বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা, সামরিক পাল্টা পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি এবং আলোচনায় অগ্রগতি না থাকায় সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আলেক্সান্দ্রু হুদিস্তেনুর মতে, দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য পরিস্থিতি শান্ত করার বদলে আরও জটিল করে তুলছে। তাঁর আশঙ্কা, উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে তা আঞ্চলিক নিরাপত্তার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, জাহাজগুলো অনুমতি ছাড়াই প্রণালিটি অতিক্রম করছিল। এ ধরনের চলাচল অব্যাহত থাকলে হামলার পরিধি বাড়ানো হতে পারে বলেও সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
আইআরজিসির বক্তব্যে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর আওতায় আসতে পারে বলে ইঙ্গিত রয়েছে। সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ হুদিস্তেনুর ভাষ্য, আঞ্চলিক মার্কিন সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি মার্কিন কোম্পানিগুলোর স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও কৌশলগত বার্তা দেওয়া হচ্ছে বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ। তাঁর মতে, উভয় পক্ষই নিজেদের সামরিক সক্ষমতা ও সম্ভাব্য পদক্ষেপের বিষয়ে প্রতিপক্ষকে সতর্ক করছে। তবে এমন অবস্থান সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।
হুদিস্তেনু বলেন, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত বিপজ্জনক পর্যায়ে রয়েছে। তাঁর মতে, দুই পক্ষের বক্তব্য ও হুমকির ভাষা উত্তেজনা কমাতে সহায়ক হচ্ছে না।
আলোচনায় অগ্রগতি নিয়ে অনিশ্চয়তা: হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা নিরসনের প্রচেষ্টাও কঠিন হয়ে উঠেছে। হুদিস্তেনুর মতে, দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য গভীর হওয়ায় আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করা কঠিন। মৌলিক বিষয়গুলোতেও তাদের মধ্যে কার্যকর ঐকমত্যের অভাব রয়েছে।
এ অবস্থায় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ইরান হামলার পরিধি বাড়ালে এবং যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ নিলে আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি: পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে হরমুজ প্রণালি। বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান এই নৌপথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের সমপরিমাণ তেল পরিবহন করা হয়। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) আন্তর্জাতিক সরবরাহের ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব অনেক।
এই পথে জাহাজ চলাচল দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ কমে যেতে পারে। এতে জ্বালানির দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল এশীয় দেশগুলো হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার কারণে বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ইরানের কঠোর অবস্থান, মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলার হুঁশিয়ারি এবং আলোচনায় অচলাবস্থা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। কূটনৈতিক সমাধানে অগ্রগতি না হলে এর প্রভাব আঞ্চলিক নিরাপত্তা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও পড়তে পারে।
সূত্র: আল-জাজিরা