যে যুদ্ধ এতদিন কেবল কল্পবিজ্ঞানের পর্দায় দেখা গেছে, সেই ‘নক্ষত্র যুদ্ধ’ এবার বাস্তবতার আরও কাছে চলে এসেছে। পৃথিবীর কক্ষপথে প্রথমবারের মতো সরাসরি আক্রমণাত্মক সামরিক অস্ত্র মোতায়েনের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের এই ঘোষণায় মহাকাশকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, মহাকাশে সামরিক আধিপত্যের প্রতিযোগিতা শুরু হলে এর প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্র, চীন বা রাশিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; ঝুঁকিতে পড়তে পারে গোটা বিশ্বের যোগাযোগ ও স্যাটেলাইট ব্যবস্থা।
মার্কিন বিমানবাহিনী মন্ত্রী ট্রয় মেঙ্ক চলতি সপ্তাহে ‘এয়ার, স্পেস অ্যান্ড সাইবার কনফারেন্সে’ বলেন, ক্রমবর্ধমান হুমকি মোকাবিলায় মার্কিন সামরিক বাহিনী মহাকাশে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। শত্রুভাবাপন্ন কোনো দেশের আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ থেকে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা সুরক্ষিত করতেই কক্ষপথে অস্ত্র মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে ঠিক কী ধরনের অস্ত্র মোতায়েন করা হয়েছে এবং কখন তা কক্ষপথে পাঠানো হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে রাজি হননি মার্কিন এই কর্মকর্তা।
কেন মহাকাশে অস্ত্রের দৌড়?
মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের দাবি, চীন ও রাশিয়া এমন প্রযুক্তি তৈরি করছে, যা সংঘাতের সময় মার্কিন যোগাযোগব্যবস্থা, গোয়েন্দা নজরদারি এবং জিপিএস স্যাটেলাইট অকার্যকর বা ধ্বংস করতে পারে। ফলে নিজেদের স্যাটেলাইট ও মহাকাশভিত্তিক সামরিক অবকাঠামো রক্ষায় পাল্টা সক্ষমতা গড়ে তোলাকে জরুরি মনে করছে ওয়াশিংটন।
ইউএস স্পেস ফোর্সের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, মহাকাশে শত্রুভাবাপন্ন শক্তিকে প্রতিহত ও নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবেই এই সক্ষমতা তৈরি করা হয়েছে। প্রয়োজনে প্রতিপক্ষের মহাকাশভিত্তিক সক্ষমতা ব্যাহত, ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস করতে কাইনেটিক ও নন-কাইনেটিক—দুই ধরনের পদ্ধতি ব্যবহারের কথাও বলা হয়েছে।
কী ধরনের অস্ত্র হতে পারে?
মার্কিন প্রশাসন অস্ত্রটির প্রকৃতি প্রকাশ না করলেও মহাকাশ বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি সম্ভাবনার কথা বলছেন। এর মধ্যে রয়েছে ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার বা রেডিও জ্যামিং ব্যবস্থা, যা শত্রু স্যাটেলাইটের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে পারে।
আরেকটি সম্ভাবনা হলো ‘কাইনেটিক কিল ভেহিকল’। উচ্চ গতিতে কোনো স্যাটেলাইটে সরাসরি আঘাত করে সেটিকে ধ্বংস করতে পারে এ ধরনের ব্যবস্থা। তবে এতে বিপুল পরিমাণ স্পেস ডেব্রি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এসব ধ্বংসাবশেষ আবার অন্য স্যাটেলাইটের জন্যও ভয়ংকর হুমকি তৈরি করতে পারে।
লেজার অস্ত্র নিয়েও গবেষণা
মহাকাশযুদ্ধের সম্ভাব্য অস্ত্র হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই লেজার প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করছে যুক্তরাষ্ট্র। হাইড্রোজেন ফ্লোরাইড, ডিউটেরিয়াম ফ্লোরাইড এবং কেমিক্যাল অক্সিজেন আয়োডিন লেজারের মতো প্রযুক্তি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে পরীক্ষা চালানো হয়েছে।
লেজার অস্ত্রের বড় সুবিধা হলো—এতে প্রচলিত গোলাবারুদের প্রয়োজন হয় না এবং আলোর গতিতে শক্তি লক্ষ্যবস্তুর দিকে পাঠানো যায়। তবে দ্রুতগতিতে চলা স্যাটেলাইটকে নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তু করা এবং মহাকাশে প্রয়োজনীয় বিপুল শক্তির জোগান নিশ্চিত করা এখনো বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ।
পার্টিকেল বিমের ভাবনাও আছে
মহাকাশযুদ্ধের আরেক সম্ভাব্য প্রযুক্তি ‘পার্টিকেল বিম’ বা কণা-রশ্মি অস্ত্র। এতে ইলেকট্রন, প্রোটন বা অন্যান্য সাব-অ্যাটমিক কণাকে অত্যন্ত উচ্চ গতিতে ছুড়ে লক্ষ্যবস্তুর ওপর প্রচণ্ড শক্তি প্রয়োগ করা হয়।
তবে এ ধরনের অস্ত্র পরিচালনার জন্য বিপুল পরিমাণ শক্তি প্রয়োজন। মহাকাশে এমন শক্তির উৎস বহনযোগ্য ও কার্যকরভাবে তৈরি করা এখনো বিজ্ঞানীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
চীন-রাশিয়ার সঙ্গে বাড়ছে উত্তেজনা
যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘোষণার পর মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। চীন মঙ্গলবার মহাকাশে সামরিক শক্তির বিস্তার বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। বেইজিংয়ের অভিযোগ, মহাকাশকে যুদ্ধের নতুন ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা বিশ্বশান্তির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, চীন ও রাশিয়া ইতোমধ্যে মহাকাশভিত্তিক সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। রাশিয়ার এমন কিছু স্যাটেলাইট কার্যক্রম নিয়েও ওয়াশিংটন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, যেগুলো অন্য স্যাটেলাইটের বিরুদ্ধে ব্যবহারের সক্ষমতা রাখে বলে মার্কিন গোয়েন্দাদের দাবি।
ট্রাম্পের ‘গোল্ডেন ডোম’ও আলোচনায়
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মহাকাশভিত্তিক প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাতেও অস্ত্র মোতায়েনের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর প্রস্তাবিত ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম ধারণা হলো মহাকাশে ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিরোধক ব্যবস্থা স্থাপন।
ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ঘোষণা শুধু একটি সামরিক পদক্ষেপ নয়, বরং ভবিষ্যতের যুদ্ধের ধরন নিয়ে বড় প্রশ্নও সামনে এনেছে—মহাকাশ কি এখন পৃথিবীর পরবর্তী যুদ্ধক্ষেত্র হতে যাচ্ছে?
আন্তর্জাতিক আইনে কতটা বৈধ?
১৯৬৭ সালের ‘আউটার স্পেস ট্রিটি’ মহাকাশে পারমাণবিক অস্ত্র ও গণবিধ্বংসী অস্ত্র মোতায়েন নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু লেজার, রেডিও জ্যামার, কাইনেটিক কিল ভেহিকল বা পার্টিকেল বিমের মতো আধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে ওই চুক্তিতে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা নেই।
এই আইনি ফাঁকই মহাকাশে প্রচলিত নয় এমন সামরিক প্রযুক্তি মোতায়েনের সুযোগ তৈরি করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ফলে যুক্তরাষ্ট্রের এই স্বীকারোক্তির পর প্রশ্ন উঠছে—মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতা কি এখন নতুন বাস্তবতা? নাকি এখান থেকেই শুরু হতে পারে এমন এক ‘নক্ষত্র যুদ্ধ’, যার ধাক্কা শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর প্রতিটি দেশের নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর জীবনব্যবস্থায় গিয়ে পড়বে?