বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কেন্দ্রীয় কমিটিসহ দেশের সব পর্যায়ের কমিটির শূন্য হওয়া পদগুলো পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দল। এসব শূন্য পদে সংশ্লিষ্ট কমিটির গঠনতন্ত্রের বিধান অনুযায়ী ‘ইমিডিয়েট নিচে’ অর্থাৎ ঠিক নিচের সারিতে থাকা নেতাদের পদোন্নতি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। গত শনিবার রাতে রাজধানীর গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এই গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
দলীয় সূত্র বলছে, বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী ১১টি সংগঠনের মধ্যে ১০টির কেন্দ্রীয় কমিটিই মেয়াদোত্তীর্ণ। দলীয় গঠনতন্ত্রে প্রতি তিন বছর পর নতুন কমিটি গঠনের বিধান থাকলেও দীর্ঘদিন তা বাস্তবায়ন হয়নি। এতে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নেতৃত্বের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই পদপ্রত্যাশী নেতাকর্মীদের মধ্যেও হতাশা বাড়ছে। বিএনপির এই ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্র থেকে প্রতন্ত অঞ্চলের ওয়ার্ড পর্যন্ত বিভিন্ন ইউনিটের বিদ্যমান কমিটির শীর্ষ নেতারা কেউ মারা গেছেন, কেউ দখল-চাদাবাজি ও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে দল থেকে বহিস্কার হয়েছেন। সেই কারনে এই পদগুলো এখনো শূন্য রয়েছে।
কোনো ইউনিটে সভাপতির পদ শূন্য থাকলে ১ নম্বর সহ সভাপতি পদোন্নতি পেয়ে সভাপতি মনোনীত হবে। কোনো কারনে ১ নম্বর সহ-সভাপতিও মৃত, বহিস্কৃত বা নিষ্ক্রিয় থাকলে ২ নম্বর সহ-সভাপতি সভাপতির চেয়ারে বসবে। গত শনিবারে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এমনই সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে ভোরের ডাককে জানিয়েছেন বিএনপির একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানিয়েছেন, মৃত্যু, দলত্যাগ কিংবা বহিষ্কারজনিত কারণে বিএনপির বিভিন্ন কমিটিতে যেসব শূন্যপদের সৃষ্টি হয়েছে, সেগুলো পূরণের বিষয়ে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। গঠনতন্ত্রের বিধান অনুসরণ করে এসব পদে ঠিক নিচের সারিতে থাকা নেতাদের পদোন্নতি দিয়ে শূন্যস্থানগুলো পূরণ করা হবে।
আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগেই এসব শূন্যপদ পূরণ করার সিদ্ধান্ত রয়েছে। পাশাপাশি সারা দেশের তৃণমূল পর্যায়ের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো ঢেলে সাজাতে থানা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড কমিটি পুনর্গঠন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। তবে স্থায়ী কমিটির এই বৈঠকে দলের জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিএনপির সাবেক মহাসচিব ও বর্তমানে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শূন্য হওয়া ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন নিয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আগামী ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই উপনির্বাচনে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করতে বিএনপি এক নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করেছে।
বৈঠকে দেশের সার্বিক সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি ও ডেঙ্গু সংক্রমণ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়। ডেঙ্গু প্রতিরোধে এবং সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে দেশব্যাপী বিশেষ কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। এর অংশ হিসেবে দেশের খ্যাতনামা চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে সচেতনতামূলক প্রচারপত্র তৈরি করে ঢাকাসহ সারা দেশে বিতরণ করা হবে। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রেডিও ও টেলিভিশনে ডেঙ্গু সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান বারবার প্রচারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজ ও হাট-বাজারে আবর্জনা ব্যবস্থাপনার জন্য নির্দিষ্ট ডাস্টবিন স্থাপনে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি জেলা ও উপজেলার সব হাসপাতালে মশারি সরবরাহের ব্যবস্থা তদারকি করা হবে।
শনিবার রাত ৮টার দিকে শুরু হয়ে সোয়া ৯টা পর্যন্ত চলা এই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকার গঠনের পর এটি ছিল বিএনপির স্থায়ী কমিটির তৃতীয় বৈঠক। নতুনভাবে অন্তর্ভুক্ত হওয়া স্থায়ী কমিটির চার সদস্য—ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, আমান উল্লাহ আমান, অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার এবং ইসমাইল জবিউল্লাহকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানানো হয়। দীর্ঘদিন বিদেশে চিকিৎসা শেষে বৈঠকে যোগ দেওয়ায় স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের সুস্থতাও কামনা করেন নেতারা। বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, বেগম সেলিমা রহমান এবং অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন উপস্থিত ছিলেন।