দেশভাগে দেশ বদলালেন, রাজত্ব বদলাল না—এক গানের দাম ছিল অন্যদের চেয়ে ৫ গুণ!

বিনোদন ডেস্ক

বিনোদন

একসময় মঞ্চে তাঁর কণ্ঠ শুনে পরিবারের একজন বলেছিলেন, এই মেয়েই একদিন পরিবারের ভাগ্য বদলে দেবে। ভবিষ্যদ্বাণীটি যে এত দ্রুত সত্যি

2026-09-21T18:33:04+00:00
2026-09-21T18:33:04+00:00
  মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৭ আশ্বিন ১৪৩৩
 
মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিনোদন
দেশভাগে দেশ বদলালেন, রাজত্ব বদলাল না—এক গানের দাম ছিল অন্যদের চেয়ে ৫ গুণ!
বিনোদন ডেস্ক
সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:৩৩ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
একসময় মঞ্চে তাঁর কণ্ঠ শুনে পরিবারের একজন বলেছিলেন, এই মেয়েই একদিন পরিবারের ভাগ্য বদলে দেবে। ভবিষ্যদ্বাণীটি যে এত দ্রুত সত্যি হবে, তা হয়তো তখন কেউ ভাবেননি। মাত্র কয়েক বছর বয়সেই সংগীতের তালিম, শিশুশিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্রে অভিষেক, এরপর নায়িকা—সবকিছু যেন ঝড়ের গতিতে এগিয়েছে।

দেশভাগের আগে ভারতের চলচ্চিত্রে তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠিত তারকা। দেশভাগের পর পাড়ি জমালেন পাকিস্তানে। সেখানেও থেমে থাকেননি। অভিনয়ের পাশাপাশি গান, প্রযোজনা, পরিচালনা—সব ক্ষেত্রেই নিজের জায়গা তৈরি করেন। একসময় অভিনয় ছেড়ে পুরোপুরি সংগীতে মন দেন। হয়ে ওঠেন ‘মালিকা-ই-তারান্নুম’—সুরের রানি নূরজাহান।

২০২৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর নূরজাহানের জন্মের ১০০ বছর পূর্ণ হলো। ১৯২৬ সালের এই দিনে ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাবের কাসুরে জন্ম নেওয়া এই শিল্পী পরবর্তী সময়ে ভারত ও পাকিস্তান—দুই দেশের চলচ্চিত্র ও সংগীতের ইতিহাসে স্থায়ী ছাপ রেখে যান।

ছয় বছরেই সংগীতের তালিম

নূরজাহানের আসল নাম ছিল আল্লাহ ওয়াসাই। সংগীতশিল্পী পরিবারে জন্ম নেওয়া এই শিশুর প্রতিভা ছোট বয়সেই নজরে আসে। ছয় বছর বয়স থেকেই সংগীতের তালিম শুরু করেন তিনি। পরে কলকাতায় গিয়ে মঞ্চ ও চলচ্চিত্রে কাজের সুযোগ পান।

শিশুশিল্পী হিসেবে পরিচিতি পান ‘বেবি নূরজাহান’ নামে। ১৯৩০-এর দশকে মঞ্চ ও চলচ্চিত্রে তাঁর ব্যস্ততা শুরু হয়। ১৯৩৫ সালের ‘পিন্ড দি কুড়ি’ ছবিতে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় করেন। এরপর পাঞ্জাবি ও উর্দু ছবিতে নিয়মিত কাজ করতে থাকেন।

১৯৩৮ সালে ‘গুল বাকাওলি’ ছবির জন্য গান রেকর্ড করেন তিনি। ছোট বয়সেই অভিনয় ও সংগীত—দুই ক্ষেত্রেই তাঁর পরিচিতি বাড়তে থাকে।

বম্বেতে নায়িকা, গায়িকা—দুই পরিচয়েই উত্থান

কলকাতা ও লাহোরের পর নূরজাহানের ক্যারিয়ার তাঁকে নিয়ে যায় বম্বেতে। চল্লিশের দশকে সেখানে তিনি আর শুধু শিশুশিল্পী নন; পূর্ণাঙ্গ নায়িকা ও গায়িকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান।

১৯৪২ সালের ‘খানদান’ তাঁর ক্যারিয়ারে বড় পরিবর্তন আনে। অভিনয়ের পাশাপাশি গানও তাঁকে দ্রুত জনপ্রিয় করে তোলে। এরপর ‘জিনাত’, ‘আনমোল ঘড়ি’ ও ‘জুগনু’র মতো ছবিতে অভিনয় করেন।

১৯৪৫ সালের ‘জিনাত’-এর গান তাঁকে বিশেষ খ্যাতি এনে দেয়। ‘বুলবুলো মাত রো’ গানটির পরই তাঁর সঙ্গে ‘মালিকা-ই-তারান্নুম’ উপাধিটি জুড়ে যায়। পরে ‘আনমোল ঘড়ি’তে অভিনয় ও গান এবং ১৯৪৭ সালের ‘জুগনু’তে দিলীপ কুমারের বিপরীতে অভিনয় তাঁকে তৎকালীন ভারতীয় চলচ্চিত্রের শীর্ষ তারকাদের একজন করে তোলে।

দেশভাগে বদলে গেল জীবন

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর নূরজাহান স্বামী ও চলচ্চিত্র পরিচালক শওকত হুসেইন রিজভির সঙ্গে পাকিস্তানে চলে যান।

নতুন দেশ তখন নিজেদের চলচ্চিত্রশিল্প দাঁড় করানোর সংগ্রামে। দেশভাগের কারণে শিল্পী, পরিচালক, প্রযোজক ও প্রযুক্তিবিদদের বড় একটি অংশ ভারত চলে যাওয়ায় লাহোরের চলচ্চিত্রশিল্পও বড় ধাক্কা খায়। সেই সময় নূরজাহান সেখানে গিয়ে শুধু নিজের ক্যারিয়ারই গড়েননি, পাকিস্তানের চলচ্চিত্রশিল্পের ভিত্তি শক্ত করতেও ভূমিকা রাখেন।

১৯৫১ সালে মুক্তি পায় ‘চানভে’। এতে অভিনয় ও গান করার পাশাপাশি পরিচালনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন নূরজাহান। তাঁকে পাকিস্তানের প্রথম নারী চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

এরপর ‘দুপাট্টা’, ‘পাতে খান’, ‘ইন্তেজার’, ‘আনারকলি’ ও ‘কোয়েল’-এর মতো ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। তবে সময়ের সঙ্গে বুঝতে পারেন, পর্দার চেয়ে তাঁর কণ্ঠের জন্যই দর্শকের আগ্রহ বেশি।

অভিনয় ছেড়ে শুধু গানে

১৯৫৯ সালের পর নূরজাহান অভিনয় থেকে সরে গিয়ে পুরোপুরি সংগীতে মন দেন। এরপর শুরু হয় তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে দীর্ঘ ও প্রভাবশালী অধ্যায়।

নায়িকার ঠোঁটে গান গাওয়ার বদলে এবার তাঁর নিজের কণ্ঠই হয়ে উঠল চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। উর্দু, পাঞ্জাবি ও সিন্ধিসহ বিভিন্ন ভাষায় গান গেয়ে তিনি উপমহাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী শিল্পীতে পরিণত হন। তাঁর রেকর্ড করা গানের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন হিসাব থাকলেও প্রায় ১০ হাজার গানের কথা উল্লেখ করা হয়।

অন্যদের চেয়ে পাঁচ গুণ পারিশ্রমিক

নূরজাহানের জনপ্রিয়তার আরেকটি দিক ছিল তাঁর পারিশ্রমিক। The Indian Express-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানি চলচ্চিত্রে অন্য অনেক গায়িকা যেখানে একটি গানের জন্য প্রায় ৩৫০ রুপি পেতেন, নূরজাহানের পারিশ্রমিক ছিল প্রায় ২ হাজার রুপি—অর্থাৎ প্রায় পাঁচ গুণ।

আরেকটি Dawn প্রতিবেদনে তবলাশিল্পী উস্তাদ তাফুর স্মৃতিচারণ উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, একসময় নূরজাহান একটি গানের জন্য ২ হাজার রুপি নিতেন। তাফুর সঙ্গে একটি গানের জন্য ১ হাজার ৫০০ রুপিতে কাজ করার কথাও সেখানে উল্লেখ রয়েছে।

এই পারিশ্রমিক তাঁর শিল্পী হিসেবে বাজারমূল্য এবং নিজের কাজের মূল্য সম্পর্কে তাঁর আত্মবিশ্বাসেরও ইঙ্গিত দেয়।

ফয়েজের কবিতা থেকে যুদ্ধের গান

নূরজাহানের কণ্ঠ শুধু চলচ্চিত্রের গানেই সীমাবদ্ধ ছিল না। কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের কবিতাও তাঁর কণ্ঠে নতুন মাত্রা পায়। ‘মুঝসে পেহলি সি মোহাব্বত’ তাঁর স্মরণীয় পরিবেশনাগুলোর একটি।

১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় তাঁর কণ্ঠ আরও ভিন্ন ভূমিকা নেয়। রেডিও ও টেলিভিশনে দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করে তিনি পাকিস্তানে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান। ‘এ পুত्तर হাট্টান তে নাই বিকদে’সহ তাঁর পরিবেশিত গানগুলো পরবর্তীকালে পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়।

লতা মঙ্গেশকরের কাছেও ছিলেন অনুপ্রেরণা

দেশভাগ দুই শিল্পীকে দুই দেশে নিয়ে গেলেও নূরজাহান ও লতা মঙ্গেশকরের শিল্পীসত্তার মধ্যে একটি বিশেষ যোগ ছিল। লতা মঙ্গেশকর প্রকাশ্যে নূরজাহানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন এবং তাঁকে নিজের আদর্শদের একজন হিসেবে দেখেছেন বলে বিভিন্ন জীবনীমূলক প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।

দুই দেশের রাজনৈতিক দূরত্বের মধ্যেও সংগীতের এই পারস্পরিক শ্রদ্ধা ছিল আলাদা এক সাংস্কৃতিক সেতু।

১৯৮২ সালে ভারতে ফেরেন

দেশভাগের পর দীর্ঘ বিরতির শেষে ১৯৮২ সালে ভারতে সফর করেন নূরজাহান। তত দিনে তিনি পাকিস্তানের কিংবদন্তি শিল্পী। তবে ভারতে তাঁর পুরোনো শ্রোতা ও ভক্তদের কাছেও জনপ্রিয়তা অটুট ছিল। The Indian Express তাঁর এই সফরকে দুই দেশের সাংস্কৃতিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছে।

শেষ পর্যন্ত কণ্ঠের সঙ্গেই

নূরজাহানের সংগীতজীবন ছয় দশকেরও বেশি সময় বিস্তৃত ছিল। ১৯৯৬ সালে তাঁর শেষ রেকর্ডিংয়ের কথা Dawn উল্লেখ করেছে। অর্থাৎ শিশুশিল্পী হিসেবে যে কণ্ঠের যাত্রা শুরু হয়েছিল, জীবনের শেষ দিক পর্যন্ত তা থামেনি।

২০০০ সালের ২৩ ডিসেম্বর করাচিতে ৭৪ বছর বয়সে মারা যান নূরজাহান। কিন্তু তাঁর মৃত্যুতে থামেনি তাঁর কণ্ঠের যাত্রা।

কাসুরের সংগীত পরিবারের ছোট্ট মেয়ে থেকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের নায়িকা, দেশভাগের পর পাকিস্তানের চলচ্চিত্রশিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ, এরপর ‘মালিকা-ই-তারান্নুম’—নূরজাহানের জীবন যেন উপমহাদেশের চলচ্চিত্র ও সংগীতেরই এক দীর্ঘ ইতিহাস।

ভারত তাঁকে তারকা বানিয়েছিল, পাকিস্তান তাঁকে দিয়েছিল কিংবদন্তির মর্যাদা। আর তাঁর কণ্ঠ দুই দেশের সীমান্ত পেরিয়ে আজও শ্রোতাদের কাছে ফিরে আসে।


Loading...
Loading...

বিনোদন- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: