেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিল মেক্সিকো সিটিতে যাওয়ার। উড়োজাহাজের গতি, উচ্চতা এবং পেছনের সিঁড়ি নামানোর বিষয়েও নির্দেশনা দেন তিনি।

এফবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, রাত আটটার কিছু পরে সিয়াটল ও নেভাদার রেনোর মাঝামাঝি কোথাও উড়োজাহাজ থেকে ঝাঁপ দেন কুপার। পাইলটরা পরে নিরাপদে অবতরণ করেন। কিন্তু কুপারের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

এই রহস্যের অন্যতম আকর্ষণীয় দিক হলো, ছিনতাইকারীর পরিচিত নামটিই সম্ভবত ভুল।

টিকিট কেনার সময় তিনি নিজের নাম বলেছিলেন ড্যান কুপার। ঘটনার পর সংবাদমাধ্যমে নামটি ভুলভাবে ‘ডি বি কুপার’ হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে। পরে সেই নামই জনপ্রিয় হয়ে যায়। এফবিআই জানিয়েছে, ‘ডি বি’ নামটির সঙ্গে ছিনতাইকারীর প্রকৃত পরিচয়ের কোনো নিশ্চিত যোগসূত্র পাওয়া যায়নি।

তদন্তকারীরা বিমানবালাদের বর্ণনা, উড়োজাহাজে পাওয়া আলামত এবং বিভিন্ন সূত্রের ভিত্তিতে অনুসন্ধান চালান। কুপারের ফেলে যাওয়া কালো ক্লিপ-অন টাইও গুরুত্বপূর্ণ আলামত হয়ে ওঠে। বছরের পর বছর ধরে শত শত সম্ভাব্য সূত্র যাচাই করা হয়। তদন্তের পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই সন্দেহভাজনের সংখ্যা ৮০০ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তবু তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। 

কুপার কি দক্ষ প্যারাস্যুটবিদ ছিলেন? তিনি কি আগে থেকেই পালানোর পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন? নাকি ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তই তাঁর অন্তর্ধানের কারণ হয়ে দাঁড়ায়?

তদন্তকারীদের কাছে এ প্রশ্নগুলোর কোনো নিশ্চিত উত্তর নেই। তবে ঝাঁপটি ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক। রাতের অন্ধকার, ঠান্ডা আবহাওয়া, প্রবল বাতাস এবং নিচে বনভূমি—সব মিলিয়ে অবতরণ ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। এফবিআইয়ের বিবরণে বলা হয়েছে, কুপার যে প্যারাস্যুট ব্যবহার করেছিলেন, সেটি দিয়ে সহজে দিক নিয়ন্ত্রণ করা যেত না। তাঁর পোশাক ও জুতাও দুর্গম এলাকায় অবতরণের জন্য উপযোগী ছিল না।

আরও একটি বিষয় তদন্তকারীদের নজরে আসে। কুপার চারটি প্যারাস্যুট চাইলেও ঝাঁপ দেওয়ার সময় সঙ্গে নিয়েছিলেন দুটি। এর মধ্যে একটি ছিল প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহৃত প্যারাস্যুট, যা সেলাই করে বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। অন্য প্যারাস্যুটের দড়ি ব্যবহার করে তিনি টাকার ব্যাগ বেঁধেছিলেন।

এসব তথ্য থেকে এফবিআইয়ের একটি ধারণা ছিল, ঝাঁপ দেওয়ার পর কুপার হয়তো বেঁচে থাকতে পারেননি। কিন্তু তাঁর দেহ পাওয়া যায়নি। ফলে মৃত্যুর ধারণাটিও প্রমাণিত হয়নি। 

কুপার রহস্যে নতুন মোড় আসে ১৯৮০ সালে। ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের কলাম্বিয়া নদীর তীরে বালির মধ্যে এক শিশু পচে যাওয়া ডলারের নোট খুঁজে পায়। নোটগুলোর মোট মূল্য ছিল ৫ হাজার ৮০০ ডলার। সিরিয়াল নম্বর পরীক্ষা করে দেখা যায়, সেগুলো কুপারকে দেওয়া মুক্তিপণের অর্থের অংশ।

এই আবিষ্কার তদন্তকারীদের সামনে নতুন প্রশ্ন তোলে। কুপার কি নদীর কাছাকাছি কোথাও ঝাঁপ দিয়েছিলেন? তিনি কি দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন? নাকি পালানোর সময় টাকার একটি অংশ হারিয়ে ফেলেছিলেন?

কিন্তু নোট পাওয়া গেলেও কুপারের দেহ বা প্যারাস্যুটের কোনো নিশ্চিত সন্ধান মেলেনি। নদীর তীরে ওই অর্থ কীভাবে পৌঁছেছিল, তারও চূড়ান্ত ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে আবিষ্কারটি রহস্যের সমাধান না করে বরং নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়। 

কুপারের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি আলোচিত সন্দেহভাজনদের একজন ছিলেন রিচার্ড ফ্লয়েড ম্যাককয় জুনিয়র। ১৯৭২ সালে তিনি একই ধরনের একটি উড়োজাহাজ ছিনতাই করে প্যারাস্যুটে পালানোর ঘটনায় গ্রেপ্তার হন। এ কারণে অনেকে তাঁকে কুপার বলে সন্দেহ করেছিলেন।

কিন্তু এফবিআই ম্যাককয়কে কুপার হিসেবে শনাক্ত করেনি। দুই বিমানবালার দেওয়া শারীরিক বর্ণনার সঙ্গে তাঁর মিল ছিল না; আরও কিছু কারণেও তাঁকে সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।

এ ঘটনা দেখায়, একই ধরনের অপরাধের মিল থাকলেই কাউকে কুপার বলে চিহ্নিত করা যায় না। তদন্তকারীদের প্রয়োজন ছিল নির্ভরযোগ্য প্রমাণ, যা সন্দেহভাজন ব্যক্তির সঙ্গে ১৯৭১ সালের ছিনতাইয়ের সরাসরি যোগসূত্র প্রতিষ্ঠা করবে। এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। 

২০২৬ সালে টাইয়ের কণায় নতুন সূত্র

রহস্যটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কুপারের ফেলে যাওয়া কালো টাই। ২০২৬ সালে Journal of Forensic Sciences সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় টাই থেকে সংগ্রহ করা অতি ক্ষুদ্র কণার নতুন বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়।

গবেষকেরা স্ক্যানিং ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপসহ বিভিন্ন পরীক্ষাপদ্ধতি ব্যবহার করে একটি ১২ মিলিমিটার নমুনা থেকে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কণা শনাক্ত করেন। বিশ্লেষণে বিশেষ ধরনের ধাতু এবং শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত কিছু উপাদানের সম্ভাব্য উপস্থিতি উঠে আসে। এগুলো কুপারের কাজের পরিবেশ, চলাফেরা বা সংস্পর্শে আসা উপকরণ সম্পর্কে নতুন সূত্র দিতে পারে।

তবে গবেষণাটি কুপারের পরিচয় শনাক্ত করেনি। বরং আগের কিছু অনুমান পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনও সামনে এনেছে। গবেষকেরা জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট কণার পরিচয় নিশ্চিত করতে আরও বিস্তারিত পরীক্ষা প্রয়োজন। তাই টাইয়ের কণাকে নতুন ফরেনসিক সূত্র বলা যায়, কিন্তু ছিনতাইকারীর পরিচয় প্রমাণের চূড়ান্ত উত্তর নয়।

৪৫ বছরের তদন্তের পর কী সিদ্ধান্ত নেয় এফবিআই

এফবিআই প্রায় ৪৫ বছর ধরে ‘নরজ্যাক’ নামে পরিচিত এই ছিনতাইয়ের তদন্ত চালায়। ২০১৬ সালের ৮ জুলাই সংস্থাটি জানায়, কুপার মামলার জন্য বরাদ্দ তদন্ত-সম্পদ অন্য অগ্রাধিকারমূলক কাজে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এর অর্থ, মামলাটির সক্রিয় তদন্ত বন্ধ করা হয়েছে; তবে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব আলামত সামনে এলে তা বিবেচনা করার সুযোগ রাখা হয়েছে।

এফবিআইয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, বহু সূত্র, সাক্ষ্য ও প্রযুক্তিগত পরীক্ষার পরও ছিনতাইকারীর পরিচয় নিশ্চিত করার মতো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। 

রহস্যের উত্তর কি কোনো দিন মিলবে?

ডি বি কুপারকে ঘিরে নানা তত্ত্ব রয়েছে। কেউ মনে করেন, তিনি পরিকল্পিতভাবে পালিয়ে গিয়ে নতুন পরিচয়ে জীবন কাটিয়েছেন। অন্যদের ধারণা, ঝুঁকিপূর্ণ ঝাঁপের পর তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। কিন্তু কোনোটির পক্ষেই চূড়ান্ত প্রমাণ নেই।

একটি বিষয় নিশ্চিত—তিনি ১৯৭১ সালের সেই রাতে উড়োজাহাজ থেকে ঝাঁপ দিয়েছিলেন, আর এরপর তাঁর পরিণতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। নদীর তীরে পাওয়া মুক্তিপণের অর্থ এবং টাইয়ের কণার বিশ্লেষণ তদন্তের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হলেও কোনোটিই তাঁর পরিচয় বা মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।

আজও ডি বি কুপারের কাহিনি তাই এক অসমাপ্ত রহস্য। তিনি কি সফলভাবে পালিয়ে গিয়েছিলেন, নাকি অন্ধকারেই হারিয়ে গিয়েছিলেন চিরতরে—উত্তরটি এখনো অজানা।

সূত্র: যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল আর্কাইভস এবং Journal of Forensic Sciences.


Loading...
Loading...

আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: