মাদকের পেছনে অস্ত্র, সামনে লাশ

শাকিল আহমেদ

জাতীয়

রকিবুল হাসান ওরফে পেপার সামি থাকতেন সাভারের বাসায়। তবে মাদকের মামলায় দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে থাকার পর জামিনে বেরিয়েছিলেন তিনি। এরপর

2026-10-05T11:45:26+00:00
2026-10-05T11:45:26+00:00
  মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬,
২১ আশ্বিন ১৪৩৩
 
মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬
জাতীয়
মাদকের পেছনে অস্ত্র, সামনে লাশ
টাকা ভাগাভাগি, বাজার দখল ও আধিপত্যের বিরোধে বাড়ছে সহিংসতা
শাকিল আহমেদ
সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৪৫ এএম 
প্রতীকী ছবি
রকিবুল হাসান ওরফে পেপার সামি থাকতেন সাভারের বাসায়। তবে মাদকের মামলায় দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে থাকার পর জামিনে বেরিয়েছিলেন তিনি। এরপর ঢাকায়ও ফেরেননি। কিন্তু এক রাতে একটি গাড়িতে করে তাঁকে সাভার থেকে আনা হয় ঢাকায়। পরদিন সকালে রাজধানীর মিরপুর-১১ নম্বরের মিল্লাত ক্যাম্পসংলগ্ন ডায়মন্ড স্কুলের সামনে থেকে উদ্ধার করা হয় তাঁর গলাকাটা লাশ। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে মাদক বেচাকেনা নিয়ে বিরোধের বিষয়টি সামনে এসেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, নিহত রকিবুল যেমন মাদক কারবারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, সন্দেহভাজন হত্যাকারীদেরও একই চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। অর্থাৎ মাদকের বাজার, টাকা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ শেষ হয়েছে হত্যাকান্ডে।

রকিবুলের এই পরিণতি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাদককে কেন্দ্র করে সংঘাত, হামলা ও হত্যার ঘটনা ঘটছে। কোথাও মাদক বিক্রির টাকা ভাগাভাগি নিয়ে গুলি, কোথাও এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিপক্ষকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা, আবার কোথাও মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় সাধারণ মানুষও হামলার শিকার হচ্ছেন। ফলে মাদক এখন শুধু জনস্বাস্থ্যের সমস্যা নয়; অবৈধ অর্থ, অস্ত্র ও গ্যাংয়ের সঙ্গে এর যোগসূত্র আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।

টাকার ভাগ নিয়ে গোলাগুলি : গত আগস্টে রাজধানীর পল্লবীতে মাদক বিক্রির ১৫ লাখ টাকা ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধের জেরে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় কথিত মাদক কারবারি ও সন্ত্রাসী ‘ল্যাংড়া’ রুবেলসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। তাঁদের কাছ থেকে বিদেশি পিস্তল, গুলি ও ম্যাগাজিন উদ্ধার করা হয়। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে মাদক বিক্রির বিপুল টাকা ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধের তথ্য উঠে আসে। অর্থাৎ মাদক কারবারের সঙ্গে যুক্ত অর্থই একপর্যায়ে অস্ত্রের ব্যবহার ও সংঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এর কয়েক সপ্তাহ পর সেপ্টেম্বরের শুরুতে যাত্রাবাড়ীর ধলপুরে মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ ও এলাকার আধিপত্য নিয়ে বিরোধে ইমরান হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁদের কাছ থেকে অস্ত্র, গুলি, ককটেল ও ধারালো অস্ত্র উদ্ধারের কথা জানানো হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত কোনো চক্রের সদস্য গ্রেপ্তার বা কারাগারে গেলে তার নিয়ন্ত্রিত এলাকা ও বাজার দখলে নিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে অন্যরা। এ কারণে পুরোনো কারবারিদের ‘শূন্যস্থান’ নিয়েও নতুন করে সংঘাত তৈরি হচ্ছে।

বাধা দিলেই হামলা : মাদককেন্দ্রিক সহিংসতার শিকার শুধু কারবারিরা নন। মাদক বিক্রি বা সেবনে বাধা দেওয়ার কারণেও সাধারণ মানুষকে হামলার মুখে পড়তে হচ্ছে। জুনে রাজধানীর কদমতলীতে মাদক কারবারে বাধা দেওয়ায় রাসেল নামের ২৮ বছর বয়সী এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। তিনি একটি রডের কারখানায় কাজ করতেন। একই মাসে কাফরুলে মাদক কারবারে বাধা দেওয়ার অভিযোগে এক মোটরসাইকেল আরোহীর মাথায় ইট ছুড়ে মারার ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আগস্টে সূত্রাপুরে মাদক সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে ১৮ বছর বয়সী পোশাককর্মী মিতুল ইসলামকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। মামলার প্রধান আসামি পরে আদালতে জবানবন্দি দেন। সেপ্টেম্বরের শুরুতে ডেমরায় মাদক সেবন নিয়ে বিরোধের জেরে দেলোয়ার হোসেন নামের ৫০ বছর বয়সী এক রিকশাচালককে ইট দিয়ে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। তাঁর পরিচিত রনিকে আটক করে পুলিশ। ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, মাদকের সহিংসতা এখন শুধু মাদক কারবারিদের মধ্যকার সংঘাতে সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব পড়ছে পরিবার, প্রতিবেশী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ওপরও।

ইয়াবা, বিরোধ ও হত্যাকান্ড : রাজধানীর মধ্য বাড্ডার মামুন শিকদার হত্যার তদন্তেও মাদকের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পেয়েছিল পুলিশ। তদন্তে বলা হয়, মাদক সেবনকে কেন্দ্র করে মামুনের সঙ্গে তামিম ও হৃদয়ের বিরোধ তৈরি হয়েছিল। পরে তাঁকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় ওই দুজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ায় শোভো দাস হত্যার ঘটনাতেও ঘটনাস্থলের পাশে ইয়াবা উদ্ধারের কথা জানিয়েছিল পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে মাদক-সংক্রান্ত একাধিক মামলা ছিল। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা ছিল, মাদক নিয়ে বিরোধের জেরেই হত্যাকান্ডটি ঘটতে পারে। নোয়াখালীর কবিরহাটেও মাদক সেবন ও বিক্রির প্রতিবাদ করায় ফারুক নামের এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মাদক কারবারিদের সঙ্গে তাঁর আগে থেকেই বিরোধ ছিল। এসব ঘটনা একসঙ্গে দেখলে একটি প্রবণতা স্পষ্ট হয়—মাদক কারবার যখন বিপুল অর্থের উৎস হয়ে ওঠে, তখন সেই অর্থের নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে গড়ে ওঠে প্রতিযোগিতা। আর সেই প্রতিযোগিতায় অস্ত্র ও সহিংসতার ব্যবহার বাড়তে থাকে।

হত্যার সামগ্রিক চিত্রও উদ্বেগজনক : মাদক-সম্পর্কিত হত্যাকান্ডের আলাদা জাতীয় পরিসংখ্যান নেই। তবে সামগ্রিক হত্যাকান্ডের সংখ্যা পরিস্থিতির একটি ধারণা দেয়। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ২ হাজার ৭৬টি হত্যা মামলা হয়েছে। বছরের প্রথম ছয় মাসে মামলা হয়েছে ১ হাজার ৭৭৮টি, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। ওই ছয় মাসে ঢাকা বিভাগে ৪১১টি হত্যা মামলা হয়েছে, যা বিভাগগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। 
অপরাধ বিশ্লেষকেরা অবশ্য বলছেন, প্রতিটি হত্যাকান্ডের সঙ্গে মাদকের যোগসূত্র খোঁজা ঠিক হবে না। তবে মাদক যখন অবৈধ অর্থ, অস্ত্র, গ্যাং, দখল ও স্থানীয় আধিপত্যের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন এটি অন্যান্য অপরাধের অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।

গ্রেপ্তারের পরও থেকে যায় শূন্যস্থান : আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য এখানেই বড় চ্যালেঞ্জ। একজন মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। তাঁর নিয়ন্ত্রিত বাজার বা এলাকায় নতুন চক্রের উত্থান ঠেকানোও জরুরি।

ডিএমপির কর্মকর্তারা সম্প্রতি বলেছেন, মাদক ও চাঁদাবাজির সঙ্গে যুক্ত অপরাধীরা কারাগারে গেলে তাদের তৈরি করা শূন্যস্থান যেন অন্য কোনো গ্যাং দখল করতে না পারে, সে বিষয়ে নজরদারি করা হচ্ছে। সম্প্রতি আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকিরও বলেন, মাদক কারবারিদের অনেককে একাধিকবার আইনের আওতায় আনা হলেও আইনের ফাঁকফোকরের কারণে তাঁদের দীর্ঘদিন কারাগারে রাখা সম্ভব হয় না। পরে তাঁরা আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। সেপ্টেম্বরের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় তিনি মাদকবিরোধী অভিযানে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা (নাম প্রকাশ না করার শর্তে) ভোরের ডাককে বলেন, বিভিন্ন সময়ে কিছু রাজনৈতিক নেতার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে মাদক কারবারিরা সক্রিয় হয়ে ওঠার অভিযোগ পাওয়া যায়। এসব অভিযোগের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নজরদারি করছে। মাদক ও অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে মাদক, অস্ত্র ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান নিয়মিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে।

ভাঙতে হবে পুরো নেটওয়ার্ক : অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, মাদককেন্দ্রিক সহিংসতা ঠেকাতে শুধু খুচরা বিক্রেতা, বাহক কিংবা ব্যবহারকারীকে গ্রেপ্তার করে দীর্ঘমেয়াদি ফল পাওয়া কঠিন। মাদকের উৎস, সরবরাহব্যবস্থা, অবৈধ অর্থের প্রবাহ, অস্ত্রের উৎস এবং স্থানীয় পৃষ্ঠপোষকতার নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করতে হবে।
মাদক-সংক্রান্ত মামলায় গডফাদারদের শনাক্ত ও আর্থিক অনুসন্ধান জোরদার করাও জরুরি। কারণ একটি চক্রের একজন সদস্য গ্রেপ্তার হলেও অর্থ ও সরবরাহের নেটওয়ার্ক অক্ষত থাকলে তাঁর জায়গা নিতে আরেকজন এগিয়ে আসবে।

রকিবুল হাসান ওরফে পেপার সামির হত্যাকান্ড তাই শুধু একটি খুনের ঘটনা নয়। এর পেছনে থাকা মাদক কারবার, অর্থ ও আধিপত্যের দ্বন্দ্বই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোও একই বার্তা দিচ্ছে, মাদকের বাজার যত বড় হচ্ছে, তাকে নিয়ন্ত্রণের লড়াই তত বেশি সহিংস হয়ে উঠছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে তাই চ্যালেঞ্জ শুধু লাশ উদ্ধারের পর হত্যাকারীকে গ্রেপ্তার করা নয়; যে অবৈধ অর্থ, মাদক ও অস্ত্রের নেটওয়ার্ক থেকে এসব হত্যাকান্ডের জন্ম হচ্ছে, সেটির শিকড় পর্যন্ত পৌঁছানো।



Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: