একসময় ‘বাংলার শস্যভাণ্ডার’ ও ‘বাংলার ভেনিস’ হিসেবে পরিচিত বরিশাল এখন দেশের আট বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দারিদ্র্যপ্রবণ বিভাগ। কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনে সংকট, শিল্পায়নের ঘাটতি, কর্মসংস্থানের অভাব এবং যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতায় অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়েছে দক্ষিণের এই অঞ্চল।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) দারিদ্র্য মানচিত্র ২০২২ অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ে দারিদ্র্যের হার ১৯ দশমিক ২ শতাংশ। সেখানে বরিশাল বিভাগে এই হার ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ, যা দেশের বিভাগগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
একসময় দেশের সবচেয়ে দরিদ্র বিভাগ হিসেবে পরিচিত রংপুর এখন ২৫ শতাংশ দারিদ্র্যের হার নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে মাত্র ১৫ দশমিক ২ শতাংশ দারিদ্র্যের হার নিয়ে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ।
কৃষি ও মৎস্যে ধাক্কা
বরিশালের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর হলেও ধান উৎপাদনে সাম্প্রতিক সময়ে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিভাগটিতে আউশের উৎপাদন আগের বছরের ৪ লাখ ৩০ হাজার টন থেকে কমে ৩ লাখ ৭৪ হাজার টনে নেমেছে। একইভাবে কমেছে আমন উৎপাদনও।
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বাড়ছে। এতে কৃষিজমির উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে এবং কৃষকের আয়েও পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব।
মৎস্য খাতেও একই চিত্র। বিভাগীয় মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বরিশালে ইলিশ উৎপাদন ছিল ৩ লাখ ৭২ হাজার টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৬৬ হাজার টনে—যা প্রায় সাড়ে ২৮ শতাংশ কম।
বিবিএসের জরিপে দেখা গেছে, ধান ও গম উৎপাদনে বরিশালের কৃষকদের বার্ষিক নিট আয় মাত্র ৬ হাজার ৮১ টাকা, যা দেশের মধ্যে সর্বনিম্ন।
শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের সংকট
প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভাবনা থাকলেও বরিশালে উল্লেখযোগ্য শিল্পায়ন গড়ে ওঠেনি। ভোলায় বিপুল গ্যাসের মজুদ থাকার কথা বলা হলেও দীর্ঘ সময়েও তা কাজে লাগিয়ে বড় ধরনের শিল্পভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি।
ছয় জেলার পুরো বিভাগে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কারখানা রয়েছে মূলত বরিশাল জেলাতেই। সেখানে প্রায় ৪০৯টি কারখানায় মাত্র ২০ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে।
কর্মসংস্থানের সংকটের কারণে বরিশালের অনেক মানুষ জীবিকার সন্ধানে রাজধানীমুখী হচ্ছেন। জনশুমারি ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, বরিশালের স্থানীয় অধিবাসীদের ১৮ দশমিক ৬২ শতাংশ বর্তমানে ঢাকায় বসবাস করেন। তাদের বড় একটি অংশ রাজধানীর বিভিন্ন বস্তিতে থাকেন।
যোগাযোগও বড় বাধা
দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক পিছিয়ে পড়ার পেছনে নদীনির্ভর যোগাযোগব্যবস্থাকেও অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। আঞ্চলিক উন্নয়নের জন্য সমন্বিত পরিকল্পনার ঘাটতিও এ অঞ্চলের পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন তারা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ভোলার গ্যাস স্থানীয় শিল্প ও সার কারখানায় ব্যবহার, পায়রা বন্দরকে পূর্ণ সক্ষমতায় চালু করা এবং ভোলা-বরিশাল সংযোগ মহাসড়ক নির্মাণ করা গেলে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
দারিদ্র্যের হারে কোন বিভাগ কোথায়
বিবিএসের দারিদ্র্য মানচিত্র ২০২২ অনুযায়ী, বিভাগভিত্তিক দারিদ্র্যের হার হলো—
বরিশাল: ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ
রংপুর: ২৫ দশমিক ০ শতাংশ
ময়মনসিংহ: ২২ দশমিক ৬ শতাংশ
ঢাকা: ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ
সিলেট: ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ
খুলনা: ১৭ দশমিক ১ শতাংশ
রাজশাহী: ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ
চট্টগ্রাম: ১৫ দশমিক ২ শতাংশ
অর্থাৎ, একসময় যে বরিশালকে দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ কৃষি ও বাণিজ্যিক অঞ্চল হিসেবে দেখা হতো, বর্তমানে দারিদ্র্যের হারে সেই বিভাগই দেশের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।