রাস্তাঘাট, নদীর পাড়, সেতু কিংবা আশপাশের উঁচু জায়গা—কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই নেই। দীর্ঘদিন পর গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচকে ঘিরে উৎসবে মেতে উঠেছে মানিকগঞ্জ। কালীগঙ্গা নদীর বেউথা ঘাট এলাকায় শনিবার অনুষ্ঠিত নৌকাবাইচ দেখতে সকাল থেকেই জড়ো হতে থাকেন হাজারো মানুষ। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীর দুই পাড়ে নামে মানুষের ঢল।
আয়োজক কমিটির দাবি, এবারের নৌকাবাইচ দেখতে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের সমাগম হয়েছে। নদীর দুই পাড়ের পাশাপাশি আশপাশের সড়ক, সেতু ও বিভিন্ন ভবনের ছাদ থেকেও মানুষ উপভোগ করেন নৌকার ছুটে চলার রোমাঞ্চকর প্রতিযোগিতা।
শনিবার দুপুরে মানিকগঞ্জ শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কালীগঙ্গা নদীতে শুরু হয় ঐতিহ্যবাহী এ নৌকাবাইচ। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা প্রতিযোগীরা এতে অংশ নেন। চারটি ক্যাটাগরিতে মোট ২২টি নৌকা প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। ক্যাটাগরিগুলো হলো—ছান্দি, ঘাসি, খেল্লা ও পানসি। ব্যতিক্রমী আয়োজন হিসেবে অংশ নেয় ৭০ ও ৮০ হাত দীর্ঘ দুটি কলাগাছের ভেলাও।
নৌকাবাইচের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মানিকগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা।
উদ্বোধনী বক্তব্যে খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা বলেন, গ্রামবাংলার এই ঐতিহ্য আমাদের ধরে রাখতে হবে। এমন সুন্দর নৌকাবাইচ উপহার দেওয়ার জন্য আয়োজকদের ধন্যবাদ জানাই। মানিকগঞ্জের মানুষ শান্তিপ্রিয়। তাই এত বড় আয়োজনও সুশৃঙ্খলভাবে অনুষ্ঠিত হলো।
প্রতিযোগিতা শেষে ছান্দি ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন হয় ‘গায়ান বাড়ি’। বিজয়ী দল পুরস্কার হিসেবে পায় একটি ইলেকট্রিক মোটরবাইক। এ বিভাগে দ্বিতীয় হয় ‘ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ’, তৃতীয় ‘গায়ান তরী’ এবং চতুর্থ ‘সোনার চান’। দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ স্থান অর্জনকারী প্রতিটি নৌকাকে একটি করে ফ্রিজ দেওয়া হয়।
ঘাসি ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন হয় ‘বাইমাইল এক্সপ্রেস’। পুরস্কার হিসেবে দলটি পায় একটি মোটরসাইকেল। দ্বিতীয় হওয়া ‘কালাম শিকদার এক্সপ্রেস’কে দেওয়া হয় একটি ফ্রিজ।
খেল্লা ক্যাটাগরিতে দর্শকদের নজর কাড়ে কুড়িগ্রাম থেকে আসা ‘মায়ের দোয়া’ নৌকা। প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে দলটি পায় একটি মোটরসাইকেল। দ্বিতীয় হয় ‘মা-বাবার দোয়া’; তাদের দেওয়া হয় একটি ফ্রিজ।
পানসি ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ‘জনতা এক্সপ্রেস’। বিজয়ী দল পায় একটি মোটরসাইকেল। এ বিভাগে দ্বিতীয় হয় ‘আজম ব্রাদার্স’, তৃতীয় ‘বাগচী চ্যালেঞ্জার’ এবং চতুর্থ ‘নকিব বাড়ি একতা এক্সপ্রেস’। তিনটি নৌকাকেই একটি করে ফ্রিজ দেওয়া হয়।
আয়োজকরা জানান, কালীগঙ্গার ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচকে ঘিরে প্রতিবছরই মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। নদী ও গ্রামীণ বাংলার ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে থাকা এ আয়োজন নতুন প্রজন্মের কাছে নৌকাবাইচের সংস্কৃতি তুলে ধরার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের মধ্যে উৎসবের আবহ তৈরি করে।
নৌকাবাইচ পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আ ত ম জহির আলম খান লোদীর সভাপতিত্বে এবং সদস্য-সচিব মাসুদ পারভেজের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মানিকগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য এস এ জিন্নাহ কবীর, জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারওয়ার আলম, জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাডভোকেট জামিলুর রশিদ খানসহ জেলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ নেতারা।