মঙ্গল গ্রহে কি সত্যিই মিলেছে ‘ভালুক’? লাল গ্রহের পাথুরে মাটিতে ধরা পড়েছে এমন এক অদ্ভুত আকৃতি, যা দূর থেকে অবিকল ছোট্ট এক ভালুকের মুখের মতো! দুটি কালো গর্ত যেন চোখ, মাঝখানের উঁচু অংশটি নাক আর চারপাশের গোলাকার ফাটল—সব মিলিয়ে যেন মঙ্গলের মাটি থেকে কেউ তাকিয়ে আছে পৃথিবীর দিকে। ছবিটি দেখে চমকে উঠলেও বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর পেছনে লুকিয়ে আছে আরও চমকপ্রদ এক প্রাকৃতিক রহস্য।
২০২২ সালের ১২ ডিসেম্বর মঙ্গলের দক্ষিণাঞ্চলের উঁচু ভূমির ওপর দিয়ে প্রায় ২৫১ কিলোমিটার উচ্চতায় উড়ছিল নাসার মার্স রিকনাইস্যান্স অরবিটার। এর হাইরাইজ (HiRISE) ক্যামেরায় ধরা পড়ে অদ্ভুত দেখতে ওই ভূ-গঠন।
ছবিতে দেখা যায়, পাহাড়ের মতো একটি ভূ-গঠনের ওপর দুটি গোলাকার গর্ত। তার মাঝখানে নিচের দিকে সরু হয়ে আসা একটি উঁচু অংশ। পুরো কাঠামোটিকে ঘিরে রয়েছে প্রায় গোলাকার একটি ফাটল। সবকিছু মিলিয়ে দূর থেকে দেখলে সেটিকে অবিকল একটি ছোট ভালুকের মুখের মতো মনে হয়।
ভালুক নয়, স্বাভাবিক ভূ-গঠন
তবে বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা, মঙ্গলের মাটিতে আসলে কোনো ভালুকের মুখ পাওয়া যায়নি। পুরো আকৃতিটিই তৈরি হয়েছে প্রাকৃতিক ভূ-প্রক্রিয়ার কারণে।
ইউনিভার্সিটি অব অ্যারিজোনার গ্রহবিজ্ঞানী ও হাইরাইজ ক্যামেরা দলের প্রধান আলফ্রেড ম্যাকইউয়েন ২০২৩ সালে ছবিটির ব্যাখ্যা দেন। তাঁর মতে, এখানে রয়েছে একটি পাহাড়, যার মধ্যে ভি-আকৃতির ধস, দুটি গর্ত এবং চারপাশে গোলাকার ফাটলের মতো একটি ভূ-গঠন রয়েছে।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, গোলাকার ফাটলটি কোনো প্রাচীন আঘাতের গর্তের অবশিষ্ট চিহ্ন হতে পারে। সময়ের সঙ্গে গর্তটি ভরাট হয়ে যাওয়ার পর ওপরের আলগা উপাদান বসে গিয়ে তৈরি হতে পারে বর্তমান কাঠামো। আর ভালুকের ‘নাক’ হিসেবে যে অংশটি দেখা যাচ্ছে, সেটি কোনো আগ্নেয়গিরির ভেন্ট, কাদার ভেন্ট কিংবা প্রাচীন প্রবাহের অংশ হতে পারে।
কেন পাথরে মুখ দেখেন মানুষ?
মঙ্গলের মাটিতে ভালুকের মুখ দেখতে পাওয়ার ঘটনাটির একটি বৈজ্ঞানিক নাম আছে—প্যারিডোলিয়া (Pareidolia)।
এটি মানুষের মস্তিষ্কের এমন একটি স্বাভাবিক প্রবণতা, যার কারণে এলোমেলো কোনো আকৃতি বা বস্তুর মধ্যে পরিচিত মুখ, প্রাণী কিংবা কোনো অবয়ব দেখতে পাই। যেমন গাড়ির হেডলাইটকে মানুষের চোখ-মুখ মনে হওয়া কিংবা দেয়ালের দাগে কোনো পরিচিত অবয়ব খুঁজে পাওয়া।
বিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের মস্তিষ্ক খুব দ্রুত মুখ শনাক্ত করতে অভ্যস্ত। বিবর্তনের ধারায় বিপদ বা অন্য কোনো মানুষের উপস্থিতি দ্রুত শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এই বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়েছে। ফলে অনেক সময় বাস্তবে মুখ না থাকলেও আমাদের মস্তিষ্ক সেখানে মুখের আকৃতি খুঁজে নেয়।
মঙ্গলে এর আগেও দেখা গেছে ‘মুখ’
মঙ্গল গ্রহে মানুষের চোখে পরিচিত কোনো আকৃতি ধরা পড়ার ঘটনা অবশ্য নতুন নয়।
১৯৭৬ সালে নাসার ভাইকিং-১ অরবিটার মঙ্গলের সাইডোনিয়া অঞ্চলের একটি মেসার ছবি তোলে। কম রেজল্যুশনের সেই ছবিতে ভূ-গঠনটিকে মানুষের মুখের মতো মনে হয়েছিল। একসময় এটি নিয়ে নানা জল্পনাও তৈরি হয়।
পরে মঙ্গলের আরও উন্নত ছবি তোলা হলে স্পষ্ট হয়, সেটি কোনো কৃত্রিম মুখ নয়; বরং স্বাভাবিক একটি পাথুরে ভূ-গঠন। নির্দিষ্ট কোণ থেকে সূর্যের আলো পড়ায় সেটিকে মানুষের মুখের মতো দেখাচ্ছিল।
মঙ্গলে দেখা গেছে ‘হাসিমুখ’ও
২০২৪ সালের আগস্টে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার ট্রেস গ্যাস অরবিটার (Trace Gas Orbiter)-এর মাধ্যমে মঙ্গলের টেরা সিরেনাম অঞ্চলে আরেকটি অদ্ভুত আকৃতি নজরে আসে। এবার সেটিকে দেখতে অনেকটা হাসিমুখের মতো মনে হয়েছিল।
সেখানে ছিল শুকিয়ে যাওয়া লবণের একটি বৃত্তাকার স্তর এবং তার মধ্যে দুটি ছোট গর্ত। বিজ্ঞানীদের মতে, মঙ্গলের প্রাচীন কোনো অগভীর পুকুর বা হ্রদ শুকিয়ে যাওয়ার পর সেখানে এসব লবণের স্তর তৈরি হয়েছিল।
এই লবণের জমাগুলো বিজ্ঞানীদের কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মঙ্গলের অপেক্ষাকৃত উষ্ণ ও আর্দ্র অতীতে এসব জলাশয়ের অস্তিত্ব ছিল। পানি শুকিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পানিতে দ্রবীভূত খনিজ জমে স্ফটিক তৈরি করে লবণের স্তর গঠন করতে পারে।
‘ভালুক’ নেই, তবু রহস্যের শেষ নেই
মঙ্গলে ভালুকের অস্তিত্ব না থাকলেও লাল গ্রহের ভূ-পৃষ্ঠ বিজ্ঞানীদের বারবার চমকে দিচ্ছে। কখনো সেখানে জেলিফিশের মতো আকৃতি, কখনো মানুষের হাড়, আবার কখনো মাশরুমের মতো দেখতে ভূ-গঠনও দেখা গেছে।
এসবের বেশির ভাগেরই প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা মিলেছে। তবে প্রতিটি অদ্ভুত আকৃতিই মঙ্গলের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস সম্পর্কে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
অর্থাৎ, ছবির ‘ভালুক’ আসলে কোনো প্রাণী নয়—এটি মঙ্গলের পাথুরে ভূ-গঠনের এক চমকপ্রদ খেলা। আর সেই খেলাতেই আবারও মানুষকে অবাক করেছে লাল গ্রহ।
তথ্যসূত্র: সায়েন্সঅ্যালার্ট