চিকিৎসক, নার্স ও সহায়ক কর্মচারীর তীব্র সংকটে বগুড়ার সরকারি হাসপাতালগুলোতে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। প্রতিদিন বাড়ছে রোগীর চাপ, কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়ছে না জনবল। ফলে কোথাও শয্যা ছাড়িয়ে মেঝে-বারান্দায় রোগী রাখতে হচ্ছে। সীমিতসংখ্যক চিকিৎসক ও নার্স দিয়ে অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
জেলার সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনুমোদিত ২ হাজার ৭৮৭টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন ১ হাজার ৮২০ জন। অর্থাৎ ৯৬৭টি পদই শূন্য। এর মধ্যে চিকিৎসক পদই শূন্য রয়েছে ২৪১টি।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর শয্যা বাড়ানো হলেও প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় উপজেলা ভিত্তিক হালনাগাদ জনবল চাহিদার তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বগুড়ার সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনুমোদিত ৪৮৩টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২৪২ জন। ফলে শূন্য রয়েছে ২৪১টি পদ।
উপজেলা পর্যায়ে সংকট আরও প্রকট। আদমদীঘি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩৯ জন চিকিৎসকের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ১৫ জন। দুপচাঁচিয়ায় ৪২টির মধ্যে ২২ জন, শিবগঞ্জে ৩৯টির মধ্যে ২১ জন এবং গাবতলীতে ৪২টি পদের বিপরীতে কর্মরত ২০ জন।
সারিয়াকান্দিতে অনুমোদিত ৪৪টি চিকিৎসক পদের মধ্যে কর্মরত ১৯ জন। সোনাতলায় ৩৭টি পদের মধ্যে ২১টি শূন্য। সান্তাহার ২০ শয্যার হাসপাতালে ছয়জন চিকিৎসকের বিপরীতে আছেন মাত্র দুজন। আলিয়ারহাট ২০ শয্যার হাসপাতালে সাতটি পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র দুজন।
এ ছাড়া ধুনট, শেরপুর ও শাজাহানপুরেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক চিকিৎসক পদ শূন্য রয়েছে। নন্দীগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৭টি চিকিৎসক পদের মধ্যে কর্মরত ১৯ জন। সেখানে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের পদেও রয়েছে বড় ধরনের ঘাটতি।
নন্দীগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী ভর্তি হচ্ছেন। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ইকবাল মাহমুদ লিটন জানান, প্রতিদিন অন্তত ৯৮ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় শয্যার পাশাপাশি মেঝে ও বারান্দাতেও রোগীদের রাখতে হচ্ছে।
জনবল সংকটের মধ্যেই কয়েকজন চিকিৎসক বদলি হয়েছেন। কেউ ছুটিতে, কেউ কর্মস্থলে অনুপস্থিত। একজন চিকিৎসক ঢাকায় কাজ করছেন বলেও জানান তিনি।
এদিকে মেডিকেল অফিসার ডা. কাশমেরী আফরিনের দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার বিষয়টিও সামনে এসেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, তিনি ছুটি না নিয়েই কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন এবং দীর্ঘদিন ধরে তার কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।
নন্দীগ্রামের ২০ শয্যার হাসপাতালেও সংকট প্রকট। সার্জন, অ্যানেসথেসিয়া ও গাইনি বিশেষজ্ঞসহ কয়েকজন চিকিৎসক ডেপুটেশনে অন্যত্র কর্মরত থাকায় সেবা দিতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রোগীর চাপ বিবেচনায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর শয্যা সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। আধুনিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে। তবে শয্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে চিকিৎসক, নার্স ও সহায়ক কর্মচারী না থাকায় কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যে দেখা যায়, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি সংশ্লিষ্ট ৪৪৩টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ৪৩২ জন কর্মরত আছেন। এ শ্রেণিতে শূন্য পদ ১১টি।
অন্যদিকে তৃতীয় শ্রেণির ১ হাজার ৫১৬টি পদের বিপরীতে কর্মরত ১ হাজার ৬২ জন; শূন্য রয়েছে ৪৫৪টি। চতুর্থ শ্রেণির ৩৪০টি পদের মধ্যে কর্মরত মাত্র ৮৩ জন, আর শূন্য রয়েছে ২৫৬টি।
ফলে বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ এবং ভর্তি রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে চিকিৎসক-নার্সদের।
সরকারি হাসপাতালের জনবল ও ব্যবস্থাপনা সংকটের সুযোগ নিচ্ছে ব্যক্তি মালিকানাধীন ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, প্যাথলজি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলো—এমন অভিযোগ রয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত তদারকি চালানো হচ্ছে। পরিদর্শনে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকা, ডেলিভারি কক্ষে পর্যাপ্ত সুবিধা না থাকা, হালনাগাদ লাইসেন্স না থাকা, নিয়মিত ডিউটি চিকিৎসক না থাকা এবং অপরিচ্ছন্ন পরিবেশসহ বিভিন্ন অনিয়ম পাওয়া যাচ্ছে। এসব ঘটনায় জরিমানা ও অন্যান্য আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বগুড়া সিভিল সার্জন (ভারপ্রাপ্ত) ডা. ফারজানুল ইসলাম বলেন, সীমিতসংখ্যক চিকিৎসক ও নার্স দিয়ে সাধ্যমতো রোগীদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। জনবল সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় জনবলের চাহিদাপত্র দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো সমাধান আসেনি।
তিনি বলেন, শয্যা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জাম পাওয়া গেলে চিকিৎসাসেবার মান আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর শয্যা বাড়ানো হয়েছে। দেশের স্বাস্থ্য খাতের সংকট কাটাতে চিকিৎসক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও চিকিৎসকরা দিনরাত সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
তবে বাস্তবে জনবল সংকটের কারণে জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে বাড়তি রোগীর চাপ সামলানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।