পটুয়াখালীর দশমিনায় তেঁতুলিয়া নদীর পানি বৃদ্ধি ও তীব্র স্রোতে ভয়াবহ নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। উপজেলার হাজিরহাট এলাকায় নদীর ভাঙনে একটি পারিবারিক কবরস্থানের অন্তত ২০টি কবর বিলীন হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। ভাঙনের কবলে পড়ে পাকা সড়কের একাংশও নদীগর্ভে চলে গেছে। এ ছাড়া নদীতীর রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ফেলা শতাধিক জিওব্যাগও স্রোতের তোড়ে সরে গেছে।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যার পর হাজিরহাট জামে মসজিদের উত্তর-পশ্চিম পাশে হঠাৎ ভাঙনের তীব্রতা বেড়ে যায়। তেঁতুলিয়া নদীর প্রবল স্রোতে মুহূর্তের মধ্যে নদীতীরের মাটি ধসে পড়তে থাকে। এতে সড়কের একটি অংশ নদীতে বিলীন হওয়ার পাশাপাশি পাশের কবরস্থানও ভাঙনের কবলে পড়ে।
স্থানীয়দের দাবি, ভাঙনের তীব্রতায় কবরস্থানের অন্তত ২০টি কবর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। আপনজনের শেষ ঠিকানাটুকু চোখের সামনে নদীতে হারিয়ে যেতে দেখে স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দীর্ঘদিনের স্মৃতিবিজড়িত কবরস্থানটি নদীগর্ভে চলে যাওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী।
ভাঙন অব্যাহত থাকায় এখন চরম ঝুঁকিতে রয়েছে হাজিরহাট জামে মসজিদ, স্থানীয় বাজার, পাকা সড়ক, কৃষিজমি ও নদীতীরবর্তী বসতবাড়ি। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পরবর্তী জোয়ারে আরও বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে চলে যেতে পারে।
এদিকে নদীতীরবর্তী পরিবারগুলোর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকে ঘরবাড়ির মালামাল নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। রাতের জোয়ারে নদীর স্রোত আরও বাড়লে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বাসিন্দারা।
ভাঙনের কারণে হাজিরহাট এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থাও হুমকির মুখে পড়েছে। সড়কের একটি অংশ বিলীন হওয়ায় যানবাহন ও সাধারণ মানুষের চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। সড়কের অবশিষ্ট অংশও নদীগর্ভে চলে গেলে আশপাশের এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শুধু বসতবাড়ি ও যোগাযোগ ব্যবস্থাই নয়, ঝুঁকিতে রয়েছে স্থানীয় কৃষকদের আবাদি জমি ও বীজতলাও। ভাঙন আরও বিস্তৃত হলে কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে বহু পরিবার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
ভয়াবহ নদীভাঙনের খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন দশমিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদ হাসান মৃধা ও দশমিনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আতিকুল ইসলাম। এ সময় স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
পরিস্থিতি পরিদর্শন শেষে ইউএনও মো. মাহমুদ হাসান মৃধা বলেন, খবর পাওয়ার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে ভাঙনের ভয়াবহতা দেখা হয়েছে। নদীর তীব্র স্রোতে সড়কটির অবশিষ্ট অংশও বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিষয়টি পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। দ্রুত জরুরি প্রতিরক্ষামূলক কাজ শুরুর জন্য তাদের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজন হলে তাদের উদ্ধার করে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ ও সাইক্লোন শেল্টারে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হবে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য খাবার ও পরবর্তী পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবছর তেঁতুলিয়া নদীর পানি বৃদ্ধি ও তীব্র স্রোতের সময় হাজিরহাট এলাকায় ভাঙন দেখা দিলেও স্থায়ীভাবে নদীতীর রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সাময়িকভাবে জিওব্যাগ ফেলা হলেও প্রবল স্রোতে সেগুলো দ্রুত সরে যায়। ফলে প্রতিবছরই নতুন নতুন এলাকা ভাঙনের কবলে পড়ছে।
এলাকাবাসী হাজিরহাট বাজার, জামে মসজিদ, কবরস্থান, সড়ক, কৃষিজমি ও বসতবাড়ি রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলার পাশাপাশি স্থায়ী নদীশাসন প্রকল্প গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
তাদের ভাষ্য, “নদী শুধু ঘরবাড়ি ও জমি কেড়ে নিচ্ছে না, আমাদের স্বজনদের শেষ ঠিকানাটুকুও কেড়ে নিচ্ছে। আজ কবরস্থান, কাল মসজিদ ও বাজার—এভাবে পুরো এলাকা নদীতে বিলীন হওয়ার আগেই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।”
স্থানীয়দের আশঙ্কা, তেঁতুলিয়া নদীর তীব্র স্রোত অব্যাহত থাকলে ভাঙনের পরিধি আরও বাড়তে পারে। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে হাজিরহাটের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও বসতবাড়িগুলোও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে।