পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাতের মধ্যেই একটি অভিন্ন অবস্থানে পৌঁছেছে ব্রিকসের সদস্য দেশগুলো। কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের নাম উল্লেখ না করে ‘সব ধরনের আগ্রাসনের’ নিন্দা জানানো এবং সংকট সমাধানে সংলাপ ও কূটনীতির ওপর জোর দেওয়ার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন জোটের নেতারা।
ভারতের নয়া দিল্লিতে আয়োজিত ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে দীর্ঘ আলোচনার পর গৃহীত ‘দিল্লি ঘোষণা’কে দেশটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। খবর এনডিটিভির।
ভারতের সভাপতিত্বে ১২ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠেয় এবারের সম্মেলনে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত ছাড়াও বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার সংস্কার, অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং গ্লোবাল সাউথের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
মতপার্থক্য পেরিয়ে যৌথ ঘোষণা : পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত নিয়ে ব্রিকস সদস্যদের অবস্থানে পার্থক্য থাকায় যৌথ ঘোষণার ভাষা নির্ধারণ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে ইরান-সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি নিয়ে সদস্যদের ভিন্ন অবস্থানের কারণে আলোচনাও দীর্ঘায়িত হয়।
এর আগে মে মাসে নয়া দিল্লিতে ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে একই ইস্যুতে মতৈক্য না হওয়ায় কোনো যৌথ ঘোষণা দেওয়া সম্ভব হয়নি।
তবে এবার দীর্ঘ আলোচনার পর নেতারা একটি অভিন্ন অবস্থানে পৌঁছান। চূড়ান্ত ঘোষণায় কোনো দেশকে আলাদাভাবে দায়ী না করে সব ধরনের আগ্রাসনের নিন্দা জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে সংঘাত নিরসনে সামরিক পন্থার পরিবর্তে আলোচনা ও কূটনৈতিক উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
ভারতের জন্য এটিকে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, ব্রিকসের বর্তমান সদস্যসংখ্যা ও ভূরাজনৈতিক বৈচিত্র্যের কারণে স্পর্শকাতর আন্তর্জাতিক ইস্যুতে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ভাষা তৈরি করা সহজ নয়।
একই ফ্রেমে মোদী, পুতিন ও শি : সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের উপস্থিতি বিশেষ মনোযোগ কেড়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ছবিতে মোদীকে পুতিন ও শি জিনপিংয়ের হাত ধরে থাকতে দেখা যায়। একই ফ্রেমে ছিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোও।
এর আগে শুক্রবার দিল্লিতে পৌঁছান পুতিন। শনিবার ভারতে আসেন শি জিনপিং। সম্মেলনের আগে পুতিনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন মোদী। পরে দুই নেতা একই গাড়িতে করে সম্মেলনস্থলে যাওয়ার দৃশ্যও আলোচনায় আসে।
গ্লোবাল সাউথে জোর মোদীর : ব্রিকস সম্মেলনের শুরুতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও কার্যকর ভূমিকার পক্ষে অবস্থান নেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।
গ্লোবাল সাউথের নীতিনির্ধারকদের আন্তর্জাতিক আলোচনায় আরও দক্ষভাবে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগে ভারতের সহযোগিতার কথাও জানান তিনি।
এবারের সভাপতিত্বে ভারত বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কার, গ্লোবাল সাউথের স্বার্থ এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বৃহত্তর সুযোগ তৈরিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
একই সঙ্গে ব্রিকসকে শুধু রাজনৈতিক সহযোগিতার প্ল্যাটফর্ম না রেখে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত অংশীদারত্বের ক্ষেত্রেও আরও কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছেন মোদী। সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যিক বাধা কমানো এবং স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
পুতিনের সঙ্গে বাণিজ্য-জ্বালানি নিয়ে আলোচনা : সম্মেলনের আগে পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন মোদী। বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
রুশ দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দুই দেশের বাণিজ্য ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
শি-মোদী বৈঠকে নজর : সাত বছর পর ভারত সফরে এসেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে তার সঙ্গে মোদীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
সাম্প্রতিক ভারত-চীন সম্পর্ক, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে দুই নেতার আলোচনার দিকে বিশেষ নজর রয়েছে। একই সম্মেলনে মোদী, পুতিন ও শি জিনপিংয়ের উপস্থিতি ব্রিকসের বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক গুরুত্বও তুলে ধরছে।
ইরানের সঙ্গেও পশ্চিম এশিয়া নিয়ে আলোচনা : ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে পৃথক বৈঠকেও পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি গুরুত্ব পেয়েছে। ভারত-ইরান সম্পর্কের পাশাপাশি সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
দিল্লি দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিম এশিয়ার সংকটের সমাধানে সংলাপ ও কূটনীতির পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে। পাশাপাশি নিরাপদে বাণিজ্যিক ও জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার বিষয়টিও ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ঐকমত্যই দিল্লির বড় সাফল্য : ব্রিকসের সদস্যদের রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক অবস্থান এক নয়। ফলে যুদ্ধ, আগ্রাসন বা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে অভিন্ন ভাষা খুঁজে পাওয়া কঠিন।
এই বাস্তবতায় নির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্রের নাম না নিয়ে ‘সব ধরনের আগ্রাসনের’ নিন্দা এবং সংলাপ-কূটনীতিকে সংকট সমাধানের পথ হিসেবে সামনে আনা সদস্য দেশগুলোর মধ্যে একটি কার্যকর সমঝোতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নয়া দিল্লির জন্য সবচেয়ে বড় অর্জনও সম্ভবত এখানেই—মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ব্রিকসকে একটি অভিন্ন ঘোষণায় আনতে পেরেছে ভারত।