পরিচ্ছন্ন ও প্রায় অফুরন্ত জ্বালানির উৎস তৈরির দৌড়ে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল চীন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ৫৮২ টন ওজনের ফিউশন চুম্বকের সফল পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে দেশটি, যা ‘কৃত্রিম সূর্য’ তৈরির প্রকল্পে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বেইজিংয়ের লক্ষ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে পারমাণবিক ফিউশন প্রযুক্তির মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা।
চায়নিজ একাডেমি অব সায়েন্সেসের আওতাধীন ইনস্টিটিউট অব প্লাজমা ফিজিকসের তৈরি এই বিশাল সুপারকন্ডাক্টিং (অতিপরিবাহী) চুম্বকটি ফিউশন রিঅ্যাক্টরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ২১ মিটার দীর্ঘ ও ১২ মিটার প্রস্থের ইংরেজি ‘ডি’ আকৃতির এই চুম্বকটি ১০ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উত্তপ্ত প্লাজমাকে শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্রের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম। এ তাপমাত্রা সূর্যের কেন্দ্রের প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার তুলনায় প্রায় সাত গুণ বেশি।
চীন জানিয়েছে, এই প্রযুক্তি তৈরিতে সম্পূর্ণ দেশীয় কাঁচামাল ও নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রে এটি একটি বড় সাফল্য। আন্তর্জাতিক থার্মোনিউক্লিয়ার এক্সপেরিমেন্টাল রিঅ্যাক্টর (আইটিইআর)-এর সমমানের চুম্বকের তুলনায় এটি আকারে প্রায় ১ দশমিক ৩ গুণ বড় এবং শক্তি সঞ্চয়ের ক্ষমতা প্রায় তিন গুণ বেশি।
কৃত্রিম সূর্য কী?
‘কৃত্রিম সূর্য’ আসলে একটি পারমাণবিক ফিউশন রিঅ্যাক্টর, যেখানে সূর্যের মতোই হাইড্রোজেন পরমাণুর সংযোজন (ফিউশন) ঘটিয়ে বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপাদনের চেষ্টা করা হয়। এই প্রযুক্তি সফল হলে ভবিষ্যতে নিরাপদ, কার্বনমুক্ত এবং প্রায় অফুরন্ত বিদ্যুতের নতুন উৎস তৈরি হবে।
এর আগে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে চীনের ‘এক্সপেরিমেন্টাল অ্যাডভান্সড সুপারকন্ডাক্টিং টোকামাক (ইস্ট)’ টানা ১ হাজার ৬৬ সেকেন্ড উচ্চ দক্ষতায় প্লাজমা নিয়ন্ত্রণ করে নতুন বিশ্ব রেকর্ড গড়ে। এর আগে ২০২৩ সালে একই প্রকল্পের ৪০৩ সেকেন্ডের রেকর্ড ছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর ফিউশন বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তুলতে ১০ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা সৃষ্টি, দীর্ঘ সময় ধরে প্লাজমাকে স্থিতিশীল রাখা এবং পুরো প্রক্রিয়া নিরাপদভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। চীনের সাম্প্রতিক অগ্রগতি সেই লক্ষ্য অর্জনের পথকে আরও বাস্তবসম্মত করে তুলেছে।
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ফিউশন প্রযুক্তি শুধু পরিচ্ছন্ন জ্বালানির নতুন যুগের সূচনা করবে না, ভবিষ্যতে গভীর মহাকাশ অভিযানের জন্যও শক্তির নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।