জসীমের ‘মাইর’ খেতেই সিনেমা হলে যেত দর্শক, পরে তাঁর জন্যই কাঁদল লাখো মানুষ!

বিনোদন ডেস্ক

বিনোদন

ঢাকাই চলচ্চিত্রে খলনায়ক হিসেবে অভিষেক। পর্দায় তাঁর দুর্ধর্ষ মারপিট আর ভয়ংকর উপস্থিতিতে দর্শকের মনে তৈরি হয়েছিল আতঙ্ক। কিন্তু সেই মানুষটিই

2026-10-08T17:52:24+00:00
2026-10-08T17:52:24+00:00
  শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬,
২৪ আশ্বিন ১৪৩৩
 
শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬
বিনোদন
জসীমের ‘মাইর’ খেতেই সিনেমা হলে যেত দর্শক, পরে তাঁর জন্যই কাঁদল লাখো মানুষ!
বিনোদন ডেস্ক
বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:৫২ পিএম 
জসীমের ‘মাইর’ খেতেই সিনেমা হলে যেত দর্শক, পরে তাঁর জন্যই কাঁদল লাখো মানুষ!
ঢাকাই চলচ্চিত্রে খলনায়ক হিসেবে অভিষেক। পর্দায় তাঁর দুর্ধর্ষ মারপিট আর ভয়ংকর উপস্থিতিতে দর্শকের মনে তৈরি হয়েছিল আতঙ্ক। কিন্তু সেই মানুষটিই একসময় হয়ে উঠলেন সাধারণ মানুষের প্রিয় নায়ক। অ্যাকশন, আবেগ ও মানবিকতার অনন্য মিশেলে যিনি জয় করেছিলেন কোটি দর্শকের হৃদয়, তিনি চিত্রনায়ক জসীম।

১৯৯৮ সালের ৮ অক্টোবর মাত্র ৪৮ বছর বয়সে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান এই কিংবদন্তি অভিনেতা। তাঁর মৃত্যুর ২৭ বছর পরও ঢাকাই সিনেমায় জসীমের জনপ্রিয়তা অমলিন। পুরোনো সিনেমার দৃশ্য, সংলাপ কিংবা মারপিটের ভিডিও এখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরে বেড়ায়। নতুন প্রজন্মের কাছেও তিনি পরিচিত এক আইকনিক অ্যাকশন তারকা হিসেবে।

যুদ্ধের ময়দান থেকে চলচ্চিত্রের পর্দায়

১৯৫০ সালের ১৪ আগস্ট ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার বক্সনগর গ্রামে জন্ম জসীমের। তাঁর আসল নাম আবদুল খায়ের জসীম উদ্দিন। ছোটবেলা থেকেই ছিলেন সাহসী ও দুরন্ত।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন তিনি। যুদ্ধ শেষে চলচ্চিত্রে এসে নিজের জন্য তৈরি করেন সম্পূর্ণ আলাদা এক জায়গা। ১৯৭২ সালে ‘দেবর’ ছবির মাধ্যমে অভিনয়ে যাত্রা শুরু হলেও ১৯৭৩ সালে জহিরুল হক পরিচালিত ‘রংবাজ’ ছবিতে খলনায়ক চরিত্রে অভিনয় করে নজর কাড়েন।

শুধু অভিনয় নয়, ঢাকাই সিনেমার অ্যাকশন দৃশ্যেও বড় পরিবর্তন আনেন জসীম। তাঁর হাত ধরে গড়ে ওঠে ‘ফাইটিং গ্রুপ’। পরবর্তী সময়ে এই দলের অনেক সদস্যই ফাইট ডিরেক্টর ও স্টান্টম্যান হিসেবে চলচ্চিত্রে কাজ করেন। তাঁদের অনেকের কাছেই জসীম ছিলেন গুরু।

‘দোস্ত দুশমন’-এ ভয়ংকর গব্বর

দেওয়ান নজরুল পরিচালিত ‘দোস্ত দুশমন’ ছবিতে গব্বর সিং চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক পরিচিতি পান জসীম। ছবিটি ছিল হিন্দি ‘শোলে’র রিমেক।

গব্বর চরিত্রে তাঁর অভিনয় এতটাই প্রভাব ফেলেছিল যে দর্শকের কাছে জসীম হয়ে ওঠেন ভয়ংকর এক খলনায়ক। সিনেমা হলে যাওয়ার সময় দর্শকদের কেউ কেউ মজা করে বলতেন, ‘আজ জসীমের মাইর খেতে যাচ্ছি।’

‘আসামি হাজির’ ছবিতে ওয়াসিমের সঙ্গে তাঁর লড়াইয়ের দৃশ্য নিয়েও দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল। চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টদের বয়ানে জানা যায়, তাঁর অভিনয়ের প্রশংসা করেছিলেন ভারতের জনপ্রিয় অভিনেতা আমজাদ খানও।

খলনায়ক থেকে হয়ে গেলেন নায়ক

জসীমের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় বাঁক আসে সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘সবুজ সাথী’ ছবিতে। এই সিনেমায় প্রথমবার নায়ক হিসেবে হাজির হন তিনি।

ছবিটি সফল হওয়ার পর আর খলনায়কের চরিত্রে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। বরং পর্দায় শোষিত, নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের প্রতিনিধি হয়ে উঠলেন জসীম। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করা সাহসী চরিত্র, দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো নায়ক এবং আবেগঘন অভিনয়—সব মিলিয়ে আশির দশকে তিনি হয়ে ওঠেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় অ্যাকশন হিরো।

শাবানার সঙ্গে কখনো প্রেম, কখনো ভাই

শাবানার সঙ্গে জসীমের জুটি ছিল দর্শকদের কাছে বিশেষ জনপ্রিয়। মজার বিষয়, একই নায়িকার সঙ্গে কখনো প্রেমিক আবার কখনো ভাইয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। দুই ভূমিকাতেই পেয়েছেন দর্শকের সমান ভালোবাসা।

‘ভাইবোন’, ‘মেয়েরাও মানুষ’, ‘পরিবার’ ও ‘বুকের ধন’-এর মতো ছবিতে তিনি ছিলেন পারিবারিক আবহের চরিত্রে। অন্যদিকে ‘লালু মাস্তান’, ‘বারুদ’ ও ‘নবাবজাদা’র মতো ছবিতে দেখা গেছে তাঁর দুর্ধর্ষ অ্যাকশন অবতার।

রোজিনার সঙ্গেও জসীমের জুটি ছিল বেশ জনপ্রিয়। আশির দশকে শাবানা ও রোজিনার বিপরীতে তাঁর একাধিক সিনেমা ব্যবসায়িক সাফল্য পায়।

দুই শতাধিক ছবিতে দাপট

দীর্ঘ ক্যারিয়ারে জসীম অভিনয় করেছেন প্রায় দুই শতাধিক চলচ্চিত্রে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—‘তুফান’, ‘জবাব’, ‘নাগ-নাগিনী’, ‘বদলা’, ‘বারুদ’, ‘সুন্দরী’, ‘কসাই’, ‘লালু মাস্তান’, ‘নবাবজাদা’, ‘অভিযান’, ‘কালিয়া’, ‘বাংলার নায়ক’, ‘গরিবের ওস্তাদ’, ‘রাজা বাবু’, ‘স্বামী কেন আসামী’, ‘মেয়েরাও মানুষ’ ও ‘বুকের ধন’।

তাঁর অধিকাংশ সিনেমায় উঠে এসেছে দরিদ্র মানুষের সংগ্রাম, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, মায়ের প্রতি ভালোবাসা, প্রেম ও ত্যাগের গল্প। ফলে জসীম শুধু সিনেমার নায়ক ছিলেন না; একসময় তিনি হয়ে উঠেছিলেন সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।

পর্দার বাইরেও ছিলেন যোদ্ধা

জসীমের নায়ক হয়ে ওঠার পেছনে তাঁর বাস্তব জীবনের সাহসও বড় ভূমিকা রেখেছিল বলে মনে করেন চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টরা। মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাঁর ব্যক্তিত্বে যে দৃঢ়তা তৈরি করেছিল, তা পর্দার চরিত্রেও ফুটে উঠত।

অ্যাকশন দৃশ্যে তাঁর স্বাভাবিক উপস্থিতি, লড়াইয়ের ধরন ও সংলাপ বলার ভঙ্গি দর্শকের কাছে তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল।

এখনো ফিরছেন ইউটিউব-রিলসে

জসীমের মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পরও তাঁর জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি। ইউটিউব ও ফেসবুকের রিলসে নিয়মিত দেখা যায় তাঁর সিনেমার মারপিট, নাচ, সংলাপ কিংবা আবেগঘন দৃশ্য।

তরুণদের কেউ কেউ তাঁর সংলাপ অনুকরণ করেন, আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে ঘিরে তৈরি হয় নানা মিম ও ভিডিও। পুরোনো প্রজন্মের কাছে তিনি নস্টালজিয়ার নাম, আর নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি ঢাকাই সিনেমার এক আইকনিক অ্যাকশন তারকা।

সন্তানরাও আছেন সংগীতের জগতে

জসীমের প্রথম স্ত্রী ছিলেন জনপ্রিয় নায়িকা সুচরিতা। পরে তিনি নাসরিনকে বিয়ে করেন। তাঁদের তিন ছেলে—এ কে রাহুল, এ কে সামী ও এ কে রাতুল। তিনজনই সংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তবে কেউ অভিনয়ে আসেননি।

রাহুল ‘ট্রেনরেক’ ও ‘পরাহো’ ব্যান্ডে গিটার বাজান। সামী ও রাতুলও সংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। গত জুলাইয়ে রাতুল মারা যান এবং বাবার কবরের পাশেই তাঁকে দাফন করা হয়।

স্মৃতিতে অমর জসীম

১৯৯৮ সালের ৮ অক্টোবর হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান জসীম। তাঁর চলে যাওয়ায় শোক নেমে এসেছিল পুরো চলচ্চিত্র অঙ্গনে।

আজ ২৭ বছর পরও তাঁর নাম উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধার সঙ্গে। কারণ, জসীম শুধু খলনায়ক থেকে নায়ক হয়ে ওঠেননি; তিনি ঢাকাই চলচ্চিত্রে অ্যাকশন ঘরানাকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রেও রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ছাপ।

পর্দায় কখনো ভয়ংকর ভিলেন, কখনো প্রেমিক, কখনো ভাই—শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন একজন সত্যিকারের নায়ক হিসেবে। আর সেখানেই জসীমের সবচেয়ে বড় সাফল্য—ভিলেনের চরিত্র দিয়ে যাত্রা শুরু করে তিনি শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছিলেন দর্শকের ভালোবাসার নায়ক।


Loading...
Loading...

বিনোদন- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: