পুলিশের চাকরি ছেড়ে সিনেমায়, সংলাপের জাদুতে ‘রাজা’ হয়ে উঠেছিলেন রাজ কুমার

বিনোদন ডেস্ক

বিনোদন

পুলিশের পোশাক ছেড়ে হাতে তুলে নিয়েছিলেন অভিনয়ের জাদু। এরপর ভারী কণ্ঠ, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর সংলাপ বলার অনন্য ভঙ্গিতে বলিউডে নিজের

2026-10-08T18:16:31+00:00
2026-10-08T18:16:31+00:00
  শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬,
২৪ আশ্বিন ১৪৩৩
 
শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬
বিনোদন
পুলিশের চাকরি ছেড়ে সিনেমায়, সংলাপের জাদুতে ‘রাজা’ হয়ে উঠেছিলেন রাজ কুমার
বিনোদন ডেস্ক
বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:১৬ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
পুলিশের পোশাক ছেড়ে হাতে তুলে নিয়েছিলেন অভিনয়ের জাদু। এরপর ভারী কণ্ঠ, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর সংলাপ বলার অনন্য ভঙ্গিতে বলিউডে নিজের জন্য তৈরি করেছিলেন আলাদা এক সিংহাসন। তিনি রাজ কুমার। পর্দায় তাঁর মুখ দেখার আগেই অনেক সময় কণ্ঠ শুনে দর্শক বুঝে যেতেন—এসেছেন সেই চিরচেনা রাজ কুমার!

আজ ৮ অক্টোবর তাঁর জন্মের ১০০ বছর পূর্ণ হচ্ছে। ১৯২৬ সালের এই দিনে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেলুচিস্তানের লোরালাইয়ে জন্মেছিলেন কুলভূষণ পণ্ডিত। পরবর্তী সময়ে তিনিই হয়ে ওঠেন হিন্দি সিনেমার অন্যতম স্মরণীয় অভিনেতা রাজ কুমার। চার দশকের বেশি সময়ের অভিনয়জীবনে কখনো কঠিন ও দাপুটে চরিত্র, কখনো অসহায় কৃষক, কখনো প্রেমিক, আবার কখনো অসুস্থ স্বামীর ভূমিকায় দর্শককে মুগ্ধ করেছেন তিনি।

পুলিশের চাকরি ছেড়ে ক্যামেরার সামনে

রাজ কুমারের অভিনয়জীবনের শুরুটা ছিল একেবারেই অন্যরকম। কাশ্মীরি পণ্ডিত পরিবারের সন্তান কুলভূষণ পণ্ডিত কর্মজীবনের শুরুতে বোম্বে পুলিশের উপপরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু মনের ভেতর তখন অন্য স্বপ্ন।

শেষ পর্যন্ত পুলিশের চাকরি ছেড়ে পা রাখেন চলচ্চিত্রে। ১৯৫২ সালের ‘রঙ্গিলি’ দিয়ে শুরু হয় তাঁর সিনেমাযাত্রা। প্রথম দিকে সাফল্য ধরা না দিলেও ধীরে ধীরে নিজের অভিনয় ও ব্যক্তিত্ব দিয়ে জায়গা করে নেন তিনি।

‘মাদার ইন্ডিয়া’য় অন্য এক রাজ কুমার

১৯৫৭ সালের মেহবুব খানের ‘মাদার ইন্ডিয়া’ রাজ কুমারের ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক এনে দেয়। নার্গিসের স্বামীর চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের নজর কাড়েন তিনি।

যে অভিনেতাকে পরবর্তী সময়ে দাপুটে ও কর্তৃত্বপূর্ণ চরিত্রে বেশি দেখা গেছে, ‘মাদার ইন্ডিয়া’য় তাঁকে দেখা যায় বিপন্ন এক কৃষকের ভূমিকায়। ছোট হলেও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রটি প্রমাণ করে—শুধু সংলাপের জোরে নয়, আবেগ ও অসহায়তাও ফুটিয়ে তুলতে পারতেন রাজ কুমার।

এরপর ১৯৫৯ সালের ‘পয়গাম’ ছবিতে দিলীপ কুমারের সঙ্গে অভিনয় করেন তিনি। শ্রমজীবী মানুষের চরিত্রে দেখা যায় তাঁকে। এ সময় ধীরে ধীরে সামাজিক, পারিবারিক ও প্রেমের গল্পেও নিজের অভিনয়ের পরিসর বাড়াতে থাকেন।

শুধু দাপট নয়, আবেগেও ছিলেন অনন্য

রাজ কুমারকে অনেকেই মনে করেন ভারী কণ্ঠের দাপুটে অভিনেতা হিসেবে। কিন্তু তাঁর অভিনয়ের আরেকটি দিক ছিল গভীর সংবেদনশীলতা।

১৯৬০ সালের ‘দিল আপনা অউর প্রীত পরাই’ ছবিতে চিকিৎসকের চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। মীনা কুমারীর সঙ্গে তাঁর চরিত্রের সম্পর্ক ছিল আবেগ ও পারিবারিক জটিলতায় ভরা।

এরপর ১৯৬৩ সালের ‘দিল এক মন্দির’-এ ক্যানসারে আক্রান্ত স্বামীর চরিত্রে অভিনয় করে নিজের অন্যরকম সামর্থ্য দেখান। মীনা কুমারী ও রাজেন্দ্র কুমারের সঙ্গে অভিনীত ছবিটিতে অসুস্থতা, ভালোবাসা ও সম্পর্কের টানাপোড়েন ছিল গল্পের কেন্দ্রে।

এই ছবির জন্য ১৯৬৪ সালে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পান রাজ কুমার। ১৯৬৫ সালের ‘ওয়াক্ত’ ছবির জন্য ১৯৬৬ সালেও একই বিভাগে পুরস্কার জেতেন তিনি।

সংলাপই হয়ে উঠেছিল তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়

রাজ কুমারের নাম উচ্চারণ করলেই যে বিষয়টি সবার আগে মনে পড়ে, সেটি তাঁর সংলাপ বলার ধরন।

‘ওয়াক্ত’ ছবিতে তাঁর উপস্থিতি আলাদা করে নজর কাড়ে। পোশাক, শরীরী ভাষা, চোখের দৃষ্টি আর সংলাপের আগে-পরে নির্দিষ্ট বিরতি—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল এক স্বতন্ত্র স্টাইল।

তাঁর সংলাপের শক্তি শুধু ভারী কণ্ঠে ছিল না। একটি বাক্যের পর কতটা বিরতি দিতে হবে, কোন শব্দে কতটা জোর দিতে হবে, কীভাবে প্রতিপক্ষের দিকে তাকাতে হবে—এসবকিছুর সমন্বয়েই তৈরি হতো রাজ কুমারের সেই বিখ্যাত অভিনয়ভঙ্গি।

এমনকি একসময় তাঁর জন্য সংলাপ লেখার ক্ষেত্রেও লেখকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকত বলে উল্লেখ করা হয়েছে ফিল্মফেয়ারের বিভিন্ন আলোচনায়।

‘পাকিজা’র সেই সংলাপ আজও অমর

রাজ কুমারের সবচেয়ে স্মরণীয় প্রেমের চরিত্রগুলোর একটি ‘পাকিজা’র সেলিম আহমেদ খান।

কামাল আমরোহির ১৯৭২ সালের এই ছবিতে মীনা কুমারীর চরিত্রের প্রতি মুগ্ধ হয়ে রাজ কুমারের বলা সেই সংলাপ হিন্দি সিনেমার ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে।

এখানে তাঁর কণ্ঠে ছিল না ‘ওয়াক্ত’-এর কর্তৃত্ব কিংবা হুমকির সুর। বরং ছিল মুগ্ধতা, ভালোবাসা ও সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষণ। একই কণ্ঠ কীভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন আবেগ প্রকাশ করতে পারে, ‘পাকিজা’ তার বড় উদাহরণ।

‘হীর রাঞ্ঝা’য় সংলাপ ছিল কবিতায়

চেতন আনন্দের ১৯৭০ সালের ‘হীর রাঞ্ঝা’ রাজ কুমারের অভিনয়জীবনের আরেক ব্যতিক্রমী অধ্যায়। প্রিয়া রাজবংশের বিপরীতে অভিনয় করা ছবিটির সংলাপ লিখেছিলেন কবি কাইফি আজমি।

বিশেষত্ব ছিল—ছবিটির পুরো সংলাপই লেখা হয়েছিল পদ্যে।

এমন সংলাপকে স্বাভাবিক অভিনয়ে রূপ দেওয়া ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু রাজ কুমারের কণ্ঠ ও উচ্চারণ সেই কবিতার ছন্দকে আলাদা মাত্রা দেয়। ফলে তাঁর অভিনয়ের আরেকটি ভিন্ন রূপ দর্শকের সামনে আসে।

৩২ বছর পর দিলীপ কুমারের সঙ্গে পর্দায়

রাজ কুমারের ক্যারিয়ারের শেষ দিকের অন্যতম আলোচিত ছবি ‘সওদাগর’। সুভাষ ঘাই পরিচালিত ১৯৯১ সালের এই ছবিতে দীর্ঘ ৩২ বছর পর আবারও দিলীপ কুমারের সঙ্গে পর্দা ভাগ করেন তিনি।

১৯৫৯ সালের ‘পয়গাম’-এর পর তাঁদের এই পুনর্মিলন ছিল দর্শকের জন্য বড় আকর্ষণ।

দুই কিংবদন্তি অভিনেতার ব্যক্তিত্বের পার্থক্যও ছবিটিকে আলাদা মাত্রা দেয়। পরিচালক সুভাষ ঘাইয়ের স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে, তাঁদের একসঙ্গে নেওয়ার ব্যাপারে তাঁকে সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দুই তারকাকেই ছবিতে নিয়ে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন তিনি।

নানা পাটেকরের সঙ্গে ‘তিরঙ্গা’তেও জমেছিল রসায়ন

১৯৯৩ সালের ‘তিরঙ্গা’য় রাজ কুমারের সঙ্গে অভিনয় করেন নানা পাটেকর। দুই প্রজন্মের দুই শক্তিশালী অভিনেতার অভিনয়শৈলী ছিল একেবারেই আলাদা।

রাজ কুমারের পরিমিত গতি, কর্তৃত্বপূর্ণ সংলাপ আর ব্যক্তিত্বের বিপরীতে নানা পাটেকরের তীব্র অভিনয় ছবিটিতে তৈরি করে ভিন্ন ধরনের উত্তেজনা।

তবে শুটিংয়ের আগে দুজনের ব্যক্তিত্ব নিয়ে পরিচালক মেহুল কুমারকে সতর্ক থাকতে হয়েছিল। নানা পাটেকর শর্ত দিয়েছিলেন, রাজ কুমার তাঁর কাজে হস্তক্ষেপ করলে তিনি সেট ছেড়ে চলে যাবেন।

শেষ ছবির পরও থামেনি কিংবদন্তি

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত অভিনয় করেছেন রাজ কুমার। তাঁর শেষ অভিনীত ছবি ‘গড অ্যান্ড গান’ মুক্তি পায় ১৯৯৫ সালে।

১৯৯৬ সালের ৩ জুলাই মুম্বাইয়ে ৬৯ বছর বয়সে মারা যান তিনি। কিন্তু তাঁর কণ্ঠ, সংলাপ আর অভিনয়ের স্বতন্ত্র ধরন এখনও হিন্দি সিনেমাপ্রেমীদের কাছে অমলিন।

মৃত্যুতেও চেয়েছিলেন নীরবতা

পর্দায় যতটা জাঁকজমক ছিল, ব্যক্তিজীবনে নিজের বিদায় নিয়ে ততটাই নীরব থাকতে চেয়েছিলেন রাজ কুমার।

মেহুল কুমারের স্মৃতিচারণা অনুযায়ী, ১৯৮৭ সালের ‘মরতে দম তক’ ছবির একটি মৃত্যুদৃশ্যের শুটিংয়ের সময় নিজের শেষকৃত্য নিয়ে ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। চেয়েছিলেন, মৃত্যুর পর তাঁর শেষযাত্রা যেন চলচ্চিত্রজগতের প্রদর্শনীতে পরিণত না হয়।

মৃত্যুর পরও সেই ইচ্ছাই যেন বাস্তব হয়। পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতেই সম্পন্ন হয় তাঁর শেষকৃত্য।

জন্মশতবর্ষে নতুন রূপে ফিরছে ‘পাকিজা’

রাজ কুমারের জন্মশতবর্ষে তাঁর অভিনীত ‘পাকিজা’ আবারও নতুন রূপে দর্শকের সামনে আসছে।

ফিল্ম হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে দুই বছরের প্রচেষ্টায় ছবিটি ফোরকে প্রযুক্তিতে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। ফ্রান্সের লিওঁ শহরের লুমিয়ের চলচ্চিত্র উৎসবে হবে নতুন সংস্করণের বিশ্ব প্রিমিয়ার। এরপর লন্ডন চলচ্চিত্র উৎসবেও প্রদর্শিত হবে ছবিটি।

অর্থাৎ এক শতাব্দী আগে জন্ম নেওয়া সেই অভিনেতার অভিনয় আবারও বড় পর্দায় নতুন প্রজন্মের সামনে হাজির হচ্ছে—আর তাঁর কণ্ঠের সেই অমোঘ জাদু হয়তো আরও একবার মনে করিয়ে দেবে, কেন রাজ কুমার শুধু একজন অভিনেতা নন, হিন্দি সিনেমার এক স্বতন্ত্র অধ্যায়ের নাম।


Loading...
Loading...

বিনোদন- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: