স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি প্রায় শেষ করে এনেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী নভেম্বর থেকে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শুরু হতে পারে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ভোটযাত্রা।
ইসি সূত্র জানিয়েছে, ইউপি নির্বাচন ছয় বা সাত ধাপে আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে প্রথম ধাপের তপশিল ঘোষণার প্রস্তুতিও শেষ পর্যায়ে। আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর তপশিল ঘোষণা করে নভেম্বরের শেষ দিকে প্রথম ধাপের ভোট নেওয়ার পরিকল্পনা করছে কমিশন। ধাপে ধাপে নির্বাচন উপযোগী সব ইউনিয়নে ভোটগ্রহণ আগামী বছরের শেষ নাগাদ শেষ হতে পারে।
এর আগে গত ২ আগস্ট স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে ইউপি নির্বাচন আয়োজনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ইসিকে চিঠি দেওয়া হয়। ওই নির্দেশনা পাওয়ার পরই নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি শুরু করে কমিশন।
দেশে বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদের সংখ্যা ৪ হাজার ৫৮১টি। এর মধ্যে ৩ হাজার ৯৮১টি ইউনিয়ন চলতি বছর নির্বাচন উপযোগী হবে। এসব ইউনিয়নের সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২১ ও ২০২২ সালে। বাকি ইউনিয়নগুলো ২০২৭ ও ২০২৮ সালের দিকে নির্বাচন উপযোগী হবে।
আইন অনুযায়ী, ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের বিধান রয়েছে। সেই বিধান অনুসারে নির্বাচন উপযোগী ইউনিয়নগুলোতে পর্যায়ক্রমে ভোট আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসি।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের জন্য কমিশনের প্রস্তুতি রয়েছে। ১৫ সেপ্টেম্বর তপশিল এবং নভেম্বরে ভোট শুরুর বিষয়টি বিবেচনায় রেখে কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হচ্ছে।
তিনি জানান, আগের মতো কয়েক ধাপেই ইউপি নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কোনো ইউনিয়নে মামলা, সীমানা নির্ধারণ বা অন্য কোনো আইনি জটিলতা থাকলে সেখানে ওই সময়ে নির্বাচন নাও হতে পারে।
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানিয়েছেন, ছয় বা সাত ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে আইন, বিধি ও আচরণবিধি সংশোধনের কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইন এবং স্থানীয় সরকারের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক আচরণবিধির খসড়া ইতোমধ্যে তৈরি করে আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠিয়েছে ইসি। অনুমোদনের পর এগুলো গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে।
এদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকাও চূড়ান্ত করেছে কমিশন। দেশে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৮৭ লাখ ৭৭ হাজার ৬৪৩ জন।
ভোটার স্থানান্তরের আবেদন জমা দেওয়ার শেষ সময় ৭ সেপ্টেম্বর এবং এসব আবেদন নিষ্পত্তির সময় ১০ সেপ্টেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপর ভোটার তালিকা মুদ্রণের জন্য পাঠানো হবে।
সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্রের তালিকাও প্রস্তুত করে রেখেছে ইসি। গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ৪২ হাজার ৭৬১টি কেন্দ্রে ভোট নেওয়া হয়েছিল। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একসঙ্গে দুটি ভোট না থাকায় কেন্দ্রের সংখ্যা দুই থেকে তিন হাজার পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে ধারণা করছে কমিশন।
ইসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, গড়ে প্রতি দুই হাজার ভোটারের জন্য একটি ভোটকেন্দ্র রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
নভেম্বরের আগেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বার্ষিক পরীক্ষা ও অন্যান্য পরীক্ষা শেষ করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনাও দিয়েছে ইসি। ভোটকেন্দ্র হিসেবে স্কুল ভবন ব্যবহার এবং শিক্ষকদের নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের সুবিধার্থে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ, বিজিবি এবং আনসার ও ভিডিপির প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করেছে কমিশন।
পুলিশপ্রধানের সঙ্গে বৈঠকে সারাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রতিবেদন চেয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। ওই প্রতিবেদন পাওয়ার পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হবে।
তবে এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা আপাতত নেই বলে ইসি সূত্র জানিয়েছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য আগে থেকেই সংগ্রহ করা বেশ কিছু নির্বাচনী সামগ্রী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ব্যবহার করবে কমিশন। ফলে নতুন করে বিপুল পরিমাণ সামগ্রী কেনার প্রয়োজন হবে না।
ইসি সূত্র জানিয়েছে, সংসদ নির্বাচনের আগে ছোট হোসিয়ান ব্যাগ ও গানি ব্যাগ এক লাখ ১৫ হাজার পিস করে, বড় হোসিয়ান ব্যাগ ৭৫ হাজার পিস, মার্কিং সিল ১৭ লাখ ৫০ হাজার পিস এবং অফিসিয়াল সিল ৮ লাখ ৪০ হাজার পিসসহ বিভিন্ন নির্বাচনী সামগ্রী সংগ্রহ করা হয়েছিল। এসব সামগ্রী বর্তমানে মজুত রয়েছে।
ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদও জানিয়েছেন, নভেম্বরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্য সামনে রেখে কমিশনের প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে রয়েছে। যেকোনো সময় তপশিল ঘোষণা করা হতে পারে।