নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, মাঠজুড়ে কাশফুলের দোলা আর শিউলি ফুলের স্নিগ্ধ সুবাস—বাংলার চিরচেনা শরৎকে গান, কবিতা ও নৃত্যের ছন্দে তুলে ধরল সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট। শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত পরিবেশনায় মুখর হয়ে ওঠে শরতের আয়োজন। শুধু ঋতুবন্দনা নয়, প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা তৈরি এবং পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তোলার আহ্বানও ছিল অনুষ্ঠানের অন্যতম বার্তা।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে সেন্ট জোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল প্রাঙ্গণে ছায়ানট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় ‘শরতের অনুষ্ঠান’। সকাল সাড়ে ৭টায় শুরু হওয়া এ আয়োজনে অংশ নেয় নালন্দা উচ্চ বিদ্যালয়, এক্সেল একাডেমি, সেন্ট জোসেফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং সেন্ট জোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের শিক্ষার্থীরা। পাঁচ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের পরিবেশনায় শরতের রূপ, প্রকৃতির সৌন্দর্য ও বাংলা গানের ঐতিহ্য মিলেমিশে একাকার হয়ে ওঠে।
আয়োজনের মঞ্চ ও প্রবেশপথ সাজানো হয়েছিল কাশফুল এবং নানা রঙের ঘুড়ি দিয়ে। সাজসজ্জায় ফুটে ওঠে বাংলার শরতের পরিচিত ছবি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শরতে আজ কোন্ অতিথি’ গানের সঙ্গে সম্মেলক সংগীত ও নৃত্য পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান। শিক্ষার্থীদের সমবেত কণ্ঠের সঙ্গে ছায়ানটের শিল্পীদের নৃত্য পরিবেশনা দর্শকদের সামনে তুলে ধরে ঋতুবৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।
এরপর একে একে পরিবেশিত হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম ও অতুল প্রসাদ সেনের গান, কবিতা ও ছড়া। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের পরিবেশনায় আয়োজনটি হয়ে ওঠে প্রজন্মের সঙ্গে বাংলা সাহিত্য ও সংগীতের পরিচয় ঘটানোর এক সম্মিলিত সাংস্কৃতিক পরিসর।
নালন্দা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পরিবেশন করে ‘আলোর অমল কমলখানি’ এবং ‘শরৎ (আজি কি তোমার মধুর মুরতি)’ গান। একই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সুনির্মল বসুর ‘সবার আমি ছাত্র’ কবিতাটি বৃন্দ আবৃত্তিতে তুলে ধরে। এ পর্বে একক সংগীত পরিবেশন করেন মেহেরিন ফাতেমা ও সুদর্শনা অলকানন্দা কুণ্ডু।
এক্সেল একাডেমির শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে পরিবেশিত হয় সম্মেলক গান ‘দেখো-দেখো, দেখো, শুকতারা আঁখি’। সেন্ট জোসেফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা গেয়ে শোনায় ‘কোন্ খেপা শ্রাবণ ছুটে এল’। ছায়ানটের শিল্পী পার্থিব সাহা পরিবেশন করেন ‘শিউলি ফুল শিউলি ফুল’। ইজমির মুস্তাফিজের একক আবৃত্তিতে উঠে আসে ‘শরৎ (এসেছে শরৎ, হিমের পরশ)’। এ ছাড়া কাজী নজরুল ইসলামের ‘কোন্ শরতে পূর্ণিমা-চাঁদ’ কবিতাটি পরিবেশিত হয় বৃন্দ আবৃত্তিতে।
ছায়ানটের অঙ্কিতা সরকার পরিবেশন করেন ‘অমল ধবল পালে লেগেছে’। সেন্ট জোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের পরিবেশনায় ছিল ‘আজ প্রথম ফুলের পাব প্রসাদখানি’। এ প্রতিষ্ঠানের হয়ে একক সংগীত পরিবেশন করেন সার্থক সাহা, বাঁধন কুণ্ডু ও দিব্যময় দেশ।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে ছায়ানটের শিল্পীরা পরিবেশন করেন ‘ওগো শেফালিবনের মনের কামনা’। এ পর্বে একক সংগীত পরিবেশন করেন শতদ্রু সরকার ও প্রেমা দেওয়ানজী। পরে সব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের যৌথ পরিবেশনায় ‘আজ ধানের ক্ষেতে’ সম্মেলক নৃত্যগীত এবং জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শেষ হয় আয়োজন।
আয়োজনের মূল ভাবনায় ছিল প্রকৃতির সঙ্গে নতুন প্রজন্মের সম্পর্ক আরও নিবিড় করা। শরৎ কেবল কাশফুল, শিউলি কিংবা নীল আকাশের সৌন্দর্যের নাম নয়; এটি বাংলাদেশের ষড়ঋতুভিত্তিক জীবন ও সংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই পরিচয় শিক্ষার্থীদের কাছে তুলে ধরার পাশাপাশি প্রকৃতিকে ভালোবাসা ও সংরক্ষণের দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছে ছায়ানট।
ছায়ানটের সভাপতি সারওয়ার আলী বলেন, ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশের প্রতিটি ঋতুরই রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও বৈচিত্র্য। বৃষ্টিহীন নীল আকাশ, মেঘের ভেলা, ফুটন্ত কাশবন ও শিউলি ফুলের সমাহারে শরতের যে স্বতন্ত্র রূপ, তা শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছে ছায়ানট।
তিনি আরও বলেন, ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার্থীদের প্রকৃতির সান্নিধ্যে আনা এবং তাদের মাধ্যমে প্রকৃতির সৌন্দর্য ছড়িয়ে দেওয়া গেলে চলমান প্রকৃতিবিনাশী কর্মকাণ্ড অনেকটাই প্রশমিত করা সম্ভব।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং প্রকৃতির প্রতি মানুষের দায়িত্বশীল আচরণ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক চর্চা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। গান, কবিতা ও নৃত্যের মতো সৃজনশীল মাধ্যমের মধ্য দিয়ে শিশু-কিশোরদের প্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত করা গেলে পরিবেশ সচেতনতার বার্তাও পৌঁছাতে পারে সহজে। ছায়ানটের শরৎ আয়োজন তাই ঋতুবন্দনার পাশাপাশি প্রকৃতি ও সংস্কৃতির বন্ধন নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার একটি প্রয়াস হয়ে উঠেছে।