অবশেষে গ্যাস সরবরাহ বাড়তে শুরু করেছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার রাত থেকে সরবরাহ বেড়েছে ১৩২ দশমিক ৮ এমএমসিএফডি বা ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। এই বৃদ্ধির প্রায় পুরোটাই এসেছে এলএনজি থেকে। এতে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের জোগান বেড়েছে, যার প্রাথমিক প্রভাব পড়েছে শিল্পখাতে। দীর্ঘদিনের সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়ায় স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে। এরআগে গত সোমবার ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আশ্বাস দিয়েছিলেন মঙ্গলবার থেকে গ্যাস সরবরাহ বাড়বে। প্রতিশ্রুতি অনুসারে গত মঙ্গলবার রাত থেকে এলএনজি সরবরাহ বেড়েছে।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা যায়, গত ১৪ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ ছিল ২ হাজার ৩৪৫ দশমিক ৩ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। পরদিন একই সময়ে তা বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৪৭৮ দশমিক ১ এমএমসিএফডি। অর্থাৎ এক দিনেই সরবরাহ বেড়েছে ১৩২ দশমিক ৮ এমএমসিএফডি বা ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। এই বৃদ্ধির প্রায় পুরোটাই এসেছে এলএনজি থেকে। আরপিজিসিএলের মাধ্যমে এলএনজি সরবরাহ ৭৩১ দশমিক ৬ থেকে বেড়ে ৮৫৮ দশমিক ৪ এমএমসিএফডিতে উঠেছে। অর্থাৎ এক দিনে এলএনজি থেকে সরবরাহ বেড়েছে ১২৬ দশমিক ৮ এমএমসিএফডি বা ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ। এর ফলে শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপ আগের তুলনায় কিছুটা বাড়লেও চাহিদার পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার ফকির নিটওয়্যার লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক সৈয়দ ইমতিয়াজ রাজীব ভোরের ডাককে বলেন, চাপ ১০ পিএসআই থাকার কথা, আসছে ৪ পিএসআই। তবে আগের চেয়ে কিছুটা বেড়েছে।
নারায়ণগঞ্জ ডাইং ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আমজাদ হোসেনও জানিয়েছেন, কারখানা চালানোর প্রয়োজনীয় চাপ গতকাল পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ সরবরাহের উন্নতি শুরু হলেও শিল্পের পুরো স্বস্তি নির্ভর করছে চাপ কতটা স্থিতিশীল হয় তার ওপর। গ্যাসের এই বাড়তি জোগান বিদ্যুৎ উৎপাদনেও প্রভাব ফেলতে পারে।
জ্বালানি সংশ্লিষ্টদের ধারণা, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে সরবরাহ বাড়লে উৎপাদন বাড়বে, কমবে জাতীয় গ্রিডের ঘাটতি। ইতোমধ্যে লোডশেডিংয়ের পরিমাণও গত মাসের তুলনায় কমেছে। গত সোমবার দিবাগত রাত ১টায় আড়াই হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হলেও গতকাল দিনের সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট। গত মাসে একপর্যায়ে তা সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছিল। তবে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির পুরোপুরি উন্নতি এখনো হয়নি। কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর কয়েকটিতে কারিগরি ত্রুটি ও কয়লার জোগানসংকট এবং তেলচালিত কেন্দ্রগুলোতে ফার্নেস তেলের সীমিত মজুদের কারণে উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ সীমিত। এর মধ্যেই আদানির একটি ইউনিট চালু হওয়ায় সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে সেখান থেকে ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। রামপাল ও পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি করে ইউনিটও পুরো সক্ষমতায় নেই। গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতিতে এলএনজি আমদানির ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আরপিজিসিএল সূত্র জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরের মধ্যে আরামকোর দুটি, ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম ও পস্কোর একটি করে কার্গো ইতোমধ্যে সরবরাহ করেছে। আগামীকাল শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) আরামকো, ২৩ সেপ্টেম্বর টোটাল এনার্জি, ২৫ সেপ্টেম্বর আরামকো এবং ২৮ সেপ্টেম্বর গানভরের আরও পাঁচটি কার্গো আসার কথা। অক্টোবরের জন্যও ১১টি এলএনজি কার্গো কেনার প্রক্রিয়া চলছে; এর মধ্যে আটটি নিশ্চিত হয়েছে, বাকি তিনটির জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেও শিল্পে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি সরাসরি তদারক করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মোতাবেক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত দিনে দুবার শিল্পমালিকদের সঙ্গে কথা বলে সরবরাহ পরিস্থিতির খোঁজ নিচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুটের বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে ২৬০-২৭০ কোটি ঘনফুট। মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত মোট সরবরাহ ছিল ২ হাজার ৬০২ এমএমসিএফডি। ২১ জুলাই মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার আগে সরবরাহ ছিল ২ হাজার ৬৪৯ এমএমসিএফডি। ফলে এলএনজি সরবরাহ প্রায় আগের অবস্থায় ফিরলেও দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কম থাকায় ঘাটতি পুরোপুরি কাটেনি। শিল্পোদ্যোক্তাদের জন্য এখন মূল প্রশ্ন, এলএনজির বাড়তি সরবরাহ কতটা ধারাবাহিক থাকে এবং গ্যাসের চাপ কবে চাহিদার পর্যায়ে পৌঁছায়। সরবরাহ স্থিতিশীল হলে উৎপাদন স্বাভাবিক হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে লোডশেডিং কমানোর সুযোগও তৈরি হবে।