বিমানবন্দরে স্বর্ণের বড় বড় চালান ধরা পড়ছে। কখনো যাত্রীর শরীরে, কখনো লাগেজে; আবার কখনো উড়োজাহাজের আসনের নিচে, টয়লেট কিংবা অন্য কোনো গোপন স্থানে পাওয়া যাচ্ছে কোটি কোটি টাকার স্বর্ণ। অভিযানে গ্রেপ্তার হচ্ছেন বাহক বা বহনকারী। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে-এই স্বর্ণের প্রকৃত মালিক কে? বিদেশে কার কাছ থেকে চালান সংগ্রহ করা হচ্ছে, দেশে কার কাছে পৌঁছানোর কথা, আর বিমানবন্দরের ভেতরে কারা এসব চালান নিরাপদে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরিয়ে নিচ্ছে?
সাম্প্রতিক একাধিক ঘটনায় এসব প্রশ্নই সামনে এসেছে। সর্বশেষ গতকাল শনিবার দুবাই থেকে চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকাগামী বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইট থেকে ১৪ কেজি ৪ গ্রাম স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় সজিব নামে বিমানের এক টেকনিক্যাল হেলপারকে আটক করা হয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পরিচালক (নিরাপত্তা) মেজর ফারহান তানভিরের বরাত দিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে নজরদারি বাড়ানোর পর ওই কর্মীর ওপর সন্দেহ হয়। যাত্রীরা নেমে যাওয়ার সময় নিরাপত্তাকর্মীদের দেখে তিনি পালানোর চেষ্টা করলে তাকে আটক করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উড়োজাহাজের ভেতর থেকে স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়।
একটি চালানে ১৪ কেজির বেশি স্বর্ণ। এর আগে চলতি বছরই আরও কয়েকটি বড় চালান ধরা পড়েছে। গত ২ জুলাই দুবাই থেকে চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকায় আসা বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইট থেকে ১৬০টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। ওজন ছিল ১৮ কেজি ৭২০ গ্রাম। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত যৌথ অভিযানে গোয়েন্দা সংস্থা, এভিয়েশন সিকিউরিটি (এভসেক), কাস্টমস ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের নিরাপত্তা বিভাগ অংশ নেয়।
এর মাত্র দুই দিন আগে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাই দুবাইয়ের একটি উড়োজাহাজের আসনের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয় ৮০টি স্বর্ণের বার। ওই চালানের আনুমানিক বাজার মূল্য ছিল ২০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এখন শুধু যাত্রী বা লাগেজের ওপর নির্ভর করছে না পাচারকারীরা। উড়োজাহাজের বিভিন্ন অংশকেও ব্যবহার করা হচ্ছে স্বর্ণ লুকানোর জন্য।
এর আগে ২৮ মার্চ দুবাই থেকে আসা বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটের টয়লেট থেকে প্রায় ১৮ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়েছিল। তখনও প্রশ্ন উঠেছিল, একটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের টয়লেটের মতো জায়গায় এত বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ কে রেখে গেল, কীভাবে সেটি সেখানে পৌঁছাল এবং কার কাছে পৌঁছানোর কথা ছিল।
বদলাচ্ছে কৌশল : সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য ও বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত তথ্য বলছে, স্বর্ণ পাচারের কৌশলও বদলাচ্ছে। আগে সাধারণত দুই থেকে আড়াই কেজির চালান বেশি ধরা পড়লেও সাম্প্রতিক সময়ে ১৫ কেজি বা তার বেশি ওজনের চালানও উদ্ধার হচ্ছে। যাত্রীদের শরীর, লাগেজ, বিশেষ বেল্ট বা পোশাকের পাশাপাশি আসনের নিচে, টয়লেট, কার্গোসহ উড়োজাহাজের বিভিন্ন অংশ ব্যবহার করা হচ্ছে।
বিশেষ করে দুবাই-চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটকে ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে। একই ফ্লাইটে স্বর্ণ এক ব্যক্তির কাছ থেকে অন্য ব্যক্তির কাছে হস্তান্তরের তথ্যও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। ফলে তদন্তের প্রশ্ন এখন শুধু কে স্বর্ণ বহন করছিল-এতে সীমাবদ্ধ থাকার সুযোগ নেই। জানতে হবে, পুরো প্রক্রিয়াটি কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
কারণ একটি বড় চালান বিদেশ থেকে দেশে আনতে শুধু একজন বাহক যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে বিদেশি সরবরাহকারী, দেশীয় সমন্বয়কারী, অর্থদাতা, পরিবহনকারী এবং শেষ পর্যায়ে স্বর্ণ গ্রহণকারী ব্যক্তিদের যোগাযোগ থাকার সম্ভাবনা থাকে। বিমানবন্দরের ভেতরে কোনো সহযোগিতা থাকলে সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
নজরদারিতে এয়ারলাইনসও : সাম্প্রতিক বড় চালানগুলোর পর শাহজালাল বিমানবন্দরে স্বর্ণ চোরাচালান ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সূত্র বলছে, নজরদারির আওতায় দেশি-বিদেশি এয়ারলাইনসও রয়েছে। এর মধ্যেই বিমানের এক কর্মীর কাছ থেকে ১৪ কেজির বেশি স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনা নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা যেমন সামনে এনেছে, তেমনি প্রশ্ন তুলেছে নিরাপত্তার ফাঁকফোকর নিয়েও। একজন বিমানকর্মী যদি উড়োজাহাজের ভেতরে এত বড় চালান নিয়ে যেতে পারেন, তাহলে তার সঙ্গে আর কারা যোগাযোগ করেছিল-তা খুঁজে বের করা জরুরি। তবে অভিযোগ উঠলেই কোনো বিমানকর্মী বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে চোরাচালান চক্রের সদস্য বলা যায় না। তদন্তে কল রেকর্ড, মোবাইল ফোনের তথ্য, আর্থিক লেনদেন, সিসিটিভি ফুটেজ, যাতায়াতের তথ্য এবং জব্দ করা আলামতের মধ্যে যোগসূত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
এ বিষয়ে হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এসএম রাগিব সামাদ সম্প্রতি গণমাধ্যমকে বলেন, বিমানবন্দরকে চোরাকারবারি মুক্ত রাখতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। নজরদারির কারণেই স্বর্ণের চালানগুলো ধরা পড়ছে। সিন্ডিকেট ও চোরাকারবারিদের ঠেকাতে নজরদারি আরও জোরদার করা হবে।
চট্টগ্রাম রুটেও বড় প্রশ্ন : দুবাই থেকে চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকায় আসা ফ্লাইটে একের পর এক বড় চালান ধরা পড়ায় শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে বিমানের সিট, টয়লেট, লাগেজ, চার্জার, জুতা, পোশাক ও শরীরের বিভিন্ন অংশে লুকানো স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনা সামনে এসেছে। গত জুলাইয়ে দুবাইফেরত এক যাত্রীর কাছ থেকে ২ কেজি ১৬০ গ্রাম গলিত স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয়। ওই চালানের আনুমানিক বাজার মূল্য ছিল ৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।
বাহক নয়, ধরতে হবে নেটওয়ার্ক : বৈধভাবে স্বর্ণ আনার সুযোগ থাকলেও তার নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ব্যাগেজ বিধিমালা অনুযায়ী, নির্ধারিত শুল্ক-কর পরিশোধ করে একজন যাত্রী সীমিত পরিমাণ স্বর্ণবার বা স্বর্ণপিণ্ড আনতে পারেন। এর বেশি পরিমাণ বা গোপনে স্বর্ণ আনা হলে তা জব্দযোগ্য এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে ১৪ কেজি, ১৮ কেজি কিংবা তার বেশি ওজনের চালানকে কেবল একজন বাহকের অপরাধ হিসেবে দেখলে পুরো নেটওয়ার্কটি আড়ালেই থেকে যেতে পারে। একটি চালানের উৎস থেকে গন্তব্য পর্যন্ত অর্থ, যোগাযোগ ও সহযোগিতার পথ অনুসরণ করাই হওয়া উচিত তদন্তের মূল লক্ষ্য এমনটাই মনে করেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বিমানবন্দরে চালান ধরা পড়া নিঃসন্দেহে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার প্রমাণ। কিন্তু একই সঙ্গে বড় চালানের পুনরাবৃত্তি বলছে, পাচারকারীরাও কৌশল বদলে সক্রিয় রয়েছে। তাই এখন প্রশ্ন হওয়া উচিত শুধু-কত কেজি স্বর্ণ উদ্ধার হলো? বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন-এই স্বর্ণ কার, কোথা থেকে এল, কার কাছে যাওয়ার কথা ছিল এবং পুরো পথটি কে নিয়ন্ত্রণ করছে?
বাহক গ্রেপ্তার হলে একটি চালান থেমে যায়। কিন্তু সেই চালানের পেছনের অর্থদাতা, বিদেশি সরবরাহকারী, দেশীয় সমন্বয়কারী ও সংগ্রহকারীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেলে নেটওয়ার্কটি থেকেই যায়। স্বর্ণ চোরাচালান ঠেকানোর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন তাই চালান জব্দ করা নয়; চালানের আড়ালে থাকা অদৃশ্য নেটওয়ার্কের মুখোশ খুলে দেওয়া।