গাজীপুরের কালীগঞ্জে পরীক্ষা দিতে বিদ্যালয়ে যাওয়ার পর ১৩ বছর ১১ মাস বয়সী এক কিশোরীকে অপহরণের অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে থেকে তাকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে নেওয়া হয়েছিল বলে পরিবারের অভিযোগ। ঘটনার সাত দিন পর পূর্বাচল এলাকা থেকে তাকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় মামলার প্রধান অভিযুক্ত জাহিদ হাসান রাজকে (২৫) গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে পূর্বাচল এলাকায় অভিযান চালিয়ে কিশোরীকে উদ্ধার ও জাহিদ হাসান রাজকে গ্রেপ্তার করা হয়। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সকালে বিষয়টি নিশ্চিত করেন কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাকির হোসেন।
গ্রেপ্তার জাহিদ হাসান রাজ কালীগঞ্জ উপজেলার নাগরী ইউনিয়নের দক্ষিণ পানজোড়া গ্রামের জামান রাজের ছেলে।
পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, গত ৩১ আগস্ট সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে বিদ্যালয়ের পোশাক পরে পরীক্ষা দিতে বাড়ি থেকে বের হয় কিশোরী। পরীক্ষা শেষে তার বাড়ি ফেরার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের পরও সে বাড়িতে না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন।
একপর্যায়ে পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন, বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনের পাকা সড়ক থেকে কয়েকজন তাকে জোরপূর্বক একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে নিয়ে গেছে।
পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে স্থানীয় যুবক জাহিদ হাসান রাজের নাম সামনে আসে। কিশোরীর মায়ের অভিযোগ, জাহিদ তাদের পরিচিত এবং নিয়মিত তাদের বাড়িতে গিয়ে কিশোরীকে প্রাইভেট পড়াতেন।
এজাহারে কিশোরীর মা অভিযোগ করেন, মেয়ের নিখোঁজের পর পরিবারের সদস্যরা জাহিদের বাড়িতে গিয়ে তার সন্ধান চান। সেখানে কিশোরীকে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি তারা জানেন বলে জানানো হলেও তার অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। এমনকি তাকে ফেরত দেওয়া হবে না বলেও জানানো হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ সময় প্রতিবাদ করলে অভিযুক্তরা মারধরের জন্য উদ্যত হন বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিষয়টি নিয়ে কোনো দরবার বা সালিশ হলে কিশোরীর জানমালের ক্ষতি এবং পরিবারের সদস্যদের খুন-জখমের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তার মা।
ঘটনার রাতেই কিশোরীর মা কালীগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে জাহিদ হাসান রাজসহ চারজনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাত আরও ২-৩ জনকে আসামি করা হয়।
পরদিন ১ সেপ্টেম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৭/৩০ ধারায় মামলা রুজু করে পুলিশ।
মামলা হওয়ার পর কিশোরীকে উদ্ধারে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান শুরু করে কালীগঞ্জ থানা পুলিশ। একই সঙ্গে মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টাও চালানো হয়। তদন্তের একপর্যায়ে পুলিশ কিশোরীর অবস্থান পূর্বাচল এলাকায় শনাক্ত করে।
পরে রোববার দিবাগত রাতে পূর্বাচল এলাকায় অভিযান চালিয়ে কিশোরীকে উদ্ধার করা হয়। এ সময় মামলার প্রধান অভিযুক্ত জাহিদ হাসান রাজকেও গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
কালীগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা অপূর্ব কুমার বাইন বলেন, “মামলা হওয়ার পর থেকেই ভুক্তভোগীকে উদ্ধারে দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হয়েছে। একপর্যায়ে পূর্বাচল এলাকা থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। একই অভিযানে মামলার প্রধান অভিযুক্তকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”
তিনি জানান, উদ্ধার করা কিশোরীকে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে কিশোরী উদ্ধারের পর মামলাটি আপস-মীমাংসার জন্য বাদীকে চাপ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় একটি প্রভাবশালী পক্ষ বিভিন্নভাবে মামলাটি মীমাংসার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছেন কিশোরীর পরিবারের সদস্যরা।
এ বিষয়ে কালীগঞ্জ থানার ওসি মো. জাকির হোসেন বলেন, “নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা রুজু হওয়ার পর থানায় কিংবা অন্য কোথাও বসে আপস-মীমাংসার সুযোগ নেই। বিষয়টির সিদ্ধান্ত আদালতেই হবে।”
তিনি আরও বলেন, ভুক্তভোগীর মায়ের অভিযোগের ভিত্তিতেই মামলা করা হয়েছে। কিশোরীকে উদ্ধার এবং মামলার প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জাহিদ হাসান রাজকে সোমবার সকালে গাজীপুর আদালতে পাঠানো হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
পুলিশ বলছে, কিশোরীকে কীভাবে বিদ্যালয়ের সামনে থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, কারা তাকে সিএনজিতে তুলে নিয়েছিল, সাত দিন কোথায় রাখা হয়েছিল এবং ঘটনায় অন্য কারও সম্পৃক্ততা ছিল কি না- এসব বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘটনার বিস্তারিত জানানো সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।