চার বছর ধরে যত্নে বড় করে তুলেছিলেন কৃষ্ণচূড়াগুলো। স্বপ্ন ছিল, একদিন ডালে ডালে ফুটবে টকটকে লাল ফুল। পথচারীরা থমকে দাঁড়াবেন, সড়কের পাশটা হয়ে উঠবে আরও সুন্দর। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই কেটে ফেলা হলো গাছগুলো।
গাজীপুরের কালীগঞ্জ-ঘোড়াশাল আঞ্চলিক সড়কের ঘোড়াশাল সেতুর আগের চত্বরের পশ্চিম পাশে লাগানো ৩ থেকে ৪টি বড় কৃষ্ণচূড়া গাছ কেটে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। চার বছর ধরে নিজের অর্থ ও শ্রমে গাছগুলো বড় করে তুলেছিলেন জাতীয় মহিলা সংস্থার কালীগঞ্জ উপজেলা শাখার অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মাসুদ পারভেজ।
২০২২ সালে নিজের বেতনের টাকা খরচ করে স্থানীয় একটি নার্সারি থেকে ১০টি কৃষ্ণচূড়াসহ বিভিন্ন বনজ ও ফলজ গাছ কিনে ওই এলাকায় রোপণ করেছিলেন তিনি। এরপর থেকে নিয়মিত গাছগুলোর পরিচর্যা করে আসছিলেন।
কৃষ্ণচূড়াগুলো যখন আর চারা নেই, বেশ বড় হয়ে উঠেছে—তখনই ঘটে এই ঘটনা।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সকালে সড়কের পাশে গাছগুলো দেখা গেলেও বিকেলে গিয়ে আর সেগুলোর দেখা পাননি মাসুদ পারভেজ। কে বা কারা ৩ থেকে ৪টি বড় কৃষ্ণচূড়া গাছ কেটে নিয়ে গেছে।
গাছগুলোর কাটা গুঁড়ি পড়ে থাকতে দেখে হতাশ হয়ে পড়েন তিনি। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের কষ্টের কথা তুলে ধরেন।
মাসুদ পারভেজ বলেন, নিজের বেতনের টাকা দিয়ে কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই গাছগুলো লাগিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন, একদিন গাছগুলো বড় হবে, ফুল ফুটবে এবং পথচারীরা ছায়া পাবেন। কিন্তু বড় হয়ে ওঠার পর গাছগুলো কেটে নিয়ে যাওয়ায় তাঁর কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
স্থানীয় বাসিন্দারাও গাছ কেটে নেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা রিফাত বলেন, গাছগুলো যখন ছোট ছিল তখন হয়তো অনেকেই গুরুত্ব দেননি। কয়েক বছরে সেগুলো বড় হয়ে সুন্দর হয়ে উঠেছিল। কৃষ্ণচূড়ায় ফুল ফুটলে জায়গাটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠত। গাছ কেটে নেওয়ায় পরিবেশেরও ক্ষতি হয়েছে।
আঞ্চলিক সড়কের পাশের হোটেল ব্যবসায়ী আব্দুল বাতেন বলেন, কেউ নিজের অর্থ খরচ করে গাছ লাগালে সেটি রক্ষা করা সবার দায়িত্ব। এসব গাছ ব্যক্তিগত সম্পদ না হলেও এর সুফল ভোগ করে পুরো এলাকার মানুষ। যারা গাছগুলো কেটেছে, তাদের খুঁজে বের করা প্রয়োজন।
কালীগঞ্জ কল্যাণ সংস্থার সভাপতি অ্যাডভোকেট মু. আতিকুর রহমান ভূঞা বলেন, একটি গাছ শুধু কাঠের উৎস নয়। একটি গাছ বড় হতে অনেক সময় লাগে। এটি মানুষকে ছায়া দেয়, বাতাস শোধন করে এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে লাগানো গাছ রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষকে আরও সচেতন হতে হবে।
কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ টি এম কামরুল ইসলাম বলেন, সড়কের পাশে ব্যক্তিগত উদ্যোগে গাছ লাগানো নিঃসন্দেহে একটি ভালো ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ। গাছ কেটে ফেলার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। ইচ্ছাকৃতভাবে গাছ কাটার সঙ্গে কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চার বছর ধরে গাছগুলোর যত্ন নিয়েছিলেন মাসুদ পারভেজ। বিনিময়ে তাঁর প্রত্যাশা ছিল না কোনো অর্থ কিংবা স্বীকৃতি। চেয়েছিলেন শুধু একটু সবুজ, পথচারীদের জন্য একটু ছায়া আর একদিন কৃষ্ণচূড়ার লাল ফুলে সড়কের পাশটা রাঙিয়ে উঠুক।
সেই স্বপ্ন প্রায় পূর্ণ হওয়ার আগেই কেটে ফেলা হলো গাছগুলো।
এখন সেখানে পড়ে আছে শুধু কয়েকটি কাটা গুঁড়ি—আর চার বছরের যত্নে গড়ে তোলা স্বপ্ন হারানোর এক গাছপ্রেমী মানুষের গভীর আক্ষেপ।