সড়ক নয়, বরং সেতুর মাধ্যমে বরিশালের সঙ্গে ভোলাকে সরাসরি সংযুক্ত করার দাবিতে জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রমের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে ‘আমরা ভোলাবাসী’ সংগঠন। একই সঙ্গে সড়কপথে ভোলাকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্ত করতে ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের যে হিসাব প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা সঠিক নয় বলেও দাবি করেছে সংগঠনটি। তাদের মতে, সড়কপথে ভোলাকে যুক্ত করতে ইলিশা–মেহেন্দিগঞ্জ এবং মেহেন্দিগঞ্জ–হিজলা—এই দুটি প্রায় ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতুসহ মোট ব্যয় ১৫ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে।
সংগঠনটির দাবি, রহমতপুর–হিজলা–মেহেন্দিগঞ্জ–ভোলা পথে মহাসড়ক নির্মাণে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের যে হিসাব প্রকাশ্যে এসেছে, তাতে দীর্ঘ নদী পারাপারের জন্য প্রয়োজনীয় সেতু ও ভায়াডাক্ট, নদীশাসন, তীর সংরক্ষণ, অ্যাপ্রোচসহ প্রকল্পের সব ব্যয় অন্তর্ভুক্ত আছে কি না, তা পরিষ্কার নয়। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিকল্প মহাসড়ক ও ভোলা–বরিশাল সেতুর প্রকৃত ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুফল একই মানদণ্ডে যাচাই করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
সোমবার জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রমের কাছে দেওয়া স্মারকলিপিতে এসব দাবি জানানো হয়। সংগঠনটির নেতারা জানান, স্পিকার তাঁদের স্মারকলিপি আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করেছেন এবং বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার আশ্বাস দিয়েছেন।
ভোলাকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো পক্ষেরই আপত্তি নেই। বরং দীর্ঘদিন ধরেই ভোলার সঙ্গে স্থায়ী সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার দাবি রয়েছে। প্রশ্নটি এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে—কোন পথে এই সংযোগ তৈরি হলে রাষ্ট্রের বিনিয়োগে সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক ও যোগাযোগগত সুফল পাওয়া যাবে।
গত ২২ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ভোলাকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে বিকল্প মহাসড়কের প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। পরে রহমতপুর–হিজলা–মেহেন্দিগঞ্জ–ভোলা পথে মহাসড়ক নির্মাণের উদ্যোগের কথা জানানো হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এই পথের সুবিধা হিসেবে দূরত্ব, সময় ও পরিবহন ব্যয় কমার কথা বলা হয়েছে। ৩০ আগস্ট প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে মেহেন্দিগঞ্জ–মুলাদী–রহমতপুর মহাসড়ক নির্মাণে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের তথ্যও প্রকাশিত হয়।
‘আমরা ভোলাবাসী’র প্রশ্ন এখানেই। তাদের বক্তব্য, একটি প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় কম দেখালেই সেটিকে কম ব্যয়ের প্রকল্প বলা যায় না। বিশেষ করে নদীবহুল দক্ষিণাঞ্চলে সড়ক নির্মাণের সঙ্গে সেতু, ভায়াডাক্ট, অ্যাপ্রোচ, নদীশাসন, তীর সংরক্ষণ, ভূমি অধিগ্রহণ, ইউটিলিটি স্থানান্তর, কালভার্ট, ড্রেনেজ ও অন্যান্য অবকাঠামোর ব্যয়ও যুক্ত করতে হয়। এসব উপাদান বাদ থাকলে প্রাথমিক ব্যয়ের হিসাব বাস্তব প্রকল্প ব্যয়ের তুলনায় অনেক কম হতে পারে।
মীরগঞ্জ সেতুকে এ ক্ষেত্রে একটি বাস্তব উদাহরণ হিসেবে সামনে এনেছে সংগঠনটি। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, মীরগঞ্জের মূল সেতু ও ভায়াডাক্টের দৈর্ঘ্য ১ দশমিক ৪৮৪ কিলোমিটার। এর মধ্যে মূল সেতু ৫৪৪ মিটার এবং ভায়াডাক্ট ৯৪০ মিটার। প্রায় ৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার অ্যাপ্রোচ সড়কসহ প্রকল্পটির ব্যয় প্রায় ১ হাজার ৪৪২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।
সংগঠনটির মতে, মীরগঞ্জ সেতুর সঙ্গে তুলনা করলেও ইলিশা–মেহেন্দিগঞ্জ অংশে প্রায় ৪ দশমিক ২ কিলোমিটার এবং মেহেন্দিগঞ্জ–হিজলা অংশে প্রায় ৪ দশমিক ৬ কিলোমিটার সেতু ও ভায়াডাক্ট প্রয়োজন হতে পারে। তাদের ধারণা, এই প্রায় ৯ কিলোমিটার সেতু ও সংশ্লিষ্ট নদীশাসনেই প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। এর সঙ্গে নতুন মহাসড়ক, ভূমি অধিগ্রহণ, অ্যাপ্রোচ, কালভার্ট, ছোট-বড় সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামো যুক্ত হলে মোট ব্যয় ১৫ হাজার কোটি টাকা বা তারও বেশি হতে পারে বলেও সংগঠনটি প্রাথমিকভাবে অনুমান করেছে।
তাদের দাবি, ভুল বুঝিয়ে কম ব্যয়ের কথা বলে প্রধানমন্ত্রীকে সেতুর পরিবর্তে সড়কপথের সমীক্ষায় রাজি করানো হয়েছে। এ ছাড়া বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে সেতু নির্মাণ হলে দেশের অর্থও সাশ্রয় হবে। দেশের অর্থনৈতিক সংকটময় সময়ে বিদেশি বিনিয়োগ আসা সরকারের জন্য মাইলফলক ও দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে বলেও মনে করে সংগঠনটি।
ভোলা–বরিশাল সেতুর মাধ্যমে সংযুক্ত হলে শুধু যাতায়াতের সময় কমবে না, যানবাহনের পরিচালন ব্যয়, জ্বালানি ব্যয় এবং পণ্য পরিবহনের সময়ও কমবে। ভোলার কৃষি ও মৎস্যজাত পণ্য দ্রুত বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে নেওয়ার সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে শিক্ষা ও চিকিৎসার জন্য মানুষের চলাচল সহজ হবে এবং শিল্প ও বাণিজ্যে বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
‘আমরা ভোলাবাসী’ মনে করে, ভোলা–বরিশাল সেতুর গুরুত্ব শুধু ভোলা ও বরিশালের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁদের মতে, ভবিষ্যতে এই সেতু চট্টগ্রাম–কুমিল্লা–লক্ষ্মীপুর–ভোলা–বরিশাল–খুলনা–যশোর অঞ্চলের মধ্যে একটি আন্তঃআঞ্চলিক যোগাযোগ করিডোরের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। এতে দেশের পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে পণ্য পরিবহন ও যাত্রী চলাচলের নতুন পথ তৈরি হতে পারে।
স্মারকলিপিতে সরকারি কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে কোনো প্রকল্পের প্রস্তাব উপস্থাপনের ক্ষেত্রে তথ্য পূর্ণাঙ্গ, যাচাইযোগ্য ও প্রকৌশলগতভাবে সমর্থিত হওয়া জরুরি। কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যয় বা প্রকৌশলগত উপাদান বাদ পড়ে থাকলে তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
তবে কোনো কর্মকর্তা ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য গোপন করেছেন বা ব্যয় কম দেখিয়েছেন—এমন অভিযোগকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে না দেখে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। তাদের বক্তব্য, তদন্তে যদি ইচ্ছাকৃত তথ্য গোপন, গুরুতর তথ্যগত অসঙ্গতি বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে প্রচলিত সরকারি বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
ভোলার সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের স্থায়ী সড়ক যোগাযোগ এখন আর কেবল একটি আঞ্চলিক অবকাঠামোর প্রশ্ন নয়। এটি দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি, জাতীয় সড়ক নেটওয়ার্ক এবং ভবিষ্যৎ আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত একটি বড় বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত। সেই সিদ্ধান্তে কোন প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় কম, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—কোন প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ জীবনকালীন ব্যয় কম এবং কোনটি দেশের অর্থনীতি ও যোগাযোগব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে বেশি সুফল দেবে।