ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) সেবাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে এর কার্যক্রমকে ব্যাপক মাত্রায় ডিজিটাল ব্যবস্থায় রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে সংস্থাটির পণ্য বিতরণ ও ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হতে যাচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইভিত্তিক রিয়েল-টাইম মনিটরিং সিস্টেম। একইসঙ্গে টিসিবির উপকারভোগীদের জন্য এআইভিত্তিক কন্টাক্ট সেন্টারও চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। টিসিবির কর্মকর্তারা বলছেন, পয়েন্ট অভ সেল (পিওএস) ব্যবস্থা, আধুনিক লজিস্টিকস, উন্নত গুদাম ব্যবস্থাপনা, পণ্যের পরিসর সম্প্রসারণ ও সম্পূর্ণ ডিজিটাল কার্যক্রম চালু করা গেলে ভবিষ্যতে সংস্থাটির ভর্তুকি শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে আনা যাবে। এর পাশাপাশি দ্রুত ও নিরাপদ লেনদেনের জন্য টিসিবি বাংলা কিউআরের সঙ্গেও আলোচনা করছে।
জানা যায়, টিসিবির উপকারভোগীদের জন্য নতুন একটি মোবাইল অ্যাপ চালু করা হবে। টিসিবির নতুন এই ‘উপকারী’ মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে উপকারভোগীরা প্রচলিত কার্ডের পাশাপাশি নিরাপদ ডিজিটাল মাধ্যমেও সেবা নিতে পারবেন। ডিজিটালি স্বাক্ষরিত ও এনক্রিপ্টেড কোডের মাধ্যমে উপকারভোগীর পরিচয় ও পণ্য পাওয়ার যোগ্যতা যাচাই করা হবে। এর ফলে কার্ড হারিয়ে গেলে বা নষ্ট হলেও প্রকৃত উপকারভোগীরা নির্ধারিত পণ্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবেন না। গতকাল বৃহস্পতিবার টিসিবির সম্মেলনকক্ষে সংস্থাটির কার্যক্রমের ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সরকারের এসব উদ্যোগ তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে ভর্তুকি মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দিতে টিসিবির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে টিসিবির সেবায় স্বচ্ছতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে সরকারি ভর্তুকির সুবিধা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে টিসিবির সেবা পৌঁছানো নিশ্চিত করতে সরকারের পদক্ষেপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল নম্বর ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করে প্রায় ৫৯ লাখ অযোগ্য আবেদনকারীকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে একটি যাচাইকৃত ডিজিটাল ডেটাবেস তৈরি করা হয়েছে। সরকারি ভর্তুকি যেন প্রকৃত ও যোগ্য উপকারভোগীর কাছেই পৌঁছে, তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই ডেটাবেস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। খন্দকার মুক্তাদির আরও জানান, বর্তমানে প্রায় ৭৯ লাখ উপকারভোগী টিসিবির সেবার আওতায় রয়েছেন। ভবিষ্যতে এ সংখ্যা এক কোটিতে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
টিসিবি নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, অনলাইন ডিলার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে ডিলার আবেদন, তথ্য সংরক্ষণ ও নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিক করা হবে। প্রয়োজনের তুলনায় আবেদনকারী বেশি হলে ডিজিটাল লটারির মাধ্যমে ডিলার নির্বাচনের সুযোগ থাকবে। পাশাপাশি অনলাইন পেমেন্ট কালেকশন চালুর মাধ্যমে আর্থিক লেনদেনের প্রক্রিয়াও আরও সহজ ও স্বচ্ছ করা হবে। এছাড়া অল-ইন-ওয়ান পিওএসের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি, বায়োমেট্রিক যাচাই, অনলাইন পেমেন্ট এবং তাৎক্ষণিক বিক্রয় রশিদ দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকবে অদূর ভবিষ্যতে।
তথ্যমতে, এআইভিত্তিক রিয়েল-টাইম মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে কোনো এলাকায় কত পণ্য বিক্রি ও বিতরণ হচ্ছে, কোথাও অনিয়ম হচ্ছে কি না- এসব তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। এতে অনিয়ম শনাক্ত এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে। পাশাপাশি এআইভিত্তিক কন্টাক্ট সেন্টারও চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেন উপকারভোগীরা দ্রুত প্রয়োজনীয় তথ্য ও সহায়তা পান। চলতি অর্থবছরে টিসিবির বিভিন্ন উদ্যোগ ও ডিজিটাল রূপান্তরের ফলে গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ কোটি টাকার ভর্তুকি সাশ্রয় হবে। এছাড়াও আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে প্রযুক্তির ব্যবহার, সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভর্তুকির অপচয় আরও উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা এ প্রতিবেদককে বলেন, টিসিবি যেন তার মূল দায়িত্বে মনোযোগ ধরে রাখতে পারে, তা নিশ্চিত করতে এই উদ্যোগটি সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা উচিত। ‘বাণিজ্যিক কার্যক্রমগুলো টিসিবির প্রধান কার্যক্রম থেকে আলাদাভাবে পরিচালনা করা উচিত।’ তিনি আরও বলেন, মানুষ যেন মুনাফার আশায় পুনরায় বিক্রির উদ্দেশ্যে টিসিবির পণ্য কিনতে না পারে, সেজন্য সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। যথাযথ নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
সূত্র জানায়, দেশে প্রতি বছর আড়াই থেকে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকির চাপ কমাতে ব্যবসায়িক মডেলে বড় পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে টিসিবি। ভর্তুকি মূল্যে নিত্যপণ্য বিক্রির পাশাপাশি সাবান, ডিটারজেন্ট, চা, লবণ, আটা, ভোজ্যতেল ও মসলার মতো লাভজনক পণ্যের ব্যবসায় নামার পরিকল্পনা করছে রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি। টিসিবির ফ্যামিলি কার্ডধারীদের পাশাপাশি সাধারণ ক্রেতাদের কাছেও এসব পণ্য বিক্রি করা হবে। একইসঙ্গে তহবিল ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এনে নিজস্ব অর্থে পণ্য কেনা, সরকারি ব্যাংকের পরিবর্তে কম সুদে বেসরকারি ব্যাংকে ঋণপত্র (এলসি) খোলা, পণ্যের দাম নিয়মিত সমন্বয় ও পুরো কার্যক্রম ডিজিটাল করার মতো একগুচ্ছ সংস্কার পরিকল্পনা নিয়েছে সংস্থাটি। টিসিবির প্রাক্কলন অনুসারে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে শুরুতেই বছরে প্রায় ৯৪০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে এবং ভর্তুকি প্রায় ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনা যাবে। সংস্থাটির দাবি, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ২০৩০ সাল নাগাদ ভর্তুকি শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে। টিসিবি তাদের এ পরিকল্পনার নাম দিয়েছে ‘মিশন জিরো’।
এ প্রসঙ্গে টিসিবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ফয়সল আজাদ জানান, দেশের একজন নাগরিকের কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে যাতে ভেজাল, নিম্নমানের বা ক্ষতিকর পণ্য কিনতে বাধ্য না হন, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তাই এআইভিত্তিক রিয়েল-টাইম মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে কোনো এলাকায় কত পণ্য বিক্রি ও বিতরণ হচ্ছে, কোথাও অনিয়ম হচ্ছে কি না- এসব তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। টিসিবি চেয়ারম্যান বলেন, তাদের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ব্যবসার মডেল, তহবিল ও পণ্য ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা গেলে এই ভর্তুকি কমিয়ে আনা সম্ভব, এমনকি ৪-৫ বছরের মধ্যে শূন্যেও নামানো সম্ভব। তিনি আরও বলেন, টিসিবির জরিপে দেখা গেছে, ক্রেতারা সাশ্রয়ী মূল্যে সংস্থাটি থেকে সাবান, ডিটারজেন্ট, লবণ, মসলা ও চায়ের মতো পণ্য পেতে চান। সেই কারণে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।