হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এবার এক যাত্রীর পায়ুপথ থেকে উদ্ধার হয়েছে ডিমের আকৃতির তিনটি প্যাকেটে থাকা সোনার পেস্ট। ২৪ ক্যারেটের এসব পেস্টের মোট ওজন ১ হাজার ২৯০ গ্রাম। পরিশোধনের পর প্রায় এক কেজি সোনা পাওয়া যেতে পারে বলে জানিয়েছে ঢাকা কাস্টম হাউস। এর আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।
বৃহস্পতিবার সকালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ থেকে এয়ার অ্যারাবিয়ার একটি ফ্লাইটে ঢাকায় আসেন আরমান উদ্দীন সিদ্দিক। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে বিমানবন্দরে নজরদারি চালানোর সময় ব্যাগেজ বেল্ট-২ এলাকায় তাকে সন্দেহ হয়। পরে তল্লাশি করে তার পায়ুপথে সাদা স্কচটেপে মোড়ানো তিনটি ডিম্বাকৃতির প্যাকেট পাওয়া যায়। প্রতিটি প্যাকেটে ছিল ৪৩০ গ্রাম করে সোনার পেস্ট।
ঢাকা কাস্টম হাউস জানিয়েছে, এ ঘটনায় ওই যাত্রীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার প্রক্রিয়া চলছে।
শাহজালাল বিমানবন্দরে সোনা চোরাচালানের ঘটনা নতুন নয়। তবে পাচারকারীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে প্রতিনিয়ত পদ্ধতি বদলাচ্ছে। কখনো সোনার বার, কখনো বিস্কুট, আবার কখনো পেস্ট বা গুঁড়া আকারে সোনা আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক উদ্ধার ঘটনাগুলো বলছে, সোনা বহনে শুধু যাত্রী নয়, বিমানকর্মীদেরও ব্যবহার করা হচ্ছে। কখনো শরীরের ভেতরে, কখনো পোশাক কিংবা জুতার ভেতরে, আবার কখনো উড়োজাহাজের বিভিন্ন গোপন স্থানে সোনা লুকিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
এর মাত্র কয়েক দিন আগে, ৪ অক্টোবর শাহজালাল বিমানবন্দরে দুই বিমানকর্মীর জুতার ভেতর থেকে ৮০টি সোনার বার উদ্ধার করা হয়। কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের (সিআইআইডি) অভিযানে উদ্ধার হওয়া বারগুলোর মোট ওজন ছিল প্রায় ৯ দশমিক ৩৪ কেজি। বাজারমূল্য প্রায় ১৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
দুবাই থেকে আসা এমিরেটসের একটি ফ্লাইটের দুই কর্মী বিশেষ কৌশলে জুতার মধ্যে এসব সোনার বার লুকিয়ে রেখেছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
শুধু শরীর বা জুতাই নয়, পোশাকের মধ্যেও সোনা লুকিয়ে পাচারের চেষ্টা হয়েছে। গত বছরের এপ্রিলে দুবাই থেকে সিলেট হয়ে ঢাকায় আসা এক যাত্রীর কাছ থেকে সোনার মতো গুঁড়া উদ্ধার করা হয়েছিল।
ওই যাত্রীর চার জোড়া অন্তর্বাস, একটি প্যান্ট ও তিনটি টি-শার্টে বিশেষভাবে সোনা লুকানো ছিল। পরে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় এসব উপাদান পরিশোধন করে প্রায় ২ কেজি ৪১৭ গ্রাম সোনা পাওয়া যায়।
সন্দেহভাজন যাত্রীদের তল্লাশির পাশাপাশি গোপন তথ্যের ভিত্তিতে উড়োজাহাজেও অভিযান চালানো হয়। যাত্রীদের সিটের নিচের অংশ, টয়লেটসহ বিভিন্ন স্থানে সোনা লুকিয়ে রাখার ঘটনাও সামনে এসেছে।
অর্থাৎ সোনা চোরাচালানে এখন আর একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতির ওপর নির্ভর করছে না চক্রগুলো। পরিস্থিতি ও নজরদারির ধরন বুঝে কখনো বাহক, কখনো পোশাক, কখনো জুতা কিংবা উড়োজাহাজের ভেতরের বিভিন্ন স্থানকে ব্যবহার করা হচ্ছে।
চোরাচালানে সোনার বার বা বিস্কুটের পাশাপাশি পেস্ট ও গুঁড়া ব্যবহারের অন্যতম কারণ হলো সহজে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা। কঠিন বার বা বিস্কুটের তুলনায় অন্য উপাদানের সঙ্গে মিশিয়ে কিংবা শরীর ও পোশাকে লুকিয়ে এসব বহনের চেষ্টা করা যায়।
তবে কাস্টমস ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং সন্দেহভাজন যাত্রীদের তল্লাশির কারণে এসব কৌশলও ধরা পড়ছে।
দেশের অন্যতম ব্যস্ত বিমানবন্দর শাহজালালে নিয়মিত সোনা উদ্ধারের ঘটনা ঘটছে। ঢাকা কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত প্রথম সাত মাসেই ৫৩ দশমিক ৭২৭ কেজি সোনা উদ্ধার করা হয়েছে।
এর আগে ২০২২–২৩ অর্থবছরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সোনা উদ্ধার করা হয়েছিল। কাস্টমসের অভিযান, গোয়েন্দা তথ্য ও যাত্রীদের তল্লাশির মাধ্যমে এসব চালান শনাক্ত করা হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, চোরাচালানকারীরা একদিকে যেমন নতুন নতুন কৌশল নিচ্ছে, তেমনি কাস্টমস ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও নজরদারি বাড়াচ্ছে। ফলে এক পদ্ধতি ধরা পড়লে পাচারকারীরা দ্রুত অন্য পদ্ধতিতে চলে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
ঢাকা কাস্টম হাউসের অতিরিক্ত কমিশনার মুহাম্মদ কামরুল হাসান বলেছেন, এবারের ঘটনাটি ব্যতিক্রম। এর আগে সোনার বার, বিস্কুট ও জামাকাপড়ের মধ্যে সোনা উদ্ধারের ঘটনা ঘটলেও এবার ডিম্বাকৃতির প্যাকেটে সোনার পেস্ট উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে।
নতুন এই ঘটনায় আবারও স্পষ্ট হলো—সোনা চোরাচালানে পাচারকারীরা কতটা বিচিত্র কৌশল অবলম্বন করছে। তবে কাস্টমসের নজরদারি ও অভিযানের কারণে এসব কৌশলও শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ছে।