প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়। এরপর নিয়মিত কথোপকথন, বন্ধুত্ব, কখনো প্রেমের প্রস্তাব। ধীরে ধীরে বিশ্বাস তৈরি করে নির্দিষ্ট একটি জায়গায় দেখা করার আমন্ত্রণ। সেখানে যাওয়ার পরই বদলে যায় দৃশ্যপট। আগে থেকে প্রস্তুত থাকা সহযোগীরা হাজির হয়। গোপনে ধারণ করা হয় অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি ও ভিডিও। এরপর শুরু হয় ভয় দেখানো- পরিবারের কাছে পাঠানো হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হবে, নষ্ট হবে সামাজিক মর্যাদা। শেষ পর্যন্ত দাবি করা হয় মোটা অঙ্কের টাকা। আর এভাবেই প্রেমের অভিনয়কে হাতিয়ার বানিয়ে চলছে ভয়ংকর ‘হানি ট্র্যাপ’।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এমন একাধিক ঘটনার সন্ধান মিলেছে। পুলিশের ভাষ্য ও অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, এটি এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো প্রতারণা নয়; বরং নারী-পুরুষের সমন্বয়ে সংঘবদ্ধভাবে পরিচালিত একটি অপরাধকৌশল। টার্গেটের আর্থিক সক্ষমতা, পেশা, সামাজিক অবস্থান ও ব্যক্তিগত দুর্বলতা আগে থেকেই যাচাই করে ফাঁদ পাতছে চক্রগুলো। বিশেষ করে ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, আইনজীবী ও সমাজের প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরা অনেক ক্ষেত্রে তাদের লক্ষ্য। মিরপুরে ৫ লাখ টাকা আদায় : সর্বশেষ গত ৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুরে এমন একটি চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তারের তথ্য সামনে আসে। পুলিশ সূত্র বলছে, একটি ট্রাভেল এজেন্সির মালিককে কৌশলে একটি বাসায় ডেকে নিয়ে আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ধারণের পর ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। পরে নগদ ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মোট ৫ লাখ টাকা আদায় করা হয়। এ ঘটনায় এক নারীসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে নগদ টাকা, ব্যাংকের কাগজপত্র ও মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে।
ঘটনার ধরনটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে প্রেম বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের আড়ালে সরাসরি একটি পরিকল্পিত অর্থনৈতিক অপরাধের কাঠামো দেখা যাচ্ছে। প্রথমে বিশ্বাস অর্জন, পরে নির্জন স্থানে নেওয়া, এরপর ভিডিও ধারণ এবং সবশেষে ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়, পুরো প্রক্রিয়াটিই পূর্বপরিকল্পিত বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
ব্যবসায়ীকে ফাঁসিয়ে ২ লাখ ৫৯ হাজার : এর কয়েক মাস আগে মার্চে যাত্রাবাড়ীতে এক ব্যবসায়ীকে একই কৌশলে ফাঁসানোর অভিযোগে দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, পূর্বপরিচয়ের সূত্র ধরে এক নারী ওই ব্যবসায়ীকে দেখা করার কথা বলে শনিরআখড়ায় ডেকে নেন। পরে তাকে একটি বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সহযোগীরা ঢুকে তাকে মারধর করে এবং আপত্তিকর ভিডিও ধারণের মাধ্যমে ব্ল্যাকমেইল করে ২ লাখ ৫৯ হাজার ৭০০ টাকা হাতিয়ে নেয়। অভিযানে গ্রেপ্তার দুজনের কাছ থেকে ৬৭ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় আরও একটি বিষয় স্পষ্ট, হানি ট্র্যাপ শুধু অনলাইন পরিচয়ের ওপর নির্ভর করছে না। অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো পরিচয়, ব্যবসায়িক যোগাযোগ কিংবা সামাজিক সম্পর্ককেও ব্যবহার করা হচ্ছে। অর্থাৎ ভুক্তভোগীর আস্থা অর্জন করাই চক্রের প্রথম সাফল্য।
টার্গেটের আর্থিক তথ্য আগে সংগ্রহ : জুলাইয়ে ডিবির হাতে গ্রেপ্তার হওয়া পাঁচ সদস্যের ঘটনায়ও উঠে আসে একই ধরনের পরিকল্পিত কর্মকাণ্ড। ডিবির ভাষ্য অনুযায়ী, চক্রটি ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবীদের টার্গেট করত এবং তাদের আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে আগেই তথ্য সংগ্রহ করত। এক ভুক্তভোগীকে একজন নারী প্রথমে ঋণগ্রহীতা পরিচয়ে পরিচিত হন। পরে মোবাইলে যোগাযোগ বাড়িয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করে দেখা করার প্রস্তাব দেন। নির্দিষ্ট স্থানে যাওয়ার পর তাকে একটি ফ্ল্যাটে নিয়ে গিয়ে মারধর, ভিডিও ধারণ ও ব্যক্তিগত সামগ্রী ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পরে ৩ লাখ টাকা দাবি করে তার ব্যাংক হিসাব থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনায় নয়টি মোবাইল ফোন ও একটি ওয়াকিটকিসহ বিভিন্ন আলামত উদ্ধারের কথা জানিয়েছিল ডিবি। তদন্তকারীরা সম্ভাব্য আরও ভুক্তভোগী ও চক্রের অন্য সদস্যদের শনাক্তের চেষ্টা করছিলেন।
খুলনায় বাড়ছে নতুন আতঙ্ক : রাজধানীর বাইরে খুলনাতেও হানি ট্র্যাপ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সূত্র বলছে, সেখানে ১৫ থেকে ২০টি সক্রিয় চক্র রয়েছে। এসব চক্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীসঙ্গ বা সম্পর্কের প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যায়। পরে গোপনে ছবি-ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে টাকা আদায়ের অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে। এই চক্রের সদস্যরা প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, ব্যাংকার ও আইনজীবীদের মতো পেশাজীবীদের টার্গেট করে এসব অপকর্ম চালাচ্ছে। অনেক ভুক্তভোগী সামাজিক সম্মানহানির আশঙ্কায় ঘটনা প্রকাশ করেন না, ফলে প্রকৃত চিত্র আরও বড় হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
খুলনায় সেপ্টেম্বরের দুটি ঘটনাও চক্রগুলোর কৌশলের ভয়াবহতা দেখিয়েছে। এর মধ্যে, এক যুবককে চাকরি দেওয়ার কথা বলে আবাসিক হোটেলে ডেকে আটকে মারধর ও ভিডিও ধারণ করে ৫ লাখ টাকা দাবি করার অভিযোগ ওঠে। অন্য ঘটনায় একজন আইনজীবীকে মামলার কাগজপত্র দেখানোর কথা বলে ডেকে নিয়ে আটকে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। পুলিশ অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই প্রথম দরজা : বর্তমানে ফেসবুক, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে পরিচয় তৈরি করছে চক্রগুলো। কখনো ভুয়া পরিচয়, কখনো আকর্ষণীয় ছবি, আবার কখনো সরাসরি বন্ধুত্ব বা প্রেমের প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। এরপর কথোপকথনের মাধ্যমে ব্যক্তির পেশা, পরিবার, আর্থিক সক্ষমতা ও ব্যক্তিগত দুর্বলতা সম্পর্কে ধারণা নেওয়া হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এক ঊধ্বতন কর্মকর্তা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) ভোরের ডাককে বলেন, প্রযুক্তি সম্পর্কে কম সচেতনতা এই অপরাধকে আরও সহজ করে দিচ্ছে। তবে সব ক্ষেত্রেই যে নারীই অপরাধী, এমন ধারণাও সঠিক নয়। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে নারীকে সামনে রেখে পুরুষ সহযোগীদের দিয়ে মারধর, জিম্মি, ভিডিও ধারণ ও অর্থ আদায়ের চিত্রও পাওয়া গেছে। অর্থাৎ ‘হানি ট্র্যাপ’ মূলত একটি সংঘবদ্ধ অপরাধকৌশল, এখানে নারী বা পুরুষ উভয়েই বিভিন্ন ভূমিকায় থাকতে পারে। তবে অপরাধীদের বিরুদ্ধে পুলিশর তদন্ত ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
গোপন ক্যামেরা, তারপর দীর্ঘমেয়াদি ব্ল্যাকমেইল : এই অপরাধের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, একবার ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও চক্রের হাতে গেলে ভুক্তভোগী দীর্ঘদিন চাপের মধ্যে থাকতে পারেন। প্রথমে একবার টাকা নেওয়ার পরও থেমে যায় না চক্র। আবারও টাকা দাবি করা, নতুন করে হুমকি দেওয়া কিংবা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ধারাবাহিকভাবে অর্থ আদায়ের চেষ্টা হতে পারে। আইনগতভাবেও এমন কর্মকাণ্ড গুরুতর অপরাধের আওতায় পড়তে পারে। ব্যক্তিগত বা আপত্তিকর ভিডিও ধারণ, সংরক্ষণ কিংবা প্রচারের ঘটনায় পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনসহ প্রযোজ্য অন্যান্য আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সম্মানের ভয়ই চক্রের মূল অস্ত্র : বিশেষজ্ঞদের মতে, হানি ট্র্যাপের সাফল্যের বড় কারণ সামাজিক লজ্জা ও সম্মানহানির ভয়। ভুক্তভোগী অনেক সময় পুলিশের কাছে যাওয়ার বদলে টাকা দিয়ে বিষয়টি মিটিয়ে ফেলতে চান। আর সেই সুযোগেই চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। কিন্তু টাকা দিয়ে সমস্যার সমাধান না-ও হতে পারে। বরং এতে চক্রের কাছে ভুক্তভোগীর দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে যায়। ফলে পরবর্তী সময়ে আরও বড় অঙ্কের টাকা দাবি করার ঝুঁকি তৈরি হয়।
প্রতিরোধে সতর্কতাই প্রথম ঢাল : অপরিচিত কারও আকস্মিক ঘনিষ্ঠতা, দ্রুত ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রস্তাব, নির্জন বাসা বা হোটেলে দেখা করার চাপ, এসবকে সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা জরুরি। ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও শেয়ার করার ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ সতর্কতা প্রয়োজন। কেউ ব্ল্যাকমেইল করলে আতঙ্কিত হয়ে টাকা না দিয়ে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নেওয়া উচিত। কারণ সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বলছে, ‘হানি ট্র্যাপ’ এখন শুধু প্রেমের প্রতারণা নয়; এটি প্রেম, প্রযুক্তি, গোপন ক্যামেরা ও সংগঠিত চাঁদাবাজিকে এক সুতোয় গাঁথা একটি নতুন ধরনের অপরাধব্যবস্থা। আজ টার্গেট বিত্তশালী ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠিত পেশাজীবী হলেও আগামীকাল যে কেউ এই ফাঁদের শিকার হতে পারেন। তাই সম্পর্কের নামে অচেনা মানুষের ওপর অন্ধ আস্থা নয়, সচেতনতা ও সতর্কতাই হতে পারে এই ডিজিটাল ফাঁদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ।