নেত্রকোনার মদনে নদীভাঙন থেকে বিদ্যালয় রক্ষার জরুরি প্রকল্পের কাজে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার বাগজান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রক্ষায় মগড়া নদীর তীরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রায় ২০ লাখ টাকার প্রকল্পে প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজ না করার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় এক ব্যক্তি।
এ ঘটনায় গত ২০ সেপ্টেম্বর হোসাইন কবির নামে এক ব্যক্তি জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগের পর বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীকে নির্দেশ দিয়েছেন জেলা প্রশাসক।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাগজান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে মগড়া নদীর ভাঙন থেকে রক্ষায় ৮০ মিটার এলাকায় জরুরি ভাঙন প্রতিরোধ প্রকল্প নেওয়া হয়। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ১৯ লাখ ৮২ হাজার ২৮২ টাকা।
প্রাক্কলন অনুযায়ী, প্রকল্পে ১২ মিটার দীর্ঘ ১৩টি শক্ত কাঠের বল্লা এবং ৮০ মিটার এলাকায় অন্তত ৩৯টি ব্যারাক বাঁশের পাইলিং দেওয়ার কথা। পাশাপাশি নির্ধারিত ওজনের ৩ হাজার ১২৫টি জিও-ব্যাগে বালু ডাম্পিং এবং আরও ১ হাজার ২১০টি জিও-ব্যাগে শুকনো বালু দিয়ে নদীর তীরে স্থাপন করার কথা রয়েছে। এসব বালু ওজন করে নির্ধারণেরও বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে অভিযোগকারীর দাবি, প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজ না করে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয়দের না জানিয়ে ঠিকাদার নিজের মতো করে কাজ করেছেন। শুকনো বালুর পরিবর্তে ভেজা বালু ব্যবহার, শক্ত কাঠের বল্লার পরিবর্তে মেহগনি গাছের ডাল দিয়ে পাইলিং এবং নির্ধারিত উপকরণ ব্যবহার না করার অভিযোগও করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজ চলার সময় অনিয়মের অভিযোগ তুলে স্থানীয় ইউপি সদস্যসহ গ্রামের কয়েকজন কাজ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। পরে প্রাক্কলন সম্পর্কে স্থানীয়দের অবহিত না করেই আবার কাজ শুরু করে শেষ করা হয়।
বুধবার (৭ অক্টোবর) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নদীভাঙন রোধ প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। তবে কাজের মান ও ব্যবহৃত উপকরণ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।
বাগজান গ্রামের বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম আকন্দ বলেন, বিদ্যালয়টি রক্ষায় প্রকল্প নেওয়ায় তারা আশাবাদী হয়েছিলেন। কিন্তু স্থানীয়দের না জানিয়ে কাজ করায় তারা হতাশ। প্রকল্পের কাজ তদন্ত করে অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা পুতুল মিয়ার দাবি, পানি কমে যাওয়ার পর প্রকল্পের কাজে ব্যবহৃত উপকরণ ও কাজের ধরন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তার ভাষ্য, প্রকল্পের কাজ দেখে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তিয়শ্রী ইউনিয়নের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুল্লাহ বলেন, ঠিকাদার একদিন তাকে ডেকে একটি বালুর বস্তা ওজন করে দেখিয়েছিলেন। সেখানে প্রায় ২৮০ কেজি বালু ছিল। তবে ওই বালু ভেজা ছিল বলে দাবি করেন তিনি। প্রকল্পের প্রাক্কলনে কী কী কাজ রয়েছে, তা তিনি জানেন না বলেও জানান।
অভিযোগকারী হোসাইন কবির বলেন, বাগজান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রক্ষা প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। এ কাজে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার যোগসাজশ রয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
তবে ঠিকাদারের প্রতিনিধি উজ্জ্বল তালুকদার অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে তাদের জানানো হয়েছে যে জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ যাওয়ার পর সংশ্লিষ্টদের ডাকা হয়েছে। তবে প্রকল্পের কাজে কোনো অনিয়ম করা হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, কোনো প্রকল্প দেওয়ার ক্ষমতা তার নেই। এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর বক্তব্য নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
বাগজান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাদেকুর রহমান বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে অনিয়মের খবর প্রকাশের পর ঠিকাদার জিও-ব্যাগ নদীতে ফেলার সময় তাকে বা বিদ্যালয়ের পিয়নকে ডেকে নিয়েছেন। তবে এর আগে পাইলিংয়ে ব্যবহৃত বল্লাসহ অন্যান্য উপকরণ পরিবর্তন করা হয়নি। জিও-ব্যাগে ভেজা বালু ব্যবহারের অভিযোগও করেন তিনি। কাজ শেষ হওয়ার কয়েকদিন পার হলেও প্রকল্পের প্রাক্কলন সম্পর্কে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে কিছু জানানো হয়নি বলে দাবি তার।
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, মদনের বাগজান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রক্ষা প্রকল্পে অনিয়মের একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীকে বলা হয়েছে।