অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) ভিয়েনায় আইএইএ’র সদর দপ্তরে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দ্রুত জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের লক্ষ্যে আইএইএ’র সহযোগিতা কামনা করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী। একই সঙ্গে পারমাণবিক প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার সম্প্রসারণ, পারমাণবিক নিরাপত্তা জোরদার, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী পারমাণবিক প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে আইএইএ মহাপরিচালকের ভূমিকার জন্য তাকে ধন্যবাদ জানান।
বৈঠকে বাংলাদেশ ও আইএইএ’র মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও বাড়ানোর পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে পরমাণু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে বাংলাদেশের সক্ষমতা জোরদারের বিষয়ে মতবিনিময় হয়।
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে আইএইএ’র কারিগরি সহযোগিতা কর্মসূচির মাধ্যমে স্বাস্থ্য, কৃষি, খাদ্য, পানি ব্যবস্থাপনা, শিল্প ও জ্বালানিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে উপকৃত হয়ে আসছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ২০২৬-২০৩২ মেয়াদের Country Programme Framework (CPF) স্বাক্ষর করেছে, যা আগামী বছরগুলোতে প্রযুক্তিগত সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি করবে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করে ফকির মাহবুব আনাম বলেন, ইউনিট-১-এ ফুয়েল লোডিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ কার্বনমুক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। এর মাধ্যমে দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ পারমাণবিক নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পারমাণবিক বর্জ্য ও স্পেন্ট ফুয়েল ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত যৌথ কনভেনশনে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি একটি নিরাপদ ও দায়িত্বশীল পারমাণবিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে দেশের অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
বৈঠকে ‘Rays of Hope: Cancer Care for All’ উদ্যোগের অগ্রগতির বিষয়েও আলোচনা হয়। এ উদ্যোগ এগিয়ে নিতে আইএইএ মহাপরিচালক ও সংস্থাটির সচিবালয়ের নেতৃত্বের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ২০২৫ সালে ‘Rays of Hope’ উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে এবং এই অংশীদারিত্বকে জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর কর্মসূচিতে রূপ দিতে আইএইএ’র সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। এর অন্যতম অগ্রাধিকার হলো একটি সমন্বিত ওয়ান-স্টপ ক্যানসার কেয়ার সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে সহজলভ্য ও রোগীকেন্দ্রিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
ফকির মাহবুব আনাম বলেন, সক্ষমতা বৃদ্ধি, জ্ঞান বিনিময় এবং টেকসই ক্যানসার চিকিৎসাব্যবস্থা শক্তিশালী করতে আইএইএ’র কারিগরি সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে ক্যানসার চিকিৎসার সুযোগ সম্প্রসারণে ‘Rays of Hope’ উদ্যোগের আওতায় সহযোগিতা আরও জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
মন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ আগামী নভেম্বর অনুষ্ঠেয় IAEA-WHO-IMPACT Review Mission-এর দিকে আগ্রহের সঙ্গে তাকিয়ে আছে। এ মিশন বাংলাদেশের জাতীয় ক্যানসার নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতার প্রমাণভিত্তিক মূল্যায়ন এবং ক্যানসার চিকিৎসাব্যবস্থার বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাস্তবভিত্তিক অগ্রাধিকার নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সুফল জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রী বলেন, পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুধু প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি, খাদ্য ও কৃষি উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণে কাজে লাগাতে হবে।
তরুণ গবেষক ও বিজ্ঞানীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি, গবেষণা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে জ্ঞান ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। শিক্ষার্থী, বিজ্ঞানী ও গবেষকদের জন্য আন্তর্জাতিক শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, ফেলোশিপ ও যৌথ গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণে আইএইএ মহাপরিচালকের সহযোগিতা কামনা করেন মন্ত্রী।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে আরও সমন্বিত, ন্যায়সংগত ও টেকসই ক্যানসার চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য। পরমাণু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সুফল সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এমন মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে আইএইএ ও এর অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
বৈঠকে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তির প্রসার, পারমাণবিক নিরাপত্তা জোরদার এবং টেকসই উন্নয়নে আইএইএ’র আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও গভীর করার আহ্বান জানান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী।
এ সময় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন, ভিয়েনায় নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত তৌফিক হাসান, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান ড. এম. মঈনুল ইসলাম এবং যুগ্মসচিব শেখ মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।