মহাকাশের গভীর থেকে আসা রহস্যময় রেডিও তরঙ্গ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অনুসন্ধান চালাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। এবার সেই অনুসন্ধানে মিলেছে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। পৃথিবী থেকে প্রায় ৬৩ দশমিক ৪ আলোকবর্ষ দূরের একটি গ্রহ থেকেই সরাসরি রেডিও সংকেত শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা।
হার্ভার্ড-স্মিথসোনিয়ান সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্স ও ইউনিভার্সিটি অব ওরেগনের গবেষকদের একটি দল দক্ষিণ আফ্রিকার মিরক্যাট রেডিও টেলিস্কোপ অ্যারে ব্যবহার করে এই সংকেত শনাক্ত করেন। গবেষকদের দাবি, কোনো নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করা গ্রহ থেকে সরাসরি রেডিও নির্গমন শনাক্ত করার এটিই প্রথম নিশ্চিত ঘটনা।
তবে এই সংকেতকে ভিনগ্রহের প্রাণীর পাঠানো বার্তা ভাবার কারণ নেই। বিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণ বলছে, এর উৎস গ্রহটির অরোরা বা মেরুজ্যোতি। চার্জযুক্ত কণা গ্রহের বায়ুমণ্ডল ও চৌম্বকক্ষেত্রের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করলে যে শক্তি নির্গত হয়, তার ফলেই এ ধরনের অরোরার সৃষ্টি হয়।
নক্ষত্র নয়, সংকেত এসেছে গ্রহ থেকেই
গবেষকেরা ২০২৫ ও ২০২৬ সালে চার দফায় বেটা পিক্টোরিস নক্ষত্রব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। পৃথিবী থেকে প্রায় ৬৩ দশমিক ৪ আলোকবর্ষ দূরের এই নক্ষত্রকে ঘিরে তিনটি পরিচিত গ্রহ রয়েছে—বেটা পিক্টোরিস বি, সি ও ডি।
পর্যবেক্ষণে ০ দশমিক ৮৫ থেকে ৩ দশমিক ৫ গিগাহার্টজ ফ্রিকোয়েন্সিতে দ্রুত ও বারবার ফিরে আসা রেডিও বিস্ফোরণ শনাক্ত হয়। সংকেতগুলো ছিল অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে বৃত্তাকারভাবে পোলারাইজড—যা অরোরা থেকে নির্গত রেডিও তরঙ্গের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
আকাশের অবস্থান নির্ধারণে কোয়াসারকে রেফারেন্স পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করে গবেষকেরা সংকেতের উৎস নির্ণয় করেন। বিশ্লেষণে দেখা যায়, সংকেতটি বেটা পিক্টোরিস নক্ষত্র থেকে নয়; বরং তার চারপাশে ঘুরতে থাকা বেটা পিক্টোরিস বি গ্রহ থেকেই এসেছে।
চৌম্বকক্ষেত্র পৃথিবীর চেয়ে হাজার গুণ শক্তিশালী?
এই আবিষ্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো গ্রহটির চৌম্বকক্ষেত্র। সংকেতের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা মনে করছেন, সেখানে ইলেকট্রন সাইক্লোট্রন মেজার ইনস্ট্যাবিলিটি (ইসিএমআই) নামের একটি প্রক্রিয়া কাজ করছে। পৃথিবী ও বৃহস্পতির অরোরার ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া দেখা যায়।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, বেটা পিক্টোরিস বি-এর চৌম্বকক্ষেত্র পৃথিবীর তুলনায় হাজার গুণেরও বেশি শক্তিশালী হতে পারে। এটি গ্রহটির অভ্যন্তরীণ ডায়নামো বা চৌম্বকক্ষেত্র তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ে আগের মডেলগুলোর সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
মাত্র ৮-৯ ঘণ্টায় একবার ঘোরে গ্রহটি
বেটা পিক্টোরিস বি কোনো ছোটখাটো গ্রহ নয়। এর ভর বৃহস্পতির প্রায় ১০ গুণ। একই সঙ্গে গ্রহটি নিজের অক্ষে অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে ঘোরে। একবার ঘুরে আসতে সময় লাগে মাত্র ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই দ্রুত ঘূর্ণনই গ্রহটির অরোরাজনিত রেডিও নির্গমনের শক্তির অন্যতম উৎস হতে পারে।
২০০৮ সালে প্রথম শনাক্ত হওয়া এই গ্রহটি এবার মহাকাশ গবেষণায় নতুন কারণে আলোচনায় এসেছে। এটি শুধু একটি বিশালাকার গ্যাসীয় গ্রহ নয়—এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে শনাক্ত হওয়া রেডিও সংকেতের প্রথম এক্সোপ্ল্যানেট উৎস হিসেবেও এর নাম যুক্ত হলো।
এবার নজর আরও সাত গ্রহে
বেটা পিক্টোরিস বি-এর এই আবিষ্কারের পর বিজ্ঞানীদের অনুসন্ধান থেমে থাকছে না। কাছাকাছি পাঁচটি নক্ষত্রব্যবস্থায় থাকা আরও সাতটি বিশালাকার এক্সোপ্ল্যানেটের দিকে এখন নজর তাঁদের।
গবেষকদের আশা, পরবর্তী প্রজন্মের রেডিও অবজারভেটরিগুলোর সংবেদনশীলতা বর্তমানের তুলনায় প্রায় ৫ থেকে ৭ গুণ বাড়বে। ফলে আরও দূরের ও দুর্বল গ্রহ থেকেও এ ধরনের রেডিও সংকেত শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
অর্থাৎ, এই আবিষ্কার এখনো মহাকাশে প্রাণের অস্তিত্বের প্রমাণ নয়। তবে দূরবর্তী গ্রহের চৌম্বকক্ষেত্র, বায়ুমণ্ডল ও অভ্যন্তরীণ বৈশিষ্ট্য জানার ক্ষেত্রে নতুন এক জানালা খুলে দিয়েছে বিজ্ঞানীদের জন্য।