দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাম্প্রতিক সময়ে তুচ্ছ বিষয় ও রাজনৈতিক কোন্দলকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা, হিংসাত্মক ব্যবহার, রক্তক্ষয়ী সংঘাত এবং দেশীয় অস্ত্রের প্রকাশ্যে মহড়া আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনগুলোর এসব কর্মকান্ডে শিক্ষার পরিবেশ মারাত্মকভাবে বিঘ্ন ঘটছে এবং উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি সংকটের আশংঙ্খা করা হচ্ছে । এসব সংঘাত নিরসনে এবং শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহঅবস্থান গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন শিক্ষাবিদ ও বিশিষ্টজনরা।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাবিনা শরমীন ভোরের ডাককে বলেন, প্রত্যেকটা ছাত্রসংগঠনেরই নিজস্ব রাজনৈতিক আদর্শ আছে। যার যার আদর্শ সে ধারণ করবে। এক্ষেত্রে সব সংগঠনের নেতাকর্মীদের পারস্পারিক শ্রদ্ধাবোধ থাকা জরুরি। সংগঠনগুলোর মধ্যে ছোটখাটো ভুল বুঝাবুঝি নিয়ে নিয়ে সহিংসতায় জড়ানোর আগেই নেতারা বসে আলোচনা বা সমঝোতা করলে, তা সমাধান হয়ে যায়। তিনি বলেন, বিগত সরকারের সময়ে ছাত্রসংগঠনগুলো যেভাবে চলছিলো, এখন সেভাবে চললে হবেনা। ওদের থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত। তবে ক্যাম্পাসে বর্তমান ছাত্র সংগঠনগুলোর সহঅবস্থান বজায় রাখা জরুরি। তা না হলে শিক্ষা প্রশাসনে এ নিয়ে মারাত্মক এফেক্ট পরে, শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্ন ঘটে।
শিক্ষাবিদ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ বলেন, মত, পথ ও আদর্শের ভিন্নতা গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক বিষয় হলেও সেই ভিন্নতা কখনোই সংঘর্ষ, অস্ত্রের মহড়া কিংবা রক্তপাতের কারণ হতে পারে না। জাতীয় স্বার্থ, শিক্ষার পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার প্রশ্নে সব পক্ষকে সংযম, সংলাপ ও সহাবস্থানের পথে এগিয়ে আসতে হবে। অন্যথায় শিক্ষাঙ্গনের অস্থিরতা দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার জন্য দীর্ঘমেয়াদি সংকট ডেকে আনতে পারে।
ক্যাম্পাসগুলোতে সার্বিক শিক্ষার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়া নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। তারা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে অনেক ধৈর্য ধারণ করে এইচএসসি শেষ করে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। তাই সামান্য কথা কাটাকাটি বা রাগ-ক্ষোভ তাদের হজম করা শিখতে হবে। তা না হলে তারা ভবিষ্যতে কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নেবে কিংবা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন শিক্ষকরা। তারা আক্ষেপ প্রকাশ করে জানান, ছাত্রনেতারাও তাঁদেরই শিক্ষার্থী, যাঁদের তাঁরা শ্রেণিকক্ষে পড়ান। কিন্তু সেই শিক্ষার্থীদের হাতে রামদা ও লাঠিসোঁটাসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্য শোডাউন বা মহড়া দেখা শিক্ষকদের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক ও বিব্রতকর।
গত আগষ্ট থেকে এখন পর্যন্ত তুচ্ছ বিষয় নিয়ে আন্তত ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে সহিংস সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় সাধারণ শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা আহত হয়েছেন। ২ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ্ হলে অতিথিকে সমকামীতার অভিযোগ এনে আটক করা হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ এবং পাল্টাপাল্টি শোডাউন করা হয়। ৩ আগস্ট রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যানার ও বিলবোর্ড সরানো নিয়ে ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষে ২৫ জন আহত হন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারির আবেদন করে।
৪ আগস্ট জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষ্যে প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী চলাকালে প্ল্যাকার্ড নিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করলে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হামলা করে শিবির, জকসু ও ছাত্রশক্তির নেতাদের ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেয়। দিনব্যাপী এই সংঘর্ষ গড়ায় হাসপাতালের বারান্দায়ও। এই ঘটনায় ৭০ জনেরও বেশি নেতাকর্মী আহত হন। একই দিনে ঢাকা কলেজ, ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা, সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও বিএম কলেজ সংঘাতের ঘটনা ঘটে।
গত ৩ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সামান্য কথা কাটাকাটির জেরে মধ্যরাতে শাখা ছাত্রদলের দুই গ্রুপের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও দেশীয় অস্ত্রের মহড়া ঘটে। ৪ সেপ্টেম্বর বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাসের বাইরের মেসে দরজার ছিটকিনি আটকানো নিয়ে সমাজবিজ্ঞান ও অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মুখোমুখি অবস্থান ও লাঠিসোঁটা নিয়ে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। ৫ সেপ্টেম্বর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির নেতাকে ‘বেয়াদব’ বলে চড় মারার ঘটনাকে কেন্দ্র করে কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়ক ও প্রধান ফটকে রামদাসহ দেশীয় অস্ত্র হাতে প্রকাশ্য মহড়া ও দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়।