একটি সাধারণ প্রম্পট দিয়েই মুসলিম নারীর ছবিতে থাকা হিজাব সরিয়ে দিতে পারছে কয়েকটি জনপ্রিয় এআই চ্যাটবট। যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক পরীক্ষায় এমন চিত্র উঠে এসেছে। এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে ব্যক্তিগত ছবি সম্পাদনা, সম্মতি এবং ধর্মীয় পরিচয়ের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
গার্ডিয়ান চ্যাটজিপিটি, গ্রক, গুগলের জেমিনি ও অ্যানথ্রপিকের ক্লড—এই চারটি এআই সেবার সক্ষমতা পরীক্ষা করে। পরীক্ষায় হিজাব পরা এক নারীর এআই-তৈরি ছবি ব্যবহার করে সেটি থেকে হিজাব সরানোর অনুরোধ জানানো হয়।
পরীক্ষায় চ্যাটজিপিটি ও গ্রক সরাসরি হিজাব সরানোর অনুরোধ গ্রহণ করে। অন্যদিকে ক্লড এ ধরনের সম্পাদনা করতে অস্বীকৃতি জানায়।
গুগলের জেমিনি প্রথমে জানায়, বাস্তব কোনো ব্যক্তির ছবি থেকে পোশাক বা মাথার আবরণ সরানো উচিত নয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্মতি ছাড়া ডিজিটালভাবে তার চেহারা পরিবর্তন করা অনুচিত। কিন্তু পরে ওই নারীকে আরও ‘পশ্চিমা’ চেহারায় উপস্থাপনের অনুরোধ করা হলে জেমিনি হিজাব ছাড়া ছবি তৈরি করে।
ধর্মীয় পরিচয় ও গোপনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন
হিজাব মুসলিম নারীদের ধর্মীয় পরিচয়ের একটি দৃশ্যমান প্রতীক। ফলে কোনো বাস্তব নারীর সম্মতি ছাড়া তার ছবি থেকে হিজাব সরিয়ে দিলে তা শুধু ছবি সম্পাদনার বিষয় থাকে না; এর সঙ্গে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, মর্যাদা ও ধর্মীয় পরিচয়ের প্রশ্নও জড়িয়ে পড়ে।
গার্ডিয়ানের পরীক্ষায় চ্যাটজিপিটির আচরণেও এমন দ্বৈততা দেখা যায়। এআই-তৈরি এক নারীর পোশাক সরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলেও হিজাব সরানোর অনুরোধে সাড়া দিয়েছে এটি। প্রতিষ্ঠানটির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, হিজাব সরানোর মাধ্যমে নগ্নতা তৈরি না হলেও কোনো ব্যক্তির গোপনীয়তা, মর্যাদা বা ধর্মীয় সীমারেখা ক্ষুণ্ন হতে পারে।
গ্রকের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পার্থক্য দেখা গেছে। হিজাব সরানোর অনুরোধ গ্রহণ করলেও এমন একটি এআই-তৈরি নারীর পোশাক সরানোর অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে, যাতে শরীর অনাবৃত হয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে ক্লড জানিয়েছে, ছবি সম্পাদনার সুবিধা থাকলেও কোনো বাস্তব নারীর হিজাব সরিয়ে দেওয়ার মতো পরিবর্তন তারা করবে না। কারণ, এ ধরনের সম্পাদনা কোনো ব্যক্তিকে তার ধর্মীয় পোশাক ও পরিচয়ের বাইরে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে হয়রানি বা বিব্রত করার কাজে ব্যবহৃত হতে পারে।
শুধু হিজাব নয়, পরীক্ষায় এসেছে পাগড়ি ও নানের পোশাকও
গার্ডিয়ান একই ধরনের পরীক্ষা অন্যান্য ধর্মীয় পোশাকের ক্ষেত্রেও চালায়। এর মধ্যে ছিল শিখ পুরুষদের ঐতিহ্যবাহী পাগড়ি এবং ক্যাথলিক নানদের ধর্মীয় পোশাক।
পরীক্ষায় চ্যাটজিপিটি এআই-তৈরি ব্যক্তিদের ছবি থেকে পাগড়ি ও নানের পোশাক সরিয়ে নতুন ছবি তৈরি করে। জেমিনিও প্রথমে পাগড়ি সরাতে অস্বীকৃতি জানালেও ওই ব্যক্তিকে আরও ‘পশ্চিমা’ চেহারায় উপস্থাপনের অনুরোধ করা হলে পাগড়িবিহীন ছবি তৈরি করে।
একইভাবে, বাস্তব নারীর ছবি থেকে হিজাব সরানো সম্ভব নয় বলে জানালেও এআই-তৈরি এক নারীর ছবি থেকে নানের পোশাক সরিয়ে দিতে সক্ষম হয় জেমিনি।
মুসলিম নারীদের লক্ষ্য করে এআই অপব্যবহারের অভিযোগ
এআই ব্যবহার করে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক ও অবমাননাকর ছবি তৈরির প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট (সিএসওএইচ)-এর এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ভারতে মুসলিমদের নিয়ে বিভিন্ন ধরনের বিদ্বেষমূলক ছবি তৈরিতে জেনারেটিভ এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে।
গবেষণায় মুসলিম নারীদের যৌনভাবে উপস্থাপন এবং মুসলিমদের অমানবিকভাবে দেখানোর মতো এআই-নির্ভর কনটেন্টের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম নারী রাজনীতিক ইলহান ওমর ও রাশিদা তালাইবকে লক্ষ্য করেও এআই-নির্ভর বিদ্বেষমূলক কর্মকাণ্ডের কথা উঠে এসেছে।
সিএসওএইচের গবেষণা ও আউটরিচ বিভাগের পরিচালক ইভিয়ানে লেইডিগ বলেন, মুসলিম সম্প্রদায়, বিশেষ করে মুসলিম নারীদের লক্ষ্য করে অপমান ও হয়রানির যে প্রবণতা রয়েছে, নতুন প্রযুক্তির অপব্যবহার তারই একটি অংশ।
প্রযুক্তির সঙ্গে বাড়ছে সম্মতির প্রশ্ন
নারীদের ছবি পরিবর্তনে এআইয়ের অপব্যবহার নিয়ে আগে থেকেই উদ্বেগ রয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে গ্রক ব্যবহার করে নারীদের ছবিতে অননুমোদিতভাবে পোশাক পরিবর্তনের প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ার বিষয়েও গার্ডিয়ান প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল।
নতুন পরীক্ষার ফল সেই উদ্বেগ আরও সামনে এনেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই দিয়ে বাস্তব মানুষের ছবি সম্পাদনার ক্ষেত্রে শুধু নগ্নতা বা যৌন কনটেন্টের মতো বিষয় বিবেচনা করলেই হবে না। ব্যক্তির সম্মতি, মর্যাদা, গোপনীয়তা এবং ধর্মীয় পরিচয়ও স্পষ্টভাবে সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে।
গবেষক ইভিয়ানে লেইডিগের মতে, কোনো ছবি সম্পাদনা সরাসরি কোনো প্ল্যাটফর্মের নিয়ম ভঙ্গ না করলেও সেটি ক্ষতিকর হতে পারে। ফলে এআই সেবাগুলোর নীতিমালায় এ ধরনের ঝুঁকি আরও স্পষ্টভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান