র‍্যাব বিলুপ্ত, এসআরবির যাত্রা: বদলাল শুধু নাম, নাকি বদলেছে বাহিনী?

ভোরের ডাক ডেস্ক

জাতীয়

নানামুখী আলোচনা-সমালোচনার মধ্য দিয়ে অবসান ঘটল র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন—র‍্যাবের। তার জায়গায় পুলিশের অধীনে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ বা এসআরবি নামে নতুন

2026-09-16T14:50:05+00:00
2026-09-16T16:34:09+00:00
  বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২ আশ্বিন ১৪৩৩
 
বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাতীয়
র‍্যাব বিলুপ্ত, এসআরবির যাত্রা: বদলাল শুধু নাম, নাকি বদলেছে বাহিনী?
ভোরের ডাক ডেস্ক
বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২:৫০ পিএম  আপডেট: ১৬.০৯.২০২৬ ৪:৩৪ পিএম
সংগৃহীত ছবি
নানামুখী আলোচনা-সমালোচনার মধ্য দিয়ে অবসান ঘটল র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন—র‍্যাবের। তার জায়গায় পুলিশের অধীনে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ বা এসআরবি নামে নতুন বিশেষায়িত ইউনিটের যাত্রা শুরু হয়েছে।

মঙ্গলবার প্রজ্ঞাপন জারির পর বুধবার থেকে নতুন নামে কার্যক্রম শুরু করেছে বাহিনীটি। বাহিনী প্রধান আহসান হাবীব পলাশ জানিয়েছেন, গেজেট হওয়ার পর র‍্যাবের নাম পরিবর্তন করে এসআরবি নামেই সব কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

নতুন বাহিনীর লোগোতেও এসেছে পরিবর্তন। তবে পরিবর্তন শুধু নামেই—আগের লোগোর নকশা অপরিবর্তিত রেখে ‘র‍্যাব’-এর জায়গায় লেখা হয়েছে ‘এসআরবি বাংলাদেশ’। বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেও নতুন লোগো ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে।

কীভাবে র‍্যাব থেকে এসআরবি

২০০৪ সালের ২৬ মার্চ বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে র‍্যাব গঠিত হয়। সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন গুরুতর অপরাধ দমনে বাহিনীটির ভূমিকা যেমন আলোচিত হয়েছে, তেমনি বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও নির্যাতনের অভিযোগেও দেশ-বিদেশে সমালোচিত হয়েছে র‍্যাব।

গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর র‍্যাব এবং বাহিনীর সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর বিএনপি গঠিত পুলিশ প্রশাসন সংস্কার বিষয়ক কমিটি র‍্যাব বিলুপ্ত করার সুপারিশ করেছিল। ওই কমিটির বক্তব্য ছিল, র‍্যাবের দায়িত্ব আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) ও থানা পুলিশের মাধ্যমে পালনের ব্যবস্থা করা।

তবে ক্ষমতায় এসে বিএনপি র‍্যাব বিলুপ্ত করে সম্পূর্ণ নতুন কোনো কাঠামোতে না গিয়ে পুলিশ বাহিনীর অধীনে এসআরবি নামে বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের উদ্যোগ নেয়।

গত ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬’ পাস হয়। মঙ্গলবার প্রজ্ঞাপন জারির মধ্য দিয়ে আইনটি কার্যকর হওয়ার পরদিনই নতুন নামে কার্যক্রম শুরু করে বাহিনীটি।

একই জনবল, সম্পদ ও স্থাপনা

এসআরবি আইন নিয়ে বিতর্কের সবচেয়ে বড় জায়গা হচ্ছে র‍্যাবের জনবল ও অবকাঠামো।

আইনে র‍্যাবের জনবল, আদেশ, ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, বিদ্যমান সুবিধা, তহবিল, নগদ ও ব্যাংকে থাকা অর্থ, দায়, চুক্তি, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, রেজিস্টার, রেকর্ডপত্র ও দলিল এসআরবিতে হস্তান্তরের বিধান রাখা হয়েছে।

ফলে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের অভিযোগ, নাম পরিবর্তন হলেও কার্যত র‍্যাবের কাঠামোই নতুন নামে বহাল থাকছে।

সংসদে আলোচনার সময় জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান বিষয়টিকে ‘শুধু সাইনবোর্ড পরিবর্তন’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য, র‍্যাবের জনবল, কার্যালয়, ক্ষমতা, নথিপত্র, সম্পদ ও দায়দায়িত্ব নতুন বাহিনীতে চলে যাচ্ছে।

বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানও বলেন, র‍্যাব বিলুপ্ত করার দাবি ছিল; একই ধরনের আরেকটি বাহিনী গঠনের দাবি ছিল না।

সরকারের বক্তব্য কী

বিরোধীদের অভিযোগের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, র‍্যাব বিলুপ্ত করেই নতুন ব্যাটালিয়ন গঠন করা হচ্ছে এবং র‍্যাবের সঙ্গে এসআরবির ‘কোনো সংস্পর্শ নেই’।

তার যুক্তি, র‍্যাবের বিপুল অস্ত্র, সরঞ্জাম, গোয়েন্দা সরঞ্জাম ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সম্পদ নষ্ট করা বা ফেলে রাখা সম্ভব নয়। এসব সম্পদ নতুন ইউনিটে ব্যবহার করা হলে রাষ্ট্রের অর্থেরও সাশ্রয় হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, পুরোনো বাহিনী বিলুপ্ত হওয়ার পর সম্পূর্ণ নতুন আইনি কাঠামোয় এসআরবি গঠিত হচ্ছে।

এসআরবির ক্ষমতা কতটা

নতুন আইনে এসআরবিকে বিশেষায়িত আইনশৃঙ্খলা ইউনিট হিসেবে বিস্তৃত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

ফৌজদারি অপরাধ তদন্ত, তল্লাশি, গ্রেপ্তার ও জব্দের ক্ষমতা থাকবে ইউনিটটির। মাদক, অস্ত্র, গোলাবারুদ, বিস্ফোরক, সন্ত্রাসী আস্তানা, মানবপাচার, সংঘবদ্ধ অপরাধ, সাইবার অপরাধ এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাবিরোধী অপরাধের মতো ক্ষেত্রে অভিযান পরিচালনার সুযোগ রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া এসআরবির নিজস্ব হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ রাখার বিধান রয়েছে।

ইউনিটের মহাপরিচালক হবেন পুলিশের অন্তত অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা। প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ, শৃঙ্খলা বাহিনী এবং নির্দিষ্ট সংখ্যক কর্মকর্তা ও আর্মড পারসোনেলকে পদায়ন বা প্রেষণে এনে ইউনিট গঠনের বিধান রয়েছে।

সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের প্রেষণ নিয়ে প্রশ্ন

খসড়া আইন থেকেই বিতর্কের একটি বড় বিষয় ছিল প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের এসআরবিতে প্রেষণে পাঠানোর সুযোগ।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এই বিধান বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়েছিল। সংগঠনটির মতে, পুলিশের বাইরে সশস্ত্র বা প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের প্রেষণে অন্তর্ভুক্তির সুযোগ অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থায় সামরিক কৌশল ব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

টিআইবি আরও বলেছিল, র‍্যাবের জনবল ঢালাওভাবে নতুন বাহিনীতে নেওয়ার আগে সদস্যদের অতীত কর্মকাণ্ড যাচাইয়ের জন্য স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ভেটিং প্রক্রিয়া থাকা প্রয়োজন।

অভিযোগ নিষ্পত্তিতে কমিটি

নতুন আইনে এসআরবি সদস্যদের বিরুদ্ধে নাগরিকদের অভিযোগ এবং বাহিনীর সদস্যদের অভ্যন্তরীণ অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।

কমিটিতে এসআরবির একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধি, পুলিশ অধিদপ্তরের একজন এআইজি, এসআরবির পরিচালক (লিগ্যাল মিডিয়া) এবং সরকার মনোনীত মানবাধিকার, আইন বা বিচার প্রশাসনে কমপক্ষে ১০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছিল।

তবে এই ব্যবস্থার স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধী দলের সদস্যরা। তাদের কেউ কেউ সাবেক বিচারপতির নেতৃত্বে স্বাধীন অভিযোগ তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন।

সংসদে বিরোধিতা, সমর্থনও

এসআরবি বিল নিয়ে সংসদে একদিকে যেমন তীব্র আপত্তি এসেছে, অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে এর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে।

বিরোধী দলের সদস্যরা বলেছেন, র‍্যাবের অতীত কর্মকাণ্ডের অভিযোগের যথাযথ তদন্ত এবং দায় নির্ধারণের আগে একই জনবল ও অবকাঠামো ব্যবহার করে নতুন বাহিনী গঠন করা হলে পুরোনো সমস্যার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থাকবে।

অন্যদিকে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য লুৎফুজ্জামান বাবর এসআরবি গঠনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেছেন, রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য একটি বিশেষায়িত বাহিনী প্রয়োজন।

তিনি জানান, র‍্যাব বিলুপ্তির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তার আলোচনা হয়েছিল এবং তিনি তখন র‍্যাব বিলুপ্তির বিরোধিতা করেছিলেন। তার মতে, র‍্যাবের পরিবর্তে এসআরবি নামে বিশেষায়িত সংগঠন আসা প্রয়োজন।

বাবরের বক্তব্য, কোনো বাহিনী কীভাবে আচরণ করবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করে সরকার ও দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর ওপর।

জেএসডি ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের আপত্তি

র‍্যাবের অবকাঠামোতেই এসআরবি গঠনের বিরোধিতা করেছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) ও বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন।

দুই দলের যৌথ আলোচনা সভায় এসআরবি গঠন বন্ধের দাবি জানানো হয়। তাদের অভিযোগ, র‍্যাবকে বিলুপ্ত করে একই অবকাঠামোতে নতুন বাহিনী গঠন করা হলে বাহিনীর পুরোনো সংস্কৃতি ও ক্ষমতার কাঠামো বহাল থাকার আশঙ্কা থাকবে।

রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ুমসহ বক্তারা গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন ও বেআইনি আটকের অভিযোগের স্বাধীন তদন্তের দাবিও জানান।

র‍্যাবের উত্তরাধিকার, এসআরবির ভবিষ্যৎ

র‍্যাবের ২২ বছরের ইতিহাসের পর এসআরবির যাত্রা শুরু হলো। আইনগতভাবে দুটি বাহিনী আলাদা হলেও র‍্যাবের জনবল, সম্পদ, স্থাপনা ও নথিপত্রের বড় অংশ নতুন ইউনিটে স্থানান্তরের বিধান থাকায় প্রশ্ন উঠেছে—এটি কতটা কাঠামোগত পরিবর্তন আর কতটা পুনর্বিন্যাস?

সরকার বলছে, র‍্যাব বিলুপ্ত করে নতুন আইনে নতুন ইউনিট গঠন করা হয়েছে। বিরোধী দল ও কয়েকটি নাগরিক সংগঠনের বক্তব্য, নাম ও আইনি কাঠামো বদলালেও পুরোনো বাহিনীর জনবল-সম্পদ ও অবকাঠামো বহাল থাকায় মৌলিক পরিবর্তন কতটা হয়েছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

নতুন বাহিনীর কার্যক্রমে ক্ষমতার সীমারেখা, মানবাধিকার সুরক্ষা, সদস্যদের জবাবদিহি, অতীত কর্মকাণ্ডের যাচাই এবং স্বাধীন অভিযোগ তদন্তের ব্যবস্থা বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হয়—এসআরবির গ্রহণযোগ্যতা অনেকটাই তার ওপর নির্ভর করবে।


  বিষয়:   প্রজ্ঞাপন জারির পর নতুন নামে কার্যক্রম শুরু | র‍্যাবের জনবল-সম্পদ-স্থাপনা হস্তান্তর | বিরোধীদের দাবি ‘পুরোনো বাহিনীই নতুন নামে’ | সরকারের বক্তব্য  র‍্যাবের সঙ্গে এসআরবির কোনো সংস্পর্শ নেই 


Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: