নতুন আইফোন নিয়ে প্রযুক্তিপ্রেমীদের কৌতূহল বরাবরই বেশি। এবার সেই আগ্রহ আরও বাড়িয়েছে অ্যাপলের আইফোন ১৮ প্রো ও ১৮ প্রো ম্যাক্স। নতুন দুই মডেলে শুধু নকশাগত পরিবর্তন নয়, ক্যামেরা, প্রসেসর, ব্যাটারি, নেটওয়ার্ক এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারেও বেশ কিছু নতুন সুবিধা যুক্ত করেছে অ্যাপল।
শক্তিশালী এ২০ প্রো চিপ থেকে শুরু করে উন্নত ক্যামেরা, নতুন থার্মাল প্রযুক্তি, এআইনির্ভর সিরি এবং ই-সিম—সব মিলিয়ে আগের প্রজন্মের তুলনায় বেশ কিছু জায়গায় পরিবর্তন এসেছে নতুন আইফোনে।
ক্যামেরায় নতুন প্রযুক্তি
আইফোন ১৮ প্রো সিরিজের প্রধান ক্যামেরায় রয়েছে ৪৮ মেগাপিক্সেলের ফিউশন সেন্সর। এতে প্রথমবারের মতো ভ্যারিয়েবল অ্যাপারচার যুক্ত করা হয়েছে। ছয়টি লেজার-কাট ব্লেডের সাহায্যে পরিস্থিতি অনুযায়ী অ্যাপারচার পরিবর্তন করা যাবে। ফলে কম আলো কিংবা গ্রুপ ছবির মতো বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ছবি তোলার ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা মিলবে।
প্রো কন্ট্রোলসেও যোগ হয়েছে নতুন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। অ্যাপারচার, শাটার স্পিড ও হোয়াইট ব্যালান্সের পাশাপাশি ব্যবহার করা যাবে হিস্টোগ্রাম। উন্নত কম্পিউটেশনাল ইমেজিং প্রযুক্তি ছবির সূক্ষ্মতা ও স্পষ্টতা বাড়াতে ভূমিকা রাখবে।
ভিডিওতেও থাকছে নতুন সুবিধা। ৬০ ফ্রেম প্রতি সেকেন্ড পর্যন্ত ধারণ করা ভিডিওতে পরে সিনেম্যাটিক ইফেক্ট যোগ করা যাবে। পাশাপাশি টাইম-ল্যাপসে ৪কে ডলবি ভিশন এইচডিআর এবং উন্নত অডিও মিক্স সুবিধা থাকছে।
ছোট হচ্ছে ডায়নামিক আইল্যান্ড
আইফোনের বহুল আলোচিত ডায়নামিক আইল্যান্ডেও পরিবর্তন এনেছে অ্যাপল। নতুন প্রযুক্তিতে এর আকার আরও ছোট করা হয়েছে। ফলে একই জায়গায় তুলনামূলক বেশি তথ্য দেখানো সম্ভব হবে।
নতুন ডায়নামিক আইল্যান্ডে একসঙ্গে তিনটি লাইভ অ্যাক্টিভিটি দেখা যাবে। ফেস আইডির মাধ্যমে ফোন আনলক, কেনাকাটার অনুমোদন ও বিভিন্ন অ্যাপে প্রবেশের সুবিধাও থাকছে।
এ২০ প্রোতে বাড়বে পারফরম্যান্স
নতুন আইফোনের অন্যতম বড় পরিবর্তন এ২০ প্রো চিপ। ২ ন্যানোমিটার প্রযুক্তিতে তৈরি এ চিপে এ১৯ প্রো-এর তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি মেমোরি ব্যান্ডউইথ রয়েছে।
চিপটিতে ৬-কোর সিপিইউ, ৭-কোর জিপিইউ এবং ইন্টিগ্রেটেড নিউরাল অ্যাকসেলারেটর রয়েছে। নতুন জিপিইউ আগের প্রজন্মের তুলনায় সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ দ্রুত গ্রাফিকস রেন্ডার করতে পারবে। এ ছাড়া ডুয়াল ১৬-কোর নিউরাল ইঞ্জিন অন-ডিভাইস এআই ও কম্পিউটেশনাল ফটোগ্রাফির কাজ আরও দ্রুত করার জন্য ব্যবহৃত হবে।
নেটওয়ার্কে নতুন চিপ
কানেক্টিভিটির জন্য আইফোন ১৮ প্রো সিরিজে অ্যাপলের নিজস্ব এন১ চিপ ব্যবহার করা হয়েছে। এটি ওয়াই-ফাই ৭, ব্লুটুথ ৬ এবং থ্রেড প্রযুক্তি সমর্থন করবে।
আইফোন ১৮ প্রো-তে যুক্ত হয়েছে নতুন সি২ সেলুলার মডেম। অ্যাপলের দাবি, এটি মোবাইল নেটওয়ার্কের সংযোগ আরও স্থিতিশীল করার পাশাপাশি আগের সি১এক্স-এর তুলনায় দ্রুত আপলোড সুবিধা দেবে। একই সঙ্গে মডেমটি ১৫ শতাংশ কম শক্তি ব্যবহার করবে।
অতিরিক্ত গরম ঠেকাতে নতুন ব্যবস্থা
উচ্চ ক্ষমতার প্রসেসর দীর্ঘসময় ব্যবহারে ফোন গরম হয়ে যাওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় নিয়েছে অ্যাপল। এ জন্য নতুন থার্মাল ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
নতুন ভ্যাপার চেম্বারের সারফেস এরিয়া আইফোন ১৭ প্রো-এর তুলনায় তিন গুণ বড়। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এর ফলে দীর্ঘসময় ফোন ব্যবহারের সময় পারফরম্যান্স সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
ব্যাটারিতে বাড়তি সময়
ব্যাটারি ব্যাকআপেও উন্নতি এসেছে নতুন সিরিজে। ই-সিম-অনলি আইফোন ১৮ প্রো সর্বোচ্চ ৩৬ ঘণ্টা এবং ১৮ প্রো ম্যাক্স সর্বোচ্চ ৪৫ ঘণ্টা ভিডিও চালাতে পারবে বলে জানিয়েছে অ্যাপল।
১৮ প্রো প্রায় ১৫ মিনিটে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত তারযুক্ত চার্জ নিতে পারবে। ওয়্যারলেস চার্জিংয়ে একই মাত্রায় পৌঁছাতে সময় লাগবে প্রায় ৩০ মিনিট। অন্যদিকে, ১৮ প্রো ম্যাক্সে মাত্র পাঁচ মিনিট চার্জে প্রায় সাত ঘণ্টা ভিডিও প্লেব্যাক পাওয়া যাবে।
সিরিতে এআইয়ের ব্যবহার
সফটওয়্যারেও বড় পরিবর্তন এসেছে। আইফোন ১৮ প্রো সিরিজে থাকছে আইওএস ২৭, অ্যাপল ইন্টেলিজেন্স এবং নতুন সিরি এআই।
নতুন সিরি ব্যবহারকারীর প্রয়োজন ও ব্যক্তিগত তথ্যের প্রেক্ষাপট বুঝে আরও কার্যকর সহায়তা দিতে পারবে। বার্তা, ই-মেইল ও ছবির মতো তথ্য থেকে প্রয়োজনীয় বিষয় বুঝে সহায়তা করার পাশাপাশি স্ক্রিনে থাকা তথ্য অনুযায়ীও কাজ করতে পারবে।
ছবি ও ওয়েব ব্যবহারে এআই
এআই ব্যবহারের পরিধি বাড়ানো হয়েছে ক্যামেরা ও অন্যান্য অ্যাপেও। সামনে থাকা কোনো বিষয় সম্পর্কে ক্যামেরার মাধ্যমে তথ্য নেওয়ার সুবিধা থাকবে। ছবি সম্পাদনায় স্পেশাল রিফ্রেমিং, এক্সটেন্ড ও উন্নত ক্লিন আপ সুবিধা পাওয়া যাবে।
ইমেজ প্লেগ্রাউন্ডের মাধ্যমে ফটোরিয়েলিস্টিক ছবি তৈরির সুযোগও থাকছে। আর সাফারির ‘নোটিফাই মি’ সুবিধা কোনো ওয়েবপেজে পরিবর্তন হলে ব্যবহারকারীকে জানাতে পারবে। যেমন—কোনো পণ্যের দাম বা স্টক পরিবর্তন হলে তা জানা যাবে।
অ্যাপলের দাবি, এসব এআই সুবিধায় ব্যবহারকারীর তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন-ডিভাইস প্রসেসিং ও প্রাইভেট ক্লাউড কম্পিউট ব্যবহার করা হচ্ছে।
আইওএস ২৭-এ নতুন ডিজাইন
আইওএস ২৭-এ ‘লিকুইড গ্লাস’ নকশাকে আরও ব্যক্তিগতভাবে সাজানোর সুযোগ থাকছে। একই সঙ্গে শিশুদের ডিভাইস ব্যবহারের ওপর অভিভাবকদের নিয়ন্ত্রণও বাড়ানো হয়েছে।
সমর্থিত ক্যারিয়ারে হ্যান্ডঅফ সুবিধার মাধ্যমে একই ফোন নম্বর ব্যবহার করে দুই আইফোনের মধ্যে সহজে পরিবর্তন করা যাবে।
ই-সিমে গুরুত্ব
আইফোন ১৮ প্রো সিরিজে ফিজিক্যাল সিমের বদলে ই-সিম ব্যবহারে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে অ্যাপল। প্রতিষ্ঠানটির মতে, ই-সিম নিরাপত্তা ও সংযোগের ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা দেয়।
বিশ্বের ৫০০টির বেশি ক্যারিয়ারে ই-সিম সমর্থন রয়েছে। কিছু দেশে ই-সিম-অনলি মডেলে ফিজিক্যাল সিমের জায়গা কাজে লাগিয়ে বড় ব্যাটারি দেওয়া হয়েছে। এতে সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টা বাড়তি ভিডিও প্লেব্যাক পাওয়া যাবে।
নতুন কেস ও স্ট্র্যাপ
নতুন আইফোনের সঙ্গে সিলিকন কেস, টেকওভেন কেস, ক্রসবডি স্ট্র্যাপ ও ফাইনওভেন ওয়ালেট এনেছে অ্যাপল। নতুন ক্লিয়ার কেসের সঙ্গে ক্রসবডি ও রিস্ট স্ট্র্যাপ ব্যবহার করা যাবে।
রিস্ট স্ট্র্যাপের সাহায্যে হাতে না ধরেও আইফোন বা এয়ারপডস বহন করা সম্ভব হবে। এটি ১০০ শতাংশ পুনর্ব্যবহৃত পলিয়েস্টার সুতা দিয়ে তৈরি এবং ছয়টি রঙে পাওয়া যাবে।
পুনর্ব্যবহৃত উপাদানে তৈরি
নতুন আইফোন তৈরিতে পরিবেশবান্ধব উপাদানের ব্যবহারও বাড়িয়েছে অ্যাপল। ১৮ প্রো ও ১৮ প্রো ম্যাক্সে মোট ৪০ শতাংশ পুনর্ব্যবহৃত উপাদান ব্যবহারের কথা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
এর মধ্যে ব্যাটারিতে রয়েছে ১০০ শতাংশ পুনর্ব্যবহৃত কোবাল্ট এবং বডিতে ৮৫ শতাংশ পুনর্ব্যবহৃত অ্যালুমিনিয়াম। উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় ৫০ শতাংশ নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের কথাও জানিয়েছে অ্যাপল। প্যাকেজিংয়ের কাগজও ফাইবারভিত্তিক।
আইফোন ১৮ প্রো ও ১৮ প্রো ম্যাক্স পাওয়া যাবে কালো, সিলভার, গ্লেসিয়ার ও নতুন বারগান্ডি রঙে। ১২ সেপ্টেম্বর থেকে প্রি-অর্ডার শুরু হবে। আর ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে বাজারে বিক্রি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
সূত্র: অ্যাপল