ব্রাজিলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম ধাপের ভোট সামনে রেখে শেষ হয়েছে প্রচার-প্রচারণা। শেষ মুহূর্তে এসে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ও বামপন্থি ওয়ার্কার্স পার্টির (পিটি) প্রার্থী লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা এবং ডানপন্থি সেনেটর ফ্ল্যাভিও বলসোনারোর লড়াই জমে উঠেছে। জনমত জরিপে লুলা এগিয়ে থাকলেও দুই প্রার্থীর ব্যবধান ক্রমেই কমে আসছে।
রবিবার (৫ অক্টোবর) ব্রাজিলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম ধাপের ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। তবে সর্বশেষ জরিপগুলো বলছে, প্রথম ধাপে কোনো প্রার্থীরই এককভাবে ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পাওয়ার সম্ভাবনা কম। ফলে আগামী ২৫ অক্টোবর দ্বিতীয় দফার ভোট বা রান-অফে গড়াতে পারে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন।
শনিবার দেশটির অর্থনৈতিক কেন্দ্র সাও পাওলোতে বিশাল শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে নির্বাচনি প্রচার শেষ করেন ৮০ বছর বয়সী লুলা। তার প্রচার শিবিরের দাবি, এবারের নির্বাচনে এটিই ছিল সমাপনী প্রচারের সবচেয়ে বড় জমায়েত।
সমর্থকদের উদ্দেশে লুলা বলেন, প্রথম ধাপেই তারা জয়ী হতে যাচ্ছেন। তিনি নির্বাচনকে ‘গণতন্ত্র ও বর্বরতার মধ্যে লড়াই’ হিসেবে উল্লেখ করে চরম ডানপন্থি শিবিরকে পরাজিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
লুলা একই সঙ্গে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ব্রাজিলের ‘সার্বভৌমত্বের পরীক্ষা’ হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন। যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধেও সতর্ক করেন তিনি।
অন্যদিকে ৪৫ বছর বয়সী ফ্ল্যাভিও বলসোনারোও প্রথম ধাপেই জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেছেন। বাবার রাজনৈতিক কৌশলের অনুসরণ করে তিনি সাও পাওলো রাজ্যে বিশাল মোটরসাইকেল শোভাযাত্রায় নেতৃত্ব দেন। পরে রিও দে জেনেইরোতে জনসভায় অংশ নেন।
ফ্ল্যাভিও বলেন, প্রথম ধাপেই জয় পাওয়ার মতো সব পরিস্থিতি তাদের অনুকূলে রয়েছে।
ফ্ল্যাভিওর বাবা সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। ২০২২ সালের নির্বাচনে লুলার কাছে পরাজিত হওয়ার পর ফলাফল পাল্টে দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগে জাইর বর্তমানে ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন।
প্রচারাভিযানের শেষ দিকে বাবার ছবি উঁচিয়ে ধরেন ফ্ল্যাভিও। নির্বাচিত হলে বাবাকে কারাগার থেকে মুক্ত করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে বাবার মতো ব্রাজিলের ইলেকট্রনিক ভোটিং ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, যদিও এ নিয়ে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্ল্যাভিওকে সমর্থন না দিলেও ব্রাজিলের নির্বাচন তিনি ‘সূক্ষ্মভাবে’ পর্যবেক্ষণ করছেন বলে জানিয়েছেন। ওয়াশিংটনের এই আগ্রহ দেশটির নির্বাচনি রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে।
লুলার সমর্থকদের অভিযোগ, এটি ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত। তবে ফ্ল্যাভিওর সমর্থকদের একটি অংশ বলছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে তারা পরিবর্তন চান এবং যুক্তরাষ্ট্রের চাপ এলে তাতে আপত্তি নেই।
সর্বশেষ জনমত জরিপে লুলা এগিয়ে থাকলেও প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে ব্যবধান কমে আসার চিত্র উঠে এসেছে। ফলে প্রথম ধাপে কেউ ৫০ শতাংশ ভোট না পেলে রান-অফে লুলা ও ফ্ল্যাভিওর সরাসরি লড়াই হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের লড়াই ২০২২ সালের নির্বাচনের তুলনায় আরও কঠিন হতে পারে। ওই নির্বাচনে লুলা জাইর বলসোনারোকে দুই শতাংশেরও কম ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছিলেন।
নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে ফ্ল্যাভিও শিবিরকে আরও একটি চাপের মুখে পড়তে হয়েছে। জাইর বলসোনারোর জীবনী নিয়ে নির্মাণাধীন ‘ডার্ক হর্স’ চলচ্চিত্রের অর্থায়ন নিয়ে তদন্ত চলছে। কারাগারে থাকা এক ব্যাংকারের মাধ্যমে চলচ্চিত্রটির তহবিল সংগ্রহের বিষয়টি কর্তৃপক্ষ খতিয়ে দেখছে।
এ ছাড়া লুলার বিরুদ্ধে মানহানিকর বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে গত এপ্রিলে ফ্ল্যাভিওর বিরুদ্ধে তদন্তের অনুমতি দিয়েছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পাশাপাশি রোববার ব্রাজিলের প্রায় ১৬ কোটি নিবন্ধিত ভোটার আইনপ্রণেতা, রাজ্য গভর্নর ও সেনেটর নির্বাচনের জন্যও ভোট দেবেন।
লাতিন আমেরিকাজুড়ে সাম্প্রতিক সময়ে ডানপন্থি রাজনীতির উত্থানের মধ্যে ব্রাজিলের এই নির্বাচন তাই শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের রাজনৈতিক গতিপথের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি এখন রোববারের ভোটের ফলাফলের দিকে।