লাখো পর্যটকের জাফলং, নেই পার্কিং-পানি-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা—মহাপরিকল্পনা ফাইলেই

গোয়াইনঘাট (সিলেট) সংবাদদাতা

সারাদেশ

প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে প্রতি বছর লাখো পর্যটক ছুটে আসেন সিলেটের জাফলংয়ে। পাহাড়, পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ জল, পাথুরে ভূপ্রকৃতি, চা-বাগান ও

2026-09-09T16:10:10+00:00
2026-09-09T16:10:10+00:00
  রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬,
৯ কার্তিক ১৪৩৩
 
রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
লাখো পর্যটকের জাফলং, নেই পার্কিং-পানি-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা—মহাপরিকল্পনা ফাইলেই
গোয়াইনঘাট (সিলেট) সংবাদদাতা
বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:১০ পিএম 
জাফলংয়ের জিরো পয়েন্টে পর্যটকদের ভিড়। ছবি ভোরের ডাক
প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে প্রতি বছর লাখো পর্যটক ছুটে আসেন সিলেটের জাফলংয়ে। পাহাড়, পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ জল, পাথুরে ভূপ্রকৃতি, চা-বাগান ও সীমান্তঘেঁষা ঝরনার টানে দেশ-বিদেশের ভ্রমণপিপাসুদের অন্যতম পছন্দের গন্তব্য হয়ে উঠেছে ‘প্রকৃতিকন্যা’খ্যাত জাফলং।

তবে পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে গড়ে ওঠেনি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সেবাব্যবস্থা। অপরিকল্পিত দোকানপাট, পার্কিং সংকট, পর্যাপ্ত ডাস্টবিনের অভাব, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, বিশুদ্ধ পানির সংকট ও সীমিত নিরাপত্তা জনবল—সব মিলিয়ে জনপ্রিয় এই পর্যটনকেন্দ্রে ব্যবস্থাপনার ঘাটতি স্পষ্ট।

সরকারি পর্যায়ে জাফলংকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা ও মহাপরিকল্পনার কথা বলা হলেও ২০২৬ সালেও এর বড় অংশের বাস্তবায়ন দৃশ্যমান হয়নি। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের মহাপরিকল্পনায় পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো, আধুনিক টয়লেট, বিশুদ্ধ পানি, বসার স্থান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, হাঁটার পথ ও নদীকেন্দ্রিক পর্যটনের উন্নয়নের কথা থাকলেও এসব উদ্যোগ এখনো মূলত পরিকল্পনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

প্রবেশপথেই অব্যবস্থাপনা

আজ (৯ সেপ্টেম্বর) জাফলংয়ের বিভিন্ন পর্যটন স্পট ঘুরে দেখা যায়, পুরোনো প্রবেশপথ বল্লাঘাট পিকনিক সেন্টারে পর্যটকের উপস্থিতি তুলনামূলক কম। জেলা পরিষদের ডাকবাংলোসহ পুরোনো কিছু স্থাপনা থাকলেও নতুন করে বড় কোনো আকর্ষণীয় অবকাঠামো চোখে পড়েনি।

অন্যদিকে বিজিবি ক্যাম্পসংলগ্ন দ্বিতীয় প্রবেশপথে ছিল পর্যটকের বেশি চাপ। সেখানে সরকারি পার্কিংয়ের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় সড়কের পাশে গাড়ি রাখতে দেখা যায়। ছুটির দিনে এতে যানজটের সৃষ্টি হয় বলে জানান স্থানীয়রা।

জিরো পয়েন্টের প্রবেশমুখ ও লালমাটি এলাকায় বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বর্জ্যও চোখে পড়ে। কোথাও কোথাও ময়লার স্তূপ থেকে দুর্গন্ধ ছড়াতে দেখা যায়।

পর্যটকদের অভিযোগ, অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা দোকানপাট ও চেঞ্জিং রুমের কারণে জিরো পয়েন্টের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগে বিঘ্ন ঘটে।

পর্যটকের ভিড়, নেই ধারণক্ষমতার হিসাব

জাফলংয়ের ঝরনা এলাকায় পর্যটকের উপস্থিতি ছিল সবচেয়ে বেশি। কেউ পানিতে নেমে আনন্দ করছেন, আবার কেউ ব্যস্ত ছবি তুলতে। তবে অনেক পর্যটককে সতর্কতামূলক নির্দেশনা উপেক্ষা করে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে উঠতেও দেখা যায়।

ছুটির দিন ও বিশেষ উৎসবে পর্যটকের চাপ কয়েক গুণ বেড়ে গেলেও জাফলংয়ের পরিবেশ, নদী, রাস্তা ও অন্যান্য অবকাঠামো কতজন পর্যটকের চাপ সহ্য করতে পারবে, সেই বৈজ্ঞানিক ধারণক্ষমতা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।

টয়লেট আছে, নেই পর্যাপ্ত সেবা

উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নির্মিত কয়েকটি টয়লেট থাকলেও সেগুলোর ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বেসরকারি টয়লেটগুলোর পরিচ্ছন্নতা ও সেবার মান নিয়েও পর্যটকদের অভিযোগ রয়েছে।

নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য পর্যাপ্ত বসার ও বিশ্রামের জায়গা না থাকায় ভোগান্তিতে পড়তে হয় বলে জানান দর্শনার্থীরা। বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থাও পর্যটকের চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল।

অযত্নে পাথর জাদুঘর

জাফলংয়ের পর্যটন ব্যবস্থাপনায় পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ঘাটতির অন্যতম উদাহরণ হিসেবে স্থানীয়রা উল্লেখ করছেন পাথর জাদুঘরকে।

বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এ স্থাপনাটি জাফলংয়ের ভূতাত্ত্বিক বৈচিত্র্য ও ঐতিহ্য পর্যটকদের সামনে তুলে ধরার কথা থাকলেও বর্তমানে এর রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, উদ্বোধনের পর কিছুদিন কার্যক্রম থাকলেও বর্তমানে এটি অনেকটাই অযত্নে পড়ে আছে। চারপাশে ঝোপঝাড় ও ভাঙা কাচসহ নানা অব্যবস্থাপনার চিত্র দেখা যায়।

পরিবেশ সুরক্ষায়ও চ্যালেঞ্জ

জাফলং পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকা। পর্যটকের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পর্যাপ্ত ডাস্টবিন না থাকায় নদীর তীর ও পর্যটন এলাকার বিভিন্ন স্থানে বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা যায়।

সিলেট পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেন, জাফলং পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল ও সংরক্ষিত এলাকা। পর্যটন এলাকায় ময়লা-আবর্জনার স্তূপ থাকা দুঃখজনক। বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পর্যটন বোর্ডের সঙ্গেও সমন্বয় করে কাজ চলছে।

২০১৫ সালে জাফলংসহ প্রায় ১৪ দশমিক ৯৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়। এরপরও পর্যটন উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষার মধ্যে কাঙ্ক্ষিত সমন্বয় এখনো গড়ে ওঠেনি।

মহাপরিকল্পনা আছে, বাস্তবায়ন কবে?

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের মহাপরিকল্পনায় জাফলংয়ের পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নে আধুনিক টয়লেট, বিশুদ্ধ পানি, বসার স্থান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সাইনবোর্ড, হাঁটার পথসহ বিভিন্ন উদ্যোগের কথা রয়েছে। পাশাপাশি নদী, ঝরনা, পাহাড়, সীমান্ত ও স্থানীয় সংস্কৃতিকে ঘিরে বৈচিত্র্যময় পর্যটন গড়ে তোলার সম্ভাবনাও চিহ্নিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) আবু সেলিম মাহমুদ-উল হাসান জানান, বোর্ডের খসড়া মহাপরিকল্পনা পর্যটন মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হয়েছে। যাচাই-বাছাইয়ের পর আন্তঃমন্ত্রণালয় পত্র বা দাপ্তরিক স্মারক পাওয়া গেছে। চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার পর অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অর্থাৎ জাফলংয়ের পর্যটন উন্নয়নে পরিকল্পনা থাকলেও অর্থ বরাদ্দ ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় এখনো মাঠপর্যায়ে এর বড় ধরনের বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না।

সীমিত জনবলে নিরাপত্তা

জাফলং পর্যটন জোনের ইনচার্জ ওসি তপন তালুকদার বলেন, পর্যটকদের বিভিন্ন বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হলেও অনেকে তা মানেন না। সাপ্তাহিক ছুটি ও বিশেষ দিনে পর্যটকের সংখ্যা বেড়ে গেলে সীমিত জনবল দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

মাঝেমধ্যে বিদেশি পর্যটকরাও জাফলংয়ে আসেন বলে জানান তিনি। তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী ভাষাগত সহযোগিতাও দেওয়া হয়।

পাথর-বালি বন্ধ, পর্যটনেই নতুন আশার আলো

একসময় জাফলংয়ের অর্থনীতির বড় অংশ পাথর ও বালি উত্তোলননির্ভর ছিল। পরিবেশ সুরক্ষায় এসব কার্যক্রম বন্ধ থাকায় স্থানীয় অনেক শ্রমিক ও ব্যবসায়ী কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। ফলে পর্যটনকে বিকল্প কর্মসংস্থানের বড় ক্ষেত্র হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা।

জাফলং টুরিস্ট ক্লাবের সভাপতি লোকমান মিয়া বলেন, পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও পর্যটনকেন্দ্রিক অবকাঠামো সেভাবে গড়ে ওঠেনি। বিভিন্ন সময়ে সরকারি পর্যায় থেকে উন্নয়নের আশ্বাস এলেও মাঠে তার বড় কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি।

পূর্ব জাফলং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বলেন, পাথর-বালি উত্তোলন বন্ধ থাকায় এলাকার অনেক মানুষ কর্মহীন। তাদের কর্মসংস্থানের জন্য পর্যটনকে পরিকল্পিতভাবে বিকশিত করা প্রয়োজন। স্থানীয়দের একটি অংশ ইতোমধ্যে পর্যটন ব্যবসার দিকে আগ্রহী হচ্ছেন বলেও জানান তিনি।

আন্তর্জাতিক পর্যটনের সম্ভাবনা, সেবায় ঘাটতি

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি সীমান্তবর্তী অবস্থানের কারণে জাফলংয়ে আন্তর্জাতিক পর্যটনেরও সম্ভাবনা রয়েছে। বিদেশি পর্যটকদের আগমন ঘটলেও তাদের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যসেবা, বহুভাষিক নির্দেশনা, মানসম্মত স্যানিটেশন, নিরাপদ চলাচল ও ডিজিটাল পর্যটনসেবা এখনো পর্যাপ্ত নয়।

টাঙ্গাইলের মির্জাপুর থেকে জাফলংয়ে আসা পর্যটক সাইফুল ইসলাম বলেন, জাফলংয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করেছে। তবে চলাচলের রাস্তা, বসার জায়গা ও বিশ্রামাগারের ঘাটতি তাকে হতাশ করেছে। তারপরও তিনি আবার এখানে আসতে চান।

উন্নয়নের উদ্যোগের কথা প্রশাসনের

গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রতন কুমার অধিকারী জানান, পর্যটন বোর্ডের খসড়া পরিকল্পনা পর্যালোচনা করা হবে। পর্যটন এলাকায় ময়লা-আবর্জনা ও অপরিকল্পিত দোকানপাটের বিষয়েও প্রশাসন কাজ করছে।

জিরো পয়েন্টকে আরও দৃষ্টিনন্দন করতে ছবি প্রদর্শনীর স্থানসহ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, সবকিছু ঠিক থাকলে দ্রুত এসব বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে পর্যটকের আকর্ষণ যখন দিন দিন বাড়ছে, তখন জাফলংয়ের সামনে বড় প্রশ্ন—পর্যটকের ঢল সামলাতে পরিকল্পিত অবকাঠামো কবে বাস্তবে রূপ নেবে? স্থানীয়দের প্রত্যাশা, মহাপরিকল্পনা যেন আর ফাইলবন্দি না থাকে; প্রকৃতি রক্ষা করেই দ্রুত বাস্তবায়ন হোক জাফলংয়ের পর্যটন উন্নয়ন।




Loading...
Loading...

সারাদেশ- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: