খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৬০১ কোটি ৭৯ লাখ ৭ হাজার টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। কেসিসির প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টায় নগর ভবনের শহীদ আলতাফ মিলনায়তনে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এ বাজেট ঘোষণা করেন।
একই সঙ্গে তিনি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৩৩৮ কোটি ৯৭ লাখ ২১ হাজার টাকার সংশোধিত বাজেটও পেশ করেন।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ২১১ কোটি ৯০ লাখ ৫ হাজার টাকা এবং ব্যয় ধরা হয়েছে ২৪১ কোটি ৪৪ লাখ ১৭ হাজার টাকা। এছাড়া সরকারি বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১৯৭ কোটি ৬২ লাখ টাকা। ৮০০ কোটি টাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্প শেষ হওয়ায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বরাদ্দ কমেছে বলে জানানো হয়।
কেসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাজিব আহমেদের সভাপতিত্বে বাজেট ঘোষণা অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন বাজেট কাম অ্যাকাউন্টস অফিসার মো. মনিরুজ্জামান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে কেসিসির প্রশাসক মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। একই সঙ্গে কেসিসির প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, মার্চ মাসে কেসিসির প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে খুলনা মহানগরীকে একটি পরিচ্ছন্ন ও সবুজ নগরী হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে নিয়ে এ লক্ষ্যে কাজ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনের বাজেট ঘোষণার মধ্য দিয়ে একটি নগরীর উন্নয়ন ভাবনা প্রতিফলিত হয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটেও সেই উন্নয়ন ভাবনার প্রতিফলন ঘটেছে। খুলনাকে শান্তি ও স্বস্তির নগরী হিসেবে গড়ে তোলাই আমাদের মূল লক্ষ্য। নিজস্ব আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকার ও বিভিন্ন দাতা সংস্থার সহযোগিতা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে সহায়তা করবে।
অনুষ্ঠানে প্রশাসক মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম ও জুলাই আন্দোলনে শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান এবং তাঁদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন।
উন্নয়নমুখী বাজেট
বাজেটের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে কেসিসির প্রশাসক বলেন, এটি একটি উন্নয়নমুখী বাজেট। নতুন কোনো কর আরোপ না করে বকেয়া পৌরকর আদায়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নবনির্মিত স্থাপনার ওপর প্রচলিত নিয়মে পৌরকর ধার্য, মার্কেট ও দোকান নির্মাণ এবং নতুন স্থাপনা নির্মাণ ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে নিজস্ব আয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা নিরসন, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে মশক নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, নগরবাসীর স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণের ওপর বাজেটে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কেসিসির দাপ্তরিক কার্যক্রম আধুনিকায়নের পাশাপাশি সড়ক, ড্রেন ও ধর্মীয় উপাসনালয়ের উন্নয়নের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। বাজেটের সফল বাস্তবায়নে সব শ্রেণি-পেশার নাগরিকের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেন প্রশাসক।
উন্নয়ন খাতে ৭৩ কোটি ৩৫ লাখ ৫৬ হাজার টাকা
বাজেটের বিস্তারিত তুলে ধরে কেসিসির প্রশাসক বলেন, মাস্টার রোল ও আউটসোর্সিং কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের বেতন-ভাতা ও নিজস্ব সংস্থাপন ব্যয় মিটিয়ে নিজস্ব তহবিল থেকে উন্নয়ন খাতে ৭৩ কোটি ৩৫ লাখ ৫৬ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
এর মধ্যে পূর্ত, বিএমডিএফ, অবকাঠামো নির্মাণ, সড়কবাতি, শিক্ষা, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি, সমাজকল্যাণ, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, ভেটেরিনারি ও কনজারভেন্সি উন্নয়ন খাতে ৫৫ কোটি ২৬ লাখ ৫৬ হাজার টাকা, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ১৮ কোটি ৯ লাখ টাকা এবং মূলধন খাতে ৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
এছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি), থোক ও বিশেষ বরাদ্দে চলতি অর্থবছরে উন্নয়ন বাজেট রাখা হয়েছে ১৫০ কোটি টাকা। থোক বরাদ্দ থেকে পূর্ত খাতে ৯২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা, জরুরি পানি চাহিদা খাতে ২ কোটি টাকা, ভেটেরিনারি খাতে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা, জনস্বাস্থ্য খাতে ২০ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং কনজারভেন্সি খাতে ৩৩ কোটি ১৩ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে জাতীয় এডিপিতে তিনটি প্রকল্পে ৪৭ কোটি ৬২ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরে পাওয়া যাবে।
চলমান প্রকল্পে বরাদ্দ
চলমান প্রকল্পগুলোর বিবরণ তুলে ধরে কেসিসির প্রশাসক বলেন, খুলনা মহানগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৮২৩ কোটি ৭৯ লাখ ৬ হাজার টাকা। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরে ১২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
খুলনা সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৩৯৩ কোটি ৪০ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৫ কোটি টাকা।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় খুলনা শহরের উন্নয়ন প্রকল্পে চলতি অর্থবছরে ১০ কোটি ১২ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া ২ হাজার ২৫৫ কোটি ১ লাখ ২২ হাজার টাকা ব্যয়ে খুলনা সিটি করপোরেশনের ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পটি একনেক সভায় অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
এদিকে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জার্মান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, ইউএনডিপি, ইউনিসেফ, বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন ও জার্মান উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জিআইজেড উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। বর্তমানে বিভিন্ন দাতা সংস্থার অর্থায়নে নয়টি প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে।
চলতি অর্থবছরে এসব প্রকল্পে ৭৯ কোটি ৪৬ লাখ ৫৫ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা শিগগিরই পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্পগুলো হলো—নগর অঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প-২, হেলদি সিটি খুলনা আরবান লিড প্রোগ্রাম, ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যাডাপটেড আরবান ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প, সাসটেইনেবল আরবান ওয়াটার সাইকেল প্রকল্প, কোভিড-১৯ রেসপন্স অ্যান্ড রিকভারি প্রকল্প, ইউনিসেফ সাপোর্টেড ক্লাইমেট স্মার্ট ওয়াশ, লিভেবল অ্যান্ড ইনক্লুসিভ সিটিস ফর অল, রিজিওনাল আরবান টিউটোরিয়াল প্রকল্প এবং এমএসিপি প্রকল্প সাপোর্ট ইউনিসেফ।
বাজেট ঘোষণা অনুষ্ঠানে খুলনা ওয়াসার চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, জামায়াতে ইসলামী খুলনা মহানগর শাখার আমির অধ্যাপক মাহফুজুর রহমানসহ সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ও নাগরিক নেতৃবৃন্দ, গণমাধ্যমকর্মী এবং কেসিসির কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।