ঢাকাই চলচ্চিত্রে নায়ক মানেই যখন নির্দিষ্ট এক ধরনের ছাঁচ, তখন সেই গণ্ডি ভেঙে নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছিলেন জাফর ইকবাল। অভিনয়, গান, পোশাক আর ব্যক্তিত্ব—সবকিছুতেই ছিলেন স্বতন্ত্র। কখনো রোমান্টিক নায়ক, কখনো দুর্দান্ত অ্যাকশন হিরো; আবার মাইক্রোফোন হাতে সংগীতশিল্পী হিসেবেও পেয়েছেন জনপ্রিয়তা। ভক্তদের কাছে তাই তিনি ছিলেন ‘বাংলার এলভিস প্রিসলি’।
আজ এই কিংবদন্তি অভিনেতা ও সংগীতশিল্পীর জন্মদিন।
১৯৫০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ঢাকার পল্টনে জন্মগ্রহণ করেন জাফর ইকবাল। মাত্র ৪১ বছরের জীবনে থেমে যায় তার পথচলা। তবে এই স্বল্প সময়েই চলচ্চিত্র ও সংগীতে এমন এক স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেন, যার কারণে মৃত্যুর বহু বছর পরও দর্শক-শ্রোতার স্মৃতিতে অমলিন তিনি।
অভিনয়ের আগে গানের জগতে
সংগীতের সঙ্গে জাফর ইকবালের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল ছোটবেলাতেই। তার বড় ভাই আনোয়ার পারভেজ ছিলেন খ্যাতিমান সংগীত পরিচালক ও সুরকার। ছোট বোন শাহনাজ রহমতুল্লাহও ছিলেন দেশের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী। সংগীতময় পরিবারে বেড়ে ওঠার সুবাদে গান হয়ে ওঠে তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মাত্র ১৬ বছর বয়সে, ১৯৬৬ সালে বন্ধুদের নিয়ে ব্যান্ড গড়ে তোলেন জাফর ইকবাল। অর্থাৎ চলচ্চিত্রে পা রাখার আগেই সংগীতশিল্পী হিসেবে তার পথচলা শুরু হয়েছিল।
১৯৬৯ সালে খান আতাউর রহমান পরিচালিত ‘আপন পর’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় তার। এ সিনেমায় তার বিপরীতে ছিলেন কবরী। এরপর ধীরে ধীরে অভিনয়েও নিজের জায়গা করে নেন তিনি।
জাফর ইকবালের জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে সরাসরি অংশ নেন তিনি।
‘মাস্তান’ থেকে ‘নয়নের আলো’
সত্তরের দশকের মাঝামাঝি ‘মাস্তান’ সিনেমায় অভিনয়ের মধ্য দিয়ে ড্যাশিং নায়ক হিসেবে আলাদা পরিচিতি পান জাফর ইকবাল। পর্দায় তার উপস্থিতি, ব্যক্তিত্ব ও অভিনয়ের ধরন তাকে সমসাময়িক নায়কদের থেকে আলাদা করে তোলে।
এরপর ‘নয়নের আলো’ তাকে প্রতিষ্ঠিত করে রোমান্টিক নায়ক হিসেবে। তবে শুধু অভিনয় নয়, তার তারকাখ্যাতির পেছনে বড় ভূমিকা ছিল নিজস্ব স্টাইলেরও। পোশাক, চুলের ছাঁট, শরীরী ভাষা এবং পর্দায় চরিত্র উপস্থাপনের ধরন—সবকিছুতেই ছিল নিজস্বতা।
সে সময়ের তরুণদের মধ্যেও তার সাজপোশাক ও ব্যক্তিত্বের প্রভাব দেখা যেত। পরবর্তী সময়ে তাই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অন্যতম স্টাইলিশ নায়ক ও ফ্যাশন আইকন হিসেবে স্মরণ করা হয় তাকে।
কেন ‘বাংলার এলভিস প্রিসলি’?
পশ্চিমা সংগীতের কিংবদন্তি এলভিস প্রিসলির প্রতি জাফর ইকবালের বিশেষ অনুরাগ ছিল। সংগীতচর্চা, পোশাক ও ব্যক্তিত্বেও সেই প্রভাবের ছাপ দেখা যেত। এ কারণেই ভক্তদের কাছে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘বাংলার এলভিস প্রিসলি’ নামে।
অভিনয়ের পাশাপাশি সংগীতশিল্পী হিসেবেও নিজের আলাদা অবস্থান তৈরি করেছিলেন তিনি। তার প্রথম সিনেমায় গাওয়া গান ছিল ‘পিচ ঢালা পথ’। এছাড়া তার কণ্ঠে গাওয়া ‘হয় যদি বদনাম হোক আরও’, ‘সুখে থেকো ও আমার নন্দিনী’ ও ‘প্রেমের আগুনে’ গানগুলোও শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয়তা পায়। আশির দশকে প্রকাশিত হয়েছিল তার একটি অডিও অ্যালবামও।
দেড় শতাধিক সিনেমায় অভিনয়
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে প্রায় ১৫০টি সিনেমায় অভিনয় করেন জাফর ইকবাল। তার উল্লেখযোগ্য ছবির মধ্যে রয়েছে ‘সূর্য সংগ্রাম’, ‘মাস্তান’, ‘নয়নের আলো’, ‘অবুঝ হৃদয়’, ‘ভাই বন্ধু’, ‘অবদান’, ‘প্রেমিক’, ‘আশীর্বাদ’, ‘প্রতিরোধ’, ‘এক মুঠো ভাত’, ‘মেঘ বিজলী বাদল’, ‘সন্ধি’ ও ‘বন্ধু আমার’সহ আরও অনেক চলচ্চিত্র।
অভিনেত্রী ববিতার সঙ্গে ছিল তার জনপ্রিয় জুটি। দুজনকে একসঙ্গে প্রায় ৩০টি সিনেমায় দেখা গেছে।
রোমান্টিক চরিত্র থেকে অ্যাকশন—বিভিন্ন ধরনের ভূমিকায় অভিনয় করে নিজের বহুমুখী প্রতিভার পরিচয় দেন জাফর ইকবাল। অভিনয় ও সংগীতের এই দ্বৈত পরিচয়ই তাকে সমসাময়িক তারকাদের মধ্যে আলাদা করে তুলেছিল।
৪১ বছরেই থেমে যায় পথচলা
খুব অল্প বয়সেই জীবনের শেষ অধ্যায়ে পৌঁছে যান জাফর ইকবাল। ক্যান্সার, হৃদ্যন্ত্রের জটিলতা ও কিডনির সমস্যাসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগে ১৯৯২ সালের ৮ জানুয়ারি মাত্র ৪১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন তিনি।
তার শেষ মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা ছিল ‘লক্ষ্মীর সংসার’।
জীবন দীর্ঘ হয়নি, কিন্তু শিল্পী হিসেবে তার রেখে যাওয়া কাজ ছিল বহুমাত্রিক। সময়ের সঙ্গে ঢাকাই চলচ্চিত্রের অনেক কিছু বদলে গেলেও দর্শকের স্মৃতিতে জাফর ইকবাল আজও আলাদা এক নাম—অভিনয়ে স্বতন্ত্র, গানে পরিচিত এবং ব্যক্তিত্বে অনন্য এক স্টাইলিশ নায়ক।