ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও ছবি নেওয়ার কয়েক দিন পর এক বিধবার টিপসই নেওয়া হয় একটি কাগজে। এরপরই এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে, ওই নারীর নাকি বিয়ে হয়ে গেছে। এমনকি তাঁর হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় একটি কাবিননামাও। তবে ৪৩ বছর বয়সী ওই বিধবার দাবি, তিনি কোনো বিয়েতে সম্মতি দেননি, এমনকি কোনো কাজিকেও দেখেননি।
ঘটনাটি ঘটেছে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার একটি গ্রামে। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় দুই দফা সালিসও হয়েছে। ভুক্তভোগী নারীর অভিযোগ, স্থানীয় জামায়াতের সহযোগী সদস্য হিসেবে পরিচয় দেওয়া আবদুস ছাত্তার ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে কৌশলে তাঁর টিপসই নেন। পরে সেই টিপসই ব্যবহার করে জালিয়াতির মাধ্যমে বিয়ের কাবিননামা তৈরি করা হয়েছে।
প্রায় ১৩ বছর আগে ওই নারীর স্বামী মারা যান। এরপর মানুষের জমিতে কাজ করে দুই ছেলেকে বড় করে বিয়ে দিয়েছেন তিনি। তাঁর নাতি-নাতনিও রয়েছে।
সম্প্রতি বাড়িতে গিয়ে কথা হলে তিনি বলেন, ‘আমি কোথাও বিয়ে করতে যাইনি। কোনো কাজিকেও দেখিনি।’
তাঁর দাবি, ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলেই তাঁর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও টিপসই নেওয়া হয়েছিল।
এদিকে এলাকায় ছড়িয়ে পড়া কাবিননামায় বর হিসেবে স্থানীয় আবদুল কুদ্দুসের নাম উল্লেখ রয়েছে। জানা গেছে, বিভিন্ন সময় তিনি ওই নারীকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে ওই নারী কখনো তাঁর প্রস্তাবে সম্মতি দেননি বলে দাবি করেছেন।
কুদ্দুসের নিজের সংসারে স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে ও নাতি-নাতনি রয়েছে। ঘটনার বিষয়ে কথা বলতে তাঁর বাড়িতে গেলে তাঁকে পাওয়া যায়নি।
তবে কুদ্দুসের স্ত্রী সুফিয়া খাতুন বলেন, তাঁর স্বামী আগে কখনো বিয়ের বিষয়ে তাঁকে কিছু জানাননি। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর কুদ্দুস দাবি করেন, তিনি ‘কোর্ট ম্যারেজ’ করেছেন। পরিবারের সদস্যরা তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করলেও তিনি কারও কথা শোনেননি বলে জানান সুফিয়া।
ছড়িয়ে পড়া কাবিননামায় কাজি হিসেবে গোলাম মোস্তফার নাম রয়েছে। সেখানে দেনমোহর আড়াই লাখ টাকা এবং ৫০ হাজার টাকা নগদ পরিশোধের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সাক্ষী হিসেবে আবদুল মান্নান ও সাইফুল ইসলামের নামও রয়েছে।
তবে সাইফুল ইসলাম দাবি করেছেন, তিনি ওই বিয়ের কোনো সাক্ষী হননি।
অন্যদিকে কাজি গোলাম মোস্তফা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তিনি এই বিয়ে সম্পন্ন করেননি। তাঁর দাবি, ছড়িয়ে পড়া কাবিননামাটি সম্পূর্ণ জাল। ২০২০ সালেও তাঁর নাম ব্যবহার করে একই ধরনের জাল কাগজ তৈরির ঘটনা ঘটেছিল এবং তখন তিনি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন। এবার বিষয়টি নিয়ে পুলিশের সঙ্গে কথা বলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে আবদুস ছাত্তার তা অস্বীকার করেছেন। নিজেকে জামায়াতের সহযোগী সদস্য হিসেবে পরিচয় দেওয়া এই ব্যক্তির কসমেটিকসের দোকান রয়েছে।
তিনি দাবি করেন, ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে ওই নারীর কাছ থেকে তিনি কোনো টিপসই নেননি। জমিজমা নিয়ে বিরোধের কারণে তাঁকে ফাঁসানো হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
উপজেলা জামায়াতের আমির মো. ফজলুল হক বলেন, বিষয়টি জানার পর স্থানীয় দায়িত্বশীলদের মাধ্যমে খোঁজ নেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, আবদুস ছাত্তার জামায়াতের কোনো পদধারী নেতা নন; আগের নির্বাচনের সময় তিনি একটি কেন্দ্র কমিটির সহযোগী সদস্য ছিলেন। এর আগে তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলেও জানান তিনি।
ফজলুল হক বলেন, বিষয়টি তাঁরা খতিয়ে দেখছেন এবং প্রকৃত অপরাধীদের বিচার হওয়া উচিত। তবে প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনাটি সাজানো বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতও হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
ঘটনাটি নিয়ে গত সোমবার ও বুধবার গ্রামে দুই দফা সালিস হয়েছে। তবে সেখানে আবদুস ছাত্তার ও আবদুল কুদ্দুস কেউই উপস্থিত ছিলেন না।
সালিসে নেতৃত্ব দেওয়া মোহাম্মদ রুস্তম আলী জানান, অভিযুক্তদের শুক্রবার পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে আবদুস ছাত্তার তাঁর অবস্থান স্পষ্ট না করলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ‘কীভাবে কী হলো, আমরা যাচাই করছি। সালিসের মাধ্যমে সমাধান না হলে আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া হবে।’
এ বিষয়ে ফুলবাড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রাশেদুল হাসান বলেন, ঘটনাটি বিভিন্নজনের কাছ থেকে শুনেছেন। তবে এখনো থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।