একটি চরিত্রে থেমে থাকার অভিনেতা ছিলেন না নানা পাটেকর। কখনো ভয়ংকর আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন, কখনো প্রতিবাদী মানুষ, কখনো কঠোর পুলিশ কর্মকর্তা, আবার কখনো হাসির খোরাক জোগানো কমেডিয়ান—প্রতিটি চরিত্রেই নিজেকে নতুন করে মেলে ধরেছেন তিনি। প্রায় পাঁচ দশকের অভিনয়জীবনে হিন্দি ও মারাঠি সিনেমায় তৈরি করেছেন এমন এক স্বতন্ত্র অভিনয়ভাষা, যা তাকে দিয়েছে আলাদা পরিচয়।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ৭৫ বছর বয়সে নানা পাটেকরের মৃত্যুর পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে তাঁর দীর্ঘ অভিনয়জীবন। পরিন্দা, ক্রান্তিবীর, অগ্নিসাক্ষী, খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল, অব তক ছাপ্পান, ওয়েলকাম, রাজনীতি ও নটসম্রাট—বৈচিত্র্যময় এসব চরিত্রেই বারবার নিজের অভিনয়ক্ষমতার নতুন দিক দেখিয়েছেন তিনি।
১. ‘পরিন্দা’—ভয়ংকর আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন
১৯৮৯ সালের বিধু বিনোদ চোপড়া পরিচালিত পরিন্দা নানা পাটেকরের ক্যারিয়ারে বড় বাঁক এনে দেয়। আন্না চরিত্রে তাঁর অভিনয়ে ছিল ভয়ংকর নির্মমতা, ঠান্ডা মাথার নিষ্ঠুরতা এবং অদ্ভুত এক নীরবতা।
চরিত্রটির জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা পার্শ্ব অভিনেতার স্বীকৃতি পান তিনি। তাঁর অভিনয় এতটাই প্রভাবশালী ছিল যে আন্না চরিত্রটি ভারতীয় সিনেমার স্মরণীয় খলচরিত্রগুলোর একটি হয়ে ওঠে।
২. ‘ক্রান্তিবীর’—প্রতিবাদের কণ্ঠ
১৯৯৪ সালের ক্রান্তিবীর-এ প্রতাপ নারায়ণ তিলক চরিত্রে একেবারেই অন্যরূপে দেখা যায় নানা পাটেকরকে। শুরুতে লক্ষ্যহীন এক মানুষ থেকে অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠে পরিণত হওয়ার যাত্রায় তাঁর অভিনয় দর্শকদের গভীরভাবে নাড়া দেয়।
এই চরিত্রের জন্য সেরা অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পান তিনি। ছবিটি নানার অভিনয়জীবনের অন্যতম মাইলফলক হয়ে আছে।
৩. ‘তিরঙ্গা’—দাপুটে পুলিশ কর্মকর্তা
১৯৯৩ সালের তিরঙ্গা সিনেমায় শিবাজিরাও ওয়াগলে চরিত্রে অভিনয় করেন নানা পাটেকর। দেশপ্রেম, অ্যাকশন আর শক্তিশালী সংলাপে ভরা এই সিনেমায় রাজকুমারের সঙ্গে তাঁর রসায়নও দর্শকদের নজর কাড়ে।
কঠোর পুলিশ কর্মকর্তার চরিত্রে তাঁর সংলাপ বলার স্বতন্ত্র ধরন সিনেমাটিকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে।
৪. ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’—সংলাপ ছাড়াই অভিনয়ের শক্তি
সঞ্জয় লীলা বানসালির প্রথম সিনেমা খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল-এ জোসেফ চরিত্রে অভিনয় করেন নানা। একজন শ্রবণ ও বাক্প্রতিবন্ধী বাবার ভূমিকায় এখানে তাঁর অভিনয়ের মূল শক্তি ছিল চোখের ভাষা, মুখের অভিব্যক্তি ও শরীরী ভাষা।
যে অভিনেতার কণ্ঠ ও সংলাপ বলার ধরন ছিল অন্যতম পরিচয়, তিনিই এই সিনেমায় প্রায় সংলাপনির্ভরতা ছাড়াই আবেগ পৌঁছে দেন দর্শকের কাছে।
৫. ‘অব তক ছাপ্পান’—কঠোর এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট
২০০৪ সালের অব তক ছাপ্পান-এ সাধু আগাশে চরিত্রে নানা পাটেকরকে দেখা যায় মুম্বাই পুলিশের এক কঠোর এনকাউন্টার কর্মকর্তার ভূমিকায়।
চরিত্রটির মধ্যে ছিল ক্লান্তি, কঠোরতা ও নৈতিক দ্বন্দ্ব। অতিরিক্ত নাটকীয়তার বদলে সংযত অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি একজন পুলিশ কর্মকর্তার মানসিক চাপ ও বাস্তবতাকে পর্দায় তুলে ধরেন।
৬. ‘ওয়েলকাম’—গম্ভীর অভিনেতার হাসির জাদু
নানা পাটেকরের অভিনয়জীবনের সবচেয়ে বড় চমকগুলোর একটি ওয়েলকাম। ২০০৭ সালের এই কমেডি সিনেমায় উদয় শেঠি চরিত্রে অভিনয় করে তিনি প্রমাণ করেন, শুধু গম্ভীর বা তীব্র চরিত্র নয়, হাসির চরিত্রেও তাঁর সমান দখল।
অনিল কাপুরের মজনু ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর জুটি এবং সংলাপ বলার স্বাভাবিক ভঙ্গি সিনেমাটিকে দর্শকদের কাছে আরও জনপ্রিয় করে তোলে।
৭. ‘রাজনীতি’—পর্দার আড়ালের কৌশলী
প্রকাশ ঝা পরিচালিত ২০১০ সালের রাজনীতিতে ব্রিজগোপাল চরিত্রে অভিনয় করেন নানা পাটেকর। সরাসরি ক্ষমতার কেন্দ্রে না থেকেও কীভাবে একজন কৌশলী ব্যক্তি রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তাঁর চরিত্রে সেটিই ফুটে ওঠে।
এখানে নানার অভিনয়ে ছিল না অতিরিক্ত উচ্চকণ্ঠতা; বরং সংযত অভিব্যক্তি, হিসাবি সংলাপ আর তীক্ষ্ণ উপস্থিতিই চরিত্রটিকে আলাদা করে তোলে।
৮. ‘নটসম্রাট’—অভিনেতার জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন অধ্যায়
২০১৬ সালের মারাঠি সিনেমা নটসম্রাট-এ গণপতরাও বেলওয়ালকর চরিত্রে অভিনয় করেন নানা পাটেকর। অবসর নেওয়া এক মঞ্চ অভিনেতার বার্ধক্য, পারিবারিক টানাপোড়েন, একাকিত্ব এবং মঞ্চের প্রতি অমোঘ ভালোবাসার গল্পে তাঁর অভিনয় ছিল গভীর ও আবেগময়।
চরিত্রটির উত্থান, ভাঙন ও নিঃসঙ্গতাকে এমনভাবে ফুটিয়ে তোলেন তিনি, যা তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় অভিনয় হিসেবে বিবেচিত হয়।
চরিত্র বদলেছেন, বদলাননি অভিনয়ের গভীরতা
নানা পাটেকরের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল চরিত্রের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে ঢুকে যাওয়ার ক্ষমতা। পরিন্দার নির্মম ডন থেকে ক্রান্তিবীরএর প্রতিবাদী মানুষ, অব তক ছাপ্পানএর কঠোর পুলিশ, ওয়েলকামএর উদয় শেঠি কিংবা নটসম্রাটএর ভেঙে পড়া মঞ্চ অভিনেতা—প্রতিটি চরিত্রেই তিনি আলাদা এক জগৎ তৈরি করেছেন।
তাঁর কণ্ঠ, সংলাপ বলার ধরন, চোখের অভিব্যক্তি ও নীরবতাও হয়ে উঠেছিল অভিনয়ের শক্তিশালী হাতিয়ার। তাই নানা পাটেকরের পর্দার উপস্থিতি শুধু চরিত্রকে জীবন্ত করেনি, অনেক চরিত্রকেই দিয়েছে দীর্ঘস্থায়ী সাংস্কৃতিক পরিচয়।
বৃহস্পতিবার তাঁর মৃত্যুর পর ভারতীয় চলচ্চিত্রে তাঁর রেখে যাওয়া কাজগুলো নতুন করে ফিরে দেখা হচ্ছে। প্রায় পাঁচ দশকের ক্যারিয়ারে তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী এই অভিনেতার সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার সম্ভবত তাঁর চরিত্রগুলোই—যেগুলো আজও দর্শকের স্মৃতিতে জীবন্ত।