সুন্দরবনঘেঁষা উপকূলীয় উপজেলা কয়রা থেকে জাতীয় পর্যায়ে ‘গুণী শিক্ষক’ নির্বাচিত হয়ে গর্বের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন মঠবাড়ি সেরাজিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক এম. এম. সেরাজুল ইসলাম সবুজ। তাঁর এই অর্জনে আনন্দ-গর্বে ভাসছে বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ পুরো কয়রার মানুষ।
বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে গত ৫ অক্টোবর রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত জাতীয় পর্যায়ের ‘গুণী শিক্ষক সম্মাননা’ অনুষ্ঠানে সেরাজুল ইসলাম সবুজের হাতে সম্মাননা সনদ ও স্মারক তুলে দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছ থেকে তিনি এ সম্মাননা গ্রহণ করেন। বিশ্ব শিক্ষক দিবসের জাতীয় পর্যায়ের গুণী শিক্ষক সম্মাননা অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষকদের সম্মাননা দেওয়ার বিষয়টি সরকারি ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে।
এর আগে উপজেলা পর্যায়ে সেরা সহকারী শিক্ষক নির্বাচিত হন সেরাজুল ইসলাম সবুজ। পরে জেলা ও খুলনা বিভাগীয় পর্যায়েও শ্রেষ্ঠ সহকারী শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হয়ে জাতীয় পর্যায়ে এই সম্মাননা অর্জন করেন। ২০২৬ সালে খুলনা বিভাগের শ্রেষ্ঠ সহকারী শিক্ষক (পুরুষ) নির্বাচিত হওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।
দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে সেরাজুল ইসলাম সবুজ শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদানেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। শিক্ষার্থীদের নৈতিক মূল্যবোধ, শৃঙ্খলা ও মানবিকতা গড়ে তোলার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নেও তিনি ভূমিকা রেখে চলেছেন। তাঁর আন্তরিকতা, দায়িত্ববোধ ও শিক্ষার্থীবান্ধব আচরণ তাঁকে সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছে আলাদা পরিচিতি এনে দিয়েছে।
নিজের এই অর্জনের পেছনে প্রয়াত বাবার স্বপ্ন ও আদর্শকে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখেন সেরাজুল ইসলাম সবুজ। তাঁর বাবা নিজেও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই বাবার ইচ্ছা ছিল ছেলে পড়াশোনা শেষ করে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হবেন। বাবার সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারলেও এই আনন্দের মুহূর্তে পাশে নেই প্রিয় বাবা—এ বিষয়টি তাঁকে আবেগাপ্লুত করে।
সেরাজুল ইসলাম সবুজ বলেন, ‘আমার বাবা নিজেও একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই তাঁর ইচ্ছে ছিল, আমি পড়াশোনা শেষ করে যেন শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হই। বাবার সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ তিনি বেঁচে নেই। বাবা যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তাহলে আমার এই অর্জনে তিনিই সবচেয়ে বেশি আনন্দিত ও গর্বিত হতেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাবার আদর্শ ও শিক্ষকতার প্রতি তাঁর ভালোবাসাকে বুকে ধারণ করেই আমি এই পেশায় এসেছি। একজন শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই আমার প্রধান লক্ষ্য। জাতীয় পর্যায়ে যে স্বীকৃতি পেয়েছি, তা আমার দায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ভবিষ্যতেও সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে চাই।’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাখন লাল মণ্ডল বলেন, সেরাজুল ইসলাম সবুজ অত্যন্ত আন্তরিক একজন শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় শাসনের পাশাপাশি তিনি তাদের ভালোবাসা ও সহযোগিতাও করেন। বিদ্যালয়ের বাইরেও সহকর্মী ও এলাকার মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘সেরাজুল ইসলাম সবুজের এই অর্জনে আমরা শিক্ষক পরিবার এবং পুরো কয়রাবাসী গর্বিত।’
বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভাষ্য, জাতীয় পর্যায়ে সেরাজুল ইসলাম সবুজের এই স্বীকৃতি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এটি মঠবাড়ি সেরাজিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং কয়রার শিক্ষা অঙ্গনেরও বড় সম্মান। তাঁর সাফল্য উপকূলের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অন্য শিক্ষকদেরও শিক্ষার্থীদের কল্যাণে আরও আন্তরিকভাবে কাজ করতে অনুপ্রেরণা দেবে।
কয়রার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে জাতীয় পর্যায়ে গুণী শিক্ষক হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ায় সেরাজুল ইসলাম সবুজকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অভিনন্দন জানিয়েছেন। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, তাঁর এই সাফল্য উপকূলীয় অঞ্চলের শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করবে এবং শিক্ষার্থীদের আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টাকে আরও বেগবান করবে।