এআইয়ের দাপটে কমছে কর্মসংস্থান

সোহাগ রাসিফ

তথ্যপ্রযুক্তি

বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত বিকাশ নীরব বিপ্লব আনছে কর্মসংস্থানের মাঠে। এআই প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে কাজের ধরন বদলে যাওয়ার

2026-09-18T11:55:54+00:00
2026-09-18T11:55:54+00:00
  শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৩ আশ্বিন ১৪৩৩
 
শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
তথ্যপ্রযুক্তি
এআইয়ের দাপটে কমছে কর্মসংস্থান
বাড়ছে ডাটা-প্রযুক্তিনির্ভরতা
সোহাগ রাসিফ
শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৫৫ এএম 
প্রতীকী ছবি
বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত বিকাশ নীরব বিপ্লব আনছে কর্মসংস্থানের মাঠে। এআই প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে কাজের ধরন বদলে যাওয়ার পাশাপাশি মানুষের চাকরি ও জীবিকা নিয়ে এক নতুন সামাজিক রূপান্তর তৈরি হচ্ছে। একদিকে সাধারণ গ্রাহকসেবা ও ব্যাংক টেলারের মতো গতানুগতিক পদগুলো স্বয়ংক্রিয়তার মুখে পড়েছে, অন্যদিকে ডাটা সায়েন্স, মেশিন লার্নিং ও সাইবার নিরাপত্তার মতো তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর খাতে উন্মোচিত হচ্ছে কাজের নতুন দিগন্ত। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘ফিউচার অব জবস রিপোর্ট ২০২৫’ অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ চাকরি বিলুপ্তির মুখে পড়বে, কিন্তু একইসাথে ১৭ কোটি নতুন ধরনের চাকরির সুযোগও তৈরি হবে।

তথ্য বা ‘ডেটা’কে বলা হচ্ছে একবিংশ শতাব্দীর মূল জ্বালানি। আর এই ডেটাকে ব্যবহারযোগ্য করে তোলার জন্য ডাটা সায়েন্টিস্ট, এআই ও মেশিন লার্নিং স্পেশালিস্ট, সাইবার সিকিউরিটি অ্যানালিস্ট এবং ফিনটেক ইঞ্জিনিয়ারদের চাহিদা রকেটের গতিতে বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কাস্টমার সার্ভিস বা অফিসের কিছু গতানুগতিক কাজে প্রায় ২ লাখ মানুষ চাকরি হারালেও এআই কেন্দ্রিক ডাটা সেন্টার, বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও সফটওয়্যার খাতে প্রায় ১০ লাখ নতুন চাকরির সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে প্রযুক্তির নৈতিক ও কৌশলগত ব্যবহারের জন্য ‘প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ার’, ‘এআই এথিসিস্ট’, ‘এআই ট্রেনার’ এবং মানুষ ও যন্ত্রের মধ্যে সমন্বয়ের জন্য ‘হিউম্যান-মেশিন টিমিং ম্যানেজার’ এর মতো নতুন নতুন পদের উদ্ভব ঘটছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির প্রথম ধাক্কাটি আসছে মূলত নিয়মভিত্তিক, পুনরাবৃত্তিমূলক এবং কম সৃজনশীল কাজগুলোর ওপর। অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রিকগনিশন (ওসিআর) এবং রোবোটিক প্রসেস অটোমেশন সফটওয়্যার আসার পর অফিস ও প্রশাসনের ব্যাক-অফিস কাজ যেমন: ডেটা এন্ট্রি অপারেটর, পোস্টাল ক্লার্ক, ব্যাংক টেলার ও সাধারণ ফাইল ব্যবস্থাপনার কাজ মানুষের চেয়ে দ্রুত ও নির্ভুলভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। গ্রাহকসেবা বা কল সেন্টারের কর্মীদের একটি বড় অংশকে প্রতিস্থাপন করছে এআই-চালিত চ্যাটবট ও ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট। এমনকি বুককিপিং, ইনভয়েসিং, প্রাথমিক অডিটিং এবং আর্থিক জালিয়াতি শনাক্তকরণের কাজও অ্যালগরিদম দিয়ে করানো সম্ভব হচ্ছে।

এই পরিবর্তন শুধু শারীরিক বা কায়িক শ্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এআই সরাসরি মানুষের জ্ঞানীয় বা কগনিটিভ দক্ষতাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। ফলে হিসাবরক্ষক, কাস্টমার সার্ভিস কিংবা সাধারণ সফটওয়্যার টেস্টিংয়ের মতো ‘হোয়াইট কলার’ বা বুদ্ধিবৃত্তিক পেশাগুলোতেও কর্মসংস্থান কমার বড় আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘের ‘জেন্ডার স্ন্যাপশট ২০২৫’ রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রায় ২৮ শতাংশ নারী কর্মী এআই দ্বারা প্রতিস্থাপনের ঝুঁকিতে রয়েছেন, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ২১ শতাংশ। নারীরা মূলত প্রশাসনিক ও গ্রাহকসেবামূলক পদে বেশি নিয়োজিত থাকায় প্রযুক্তিগত এই পরিবর্তনের ধাক্কা তাদের ওপর বেশি পড়ছে।

চাহিদার শীর্ষে ডাটা-প্রযুক্তিনির্ভর পেশা: একদিকে পুরোনো ও নিয়মভিত্তিক কাজ সংকুচিত হলেও, প্রযুক্তিকে পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ ও এর ধারা বজায় রাখার জন্য তৈরি হচ্ছে নতুন চাকরির বিশাল বাজার। প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর ওপর পরিচালিত একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব প্রতিষ্ঠান এআই প্রযুক্তিতে নিয়মিত বিনিয়োগ করছে, তাদের কর্মী সংখ্যা গড়ে ১০ শতাংশর বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। ডাটা সেন্টার নির্মাণ, বিদ্যুৎ অবকাঠামো এবং সফটওয়্যার উন্নয়নকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে।

প্রযুক্তির জোয়ার থাকলেও যেসব কাজে মানবিক বোধ, অনুভূতি, সহানুভূতি, নৈতিক বিচার বা জটিল বাস্তব পরিস্থিতি সামলানোর প্রয়োজন হয়, সেগুলো এআই সহজে দখল করতে পারছে না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এনথ্রোপিকের বিশ্লেষণে ২২টি পেশাকে তুলনামূলক নিরাপদ বা ‘এআই-প্রতিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা খাতের চিকিৎসক, নার্স, থেরাপিস্ট ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ; শিক্ষা খাতের শিক্ষক; আইন খাতের বিচারক ও আইনজীবী; এবং শিল্প-সাহিত্যের লেখক, শিল্পী ও সঙ্গীতশিল্পীরা। পাশাপাশি হাতেকলমে দক্ষতা ও উপস্থিত বুদ্ধিনির্ভর কাজ, যেমন ইলেকট্রিশিয়ান, কলের মিস্ত্রি, কনস্ট্রাকশন ম্যানেজার ও কৃষিকাজের মতো পেশাগুলোতে এআইয়ের প্রভাব খুবই সীমিত।

বাংলাদেশের শ্রমবাজার: বৈশ্বিক এই পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের শ্রমবাজারেও পড়তে শুরু করেছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এক নীতিপত্রে সতর্ক করে জানিয়েছে, অটোমেশনের কারণে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পে ১২ লাখ ২০ হাজার চাকরি ঝুঁকিতে পড়তে পারে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে এই খাতের প্রায় ৬০ শতাংশ নারী কর্মী স্থানচ্যুত হতে পারেন। অথচ বর্তমানে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন খাতে বাংলাদেশের সরকারি ব্যয় জিডিপির মাত্র ১.৩ শতাংশ, যা ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অপর্যাপ্ত। এ জন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা (টিভিইটি) সংস্কার, কর্মরত শ্রমিকদের নিয়মিত পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং একটি শক্তিশালী লেবার মার্কেট ইনফরমেশন সিস্টেম (এলএমআইএস) গড়ে তোলার জোর তাগিদ দিচ্ছেন গবেষকরা।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এক অধ্যাপক ভোরের ডাককে বলেন,  এআই প্রযুক্তি আসার পর চাকরির বাজার কমেনি বরং কাজের নানাবিধ সেক্টর বেড়েছে। আগামী দিনে শুধু ডিগ্রি বা মুখস্থ বিদ্যার চেয়ে নিয়োগকর্তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বিশ্লেষণাত্মক ও সৃজনশীল চিন্তাভাবনা এবং প্রযুক্তিগত সাক্ষরতা। যন্ত্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতা না করে যন্ত্রকে সঙ্গে নিয়ে নিজের মানবিকতা-দক্ষতা বাড়াতে পারলে এআই যুগে কর্মসংস্থানের বৈপ্লবিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো সম্ভব হবে।



Loading...
Loading...

তথ্যপ্রযুক্তি- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: