ভারতীয় চলচ্চিত্রে তার কণ্ঠ ছিল আলাদা, সংলাপ বলার ভঙ্গি ছিল অনন্য। কখনো প্রতিবাদী, কখনো কঠোর, কখনো ভয়ংকর খলনায়ক—আবার কখনো নিখাদ হাসির চরিত্রে দর্শককে মাতিয়েছেন। কিন্তু ক্যামেরার বাইরে ছিলেন অনেকটাই প্রচারবিমুখ, সাদামাটা এক মানুষ। কৃষক ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো ছিল তার জীবনের আরেক পরিচয়।
সেই নানা পাটেকর আর নেই। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ভোরে গোয়ার দোনা পাওলায় নিজ বাসভবনে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে ৭৫ বছর বয়সে মারা গেছেন বলিউডের এই বর্ষীয়ান অভিনেতা। ভোর ৫টা ২০ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা প্রায় ৪৫ মিনিট সিপিআর দিয়েও তাকে বাঁচাতে পারেননি। তার ছেলে মালহার পাটেকর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন।
নানার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই হিন্দি ও মারাঠি চলচ্চিত্র অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। সহকর্মী, নির্মাতা ও ভক্তরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্মরণ করছেন তার অনন্য অভিনয়, তীব্র ব্যক্তিত্ব ও মানবিক কাজকে।
শেষ প্রকাশ্য উপস্থিতিতেও ছিল মৃত্যুর কথা
অদ্ভুত এক সমাপতন—মৃত্যুর মাত্র চার দিন আগে গোয়ার একটি অনুষ্ঠানে নিজের জীবনের শেষ পরিণতি নিয়ে কথা বলেছিলেন নানা।
গত ৪ অক্টোবর গোয়ার দোনা পাওলায় এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, একদিন সবাইকে চলে যেতে হবে। তিনি জানতেন না পরদিন তিনি সেখানে থাকবেন কি না। নিজের জীবন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন—যা করতে চেয়েছেন, তা করতে পেরেছেন কি না।
চার দিন পরই তার নিজের জীবনের পর্দা নামল।
অভাবের সংসার থেকে সিনেমার পর্দায়
নানার আসল নাম বিশ্বনাথ পাটেকর। ১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রের রায়গড় জেলার মুরুদ-জঞ্জিরায় জন্ম তার। ছোটবেলাতেই দেখেছেন অভাব। পরিবারের আর্থিক সংকট তাকে অল্প বয়সেই উপার্জনের পথে নামতে বাধ্য করে।
মাত্র ১৩ বছর বয়সে মাসে ৩৫ টাকা ও একবেলা খাবারের বিনিময়ে সিনেমার পোস্টার আঁকতেন তিনি। কলেজজীবনে রাস্তায় জেব্রা ক্রসিং এঁকে আয় করতেন ১৫ টাকা। সেই সংগ্রামী কিশোরই পরবর্তী সময়ে ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম শক্তিশালী অভিনেতায় পরিণত হন।
১৯৭৮ সালে ‘গমন’ সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক। এরপর ধীরে ধীরে নিজের অভিনয়শৈলী দিয়ে তৈরি করেন স্বতন্ত্র জায়গা। ‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘অগ্নিসাক্ষী’, ‘অব তক ছাপ্পান’, ‘নটসম্রাট’, ‘রাজনীতি’, ‘ওয়েলকাম’—বিভিন্ন ঘরানার সিনেমায় তার অভিনয় দর্শকদের মনে স্থায়ী ছাপ ফেলেছে।
তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং ২০১৩ সালে পদ্মশ্রীসহ পেয়েছেন বহু সম্মান।
পর্দার বাইরে ছিলেন একেবারেই অন্য মানুষ
খ্যাতির শীর্ষে উঠেও বিলাসী জীবনযাপন তাকে টানেনি। গ্রামের পরিবেশ, কৃষিকাজ, সাধারণ মানুষের সঙ্গে সময় কাটানো—এসবই ছিল তার পছন্দ।
মহারাষ্ট্রের কৃষকদের দুর্দশা তাকে বিশেষভাবে নাড়া দিত। খরা, ঋণ ও ফসলহানির কারণে কৃষকদের আত্মহত্যার খবর তাকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল।
এই ভাবনা থেকেই অভিনেতা মকরন্দ অনাসপুরের সঙ্গে ২০১৫ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘নাম ফাউন্ডেশন’। সংগঠনটি কৃষকদের সহায়তার পাশাপাশি পানি সংরক্ষণ, জলাধার পুনরুদ্ধার ও গ্রামীণ উন্নয়নে কাজ করে।
মহারাষ্ট্রের খরাপীড়িত এলাকায় কৃষক পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো, পানির উৎস পুনরুদ্ধার ও গ্রামীণ জীবিকার উন্নয়নে নানার ভূমিকা তাকে চলচ্চিত্রের বাইরেও আলাদা পরিচিতি এনে দেয়।
প্রচার নয়, মানুষের পাশে থাকাই ছিল আনন্দ
নিজের সমাজসেবামূলক কাজ নিয়ে প্রচার করতে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না নানা। তার কাছে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই ছিল বড় কথা।
এই কারণেই পর্দার বাইরে তার জীবনকে অনেকেই দেখেছেন একেবারেই আলাদা আলোয়—যেখানে তারকাখ্যাতির চেয়ে মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার গুরুত্ব ছিল বেশি।
নানার মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ বলিউড
নানার মৃত্যুর খবরের পর একের পর এক শোকবার্তা আসতে থাকে চলচ্চিত্র অঙ্গন থেকে।
অক্ষয় কুমার নানার কণ্ঠ, তীব্রতা ও অভিনয়ের সততার কথা স্মরণ করে তাকে ‘একেবারেই নিজের মতো’ অভিনেতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। রিতেশ দেশমুখ বলেছেন, তিনি ছিলেন অসাধারণ অভিনেতা; কোনো চরিত্রই তার জন্য অসম্ভব ছিল না। তার মৃত্যুতে ‘একটি যুগের অবসান’ হয়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন রিতেশ।
মনিষা কৈরালা তার ‘খামোশি’ ও ‘অগ্নিসাক্ষী’র সহশিল্পীকে স্মরণ করে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। প্রকাশ রাজও নানার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও স্মৃতির কথা তুলে ধরে তাকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। জুনিয়র এনটিআর বলেছেন, নানার প্রতিটি চরিত্রে যে সততা ও তীব্রতা ছিল, তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম স্মরণ করবে।
শোক জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও। তিনি ভারতীয় সিনেমায় নানার অবদান এবং তার অমর হয়ে থাকা চরিত্রগুলোর কথা স্মরণ করেছেন। মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশও তার অভিনয় ও কৃষকদের জন্য সামাজিক কাজের কথা তুলে ধরে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
একজন অভিনেতার চেয়েও বেশি কিছু
নানা পাটেকরের জীবন যেন দুটি আলাদা গল্পের সমন্বয়—একদিকে পর্দার তীব্র, শক্তিশালী ও স্মরণীয় অভিনেতা; অন্যদিকে প্রচারের আড়ালে থাকা একজন সাদামাটা মানুষ, যিনি কৃষক ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
১৩ বছর বয়সে ৩৫ টাকা মাসিক আয় করা সেই কিশোরই একদিন হয়ে উঠেছিলেন ভারতীয় সিনেমার অন্যতম শক্তিশালী অভিনেতা। অর্জন করেছেন জাতীয় পুরস্কার, পদ্মশ্রী ও কোটি দর্শকের ভালোবাসা।
বৃহস্পতিবার ৭৫ বছর বয়সে তার জীবনের পর্দা নামল। কিন্তু ‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘নটসম্রাট’ কিংবা ‘ওয়েলকাম’-এর চরিত্রগুলোর মতোই ভারতীয় সিনেমায় নানা পাটেকরের উপস্থিতি থেকে যাবে দীর্ঘদিন।
নানা নেই, কিন্তু তার কণ্ঠ, সংলাপ, অভিনয়ের তীব্রতা আর মানুষের জন্য করা কাজ—সবই তাকে বারবার ফিরিয়ে আনবে দর্শকের স্মৃতিতে।