বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সৃষ্ট চরিত্রগুলোর মধ্যে ‘দেবদাস’ সবচেয়ে বেশি আলোচিত। না-পাওয়া প্রেম, সিদ্ধান্তহীনতা, অহংকার, অনুশোচনা আর গভীর বেদনায় গড়া এই চরিত্র প্রায় এক শতাব্দী ধরে উপমহাদেশের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের আকৃষ্ট করে আসছে।
শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’ অবলম্বনে বিভিন্ন সময়ে একাধিক ভাষায় সিনেমা নির্মিত হয়েছে। বাংলা ও হিন্দি সিনেমায় কিংবদন্তি থেকে জনপ্রিয়—বহু অভিনেতাই নাম ভূমিকায় অভিনয় করে নিজেদের মতো করে চরিত্রটিকে পর্দায় তুলে ধরেছেন।
ঢালিউডে দুই দেবদাস
বাংলাদেশে ‘দেবদাস’ নিয়ে নির্মিত হয়েছে দুটি সিনেমা। দুটিতেই নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন জনপ্রিয় দুই অভিনেতা—বুলবুল আহমেদ ও শাকিব খান।
বুলবুল আহমেদ: ১৯৮২ সালে চাষী নজরুল ইসলামের পরিচালনায় মুক্তি পায় ‘দেবদাস’। এতে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন বুলবুল আহমেদ। পার্বতী চরিত্রে ছিলেন কবরী এবং চন্দ্রমুখীর ভূমিকায় অভিনয় করেন আনোয়ারা। বুলবুল আহমেদের অভিনয়ে চরিত্রটির বিষণ্ণতা ও অন্তর্দ্বন্দ্ব বিশেষভাবে ফুটে ওঠে।
শাকিব খান: প্রায় তিন দশক পর একই নির্মাতা চাষী নজরুল ইসলাম আবারও ‘দেবদাস’ নির্মাণ করেন। ২০১৩ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটিতে দেবদাস চরিত্রে অভিনয় করেন শাকিব খান। পার্বতী চরিত্রে ছিলেন অপু বিশ্বাস এবং চন্দ্রমুখীর ভূমিকায় অভিনয় করেন মৌসুমী।
বলিউডে তিনবার দেবদাস
হিন্দি সিনেমাতেও দেবদাস চরিত্রে অভিনয় করেছেন একাধিক প্রজন্মের অভিনেতা।
কে. এল. সায়গল: ১৯৩৬ সালে প্রথমবার হিন্দি সিনেমায় দেবদাস চরিত্রে দেখা যায় কে. এল. সায়গলকে। সিনেমাটি পরিচালনা করেন প্রমথেশ বড়ুয়া।
দিলীপ কুমার: ১৯৫৫ সালে বিমল রায়ের পরিচালনায় ‘দেবদাস’ হয়ে পর্দায় আসেন দিলীপ কুমার। তার বিপরীতে পার্বতী চরিত্রে ছিলেন সুচিত্রা সেন এবং চন্দ্রমুখীর চরিত্রে বৈজয়ন্তীমালা।
শাহরুখ খান: ২০০২ সালে সঞ্জয় লীলা ভানসালীর ‘দেবদাস’ সিনেমায় নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন শাহরুখ খান। তার সঙ্গে পার্বতীর চরিত্রে ছিলেন ঐশ্বরিয়া রাই এবং চন্দ্রমুখীর চরিত্রে মাধুরী দীক্ষিত। সিনেমাটি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।
টলিউডে একাধিক প্রজন্মের দেবদাস
বাংলা সিনেমার টলিউডেও বিভিন্ন সময়ে একাধিক অভিনেতা দেবদাস চরিত্রে অভিনয় করেছেন।
ফণী বর্মা: ১৯২৮ সালে নরেশ মিত্রের পরিচালনায় নির্মিত ‘দেবদাস’কে এই উপন্যাসের প্রথম চলচ্চিত্র অভিযোজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এতে দেবদাস চরিত্রে অভিনয় করেন ফণী বর্মা।
প্রমথেশ বড়ুয়া: ১৯৩৫ সালে প্রথম সবাক ‘দেবদাস’ নির্মাণ করেন প্রমথেশ বড়ুয়া। পরিচালনার পাশাপাশি নাম ভূমিকাতেও অভিনয় করেন তিনি। পার্বতী চরিত্রে ছিলেন যমুনা বড়ুয়া এবং চন্দ্রমুখীর ভূমিকায় চন্দ্রাবতী দেবী।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়: ১৯৭৯ সালে দিলীপ রায়ের পরিচালনায় নির্মিত ‘দেবদাস’ সিনেমায় নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। পার্বতীর চরিত্রে ছিলেন সুমিত্রা মুখোপাধ্যায় এবং চন্দ্রমুখীর চরিত্রে সুপ্রিয়া দেবী।
প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়: ২০০২ সালে শক্তি সামন্তের পরিচালনায় আবারও বড় পর্দায় আসে ‘দেবদাস’। এতে দেবদাস চরিত্রে অভিনয় করেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। পার্বতী চরিত্রে ছিলেন অর্পিতা পাল এবং চন্দ্রমুখীর চরিত্রে ইন্দ্রাণী হালদার।
প্রজন্ম বদলেছে, বদলেছে সিনেমার ভাষা ও নির্মাণশৈলী। কিন্তু শরৎচন্দ্রের সেই বিষণ্ণ প্রেমিক দেবদাস বারবার ফিরে এসেছেন পর্দায়—কখনও বুলবুল আহমেদ, কখনও দিলীপ কুমার, কখনও শাহরুখ খান, আবার কখনও শাকিব খান বা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের রূপে।