চিকিৎসাধীন এক রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনার প্রতিবাদে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি ঘোষণা করেছেন ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে হাসপাতাল চত্বরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে চার দফা দাবি তুলে ধরে কর্মবিরতির ঘোষণা দেন ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন ডা. ঋতুল মন্ডল স্নিগ্ধ, ডা. অর্পন ও ডা. রিদওয়ান উদ্দিন।
ইন্টার্ন চিকিৎসকদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, হামলায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা, হাসপাতালে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, সশস্ত্র আনসার মোতায়েন, অতিরিক্ত রোগীর চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং একজন রোগীর সঙ্গে সর্বোচ্চ একজন অ্যাটেনডেন্ট রাখার ব্যবস্থা করা।
চিকিৎসকদের অভিযোগ, হাসপাতালে আনসার ও পুলিশ ফাঁড়ি থাকা সত্ত্বেও হামলার সময় তারা প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সহায়তা পাননি। হামলায় জড়িতদের গ্রেপ্তার ও চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তারা।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, মঙ্গলবার রাতে শ্বাসকষ্ট ও শকে আক্রান্ত এক মুমূর্ষু রোগীকে শজিমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার অবস্থা শুরু থেকেই অত্যন্ত সংকটাপন্ন ছিল। চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও তাকে বাঁচাতে পারেননি। রাত ১০টার দিকে ওই রোগীর মৃত্যু হলে স্বজনদের সঙ্গে কর্তব্যরত চিকিৎসক ও ইন্টার্নদের কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি সংঘর্ষে রূপ নেয় এবং চিকিৎসকদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে।
ইন্টার্ন চিকিৎসকদের দাবি, এ ঘটনায় প্রায় ১৫ জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্তত ছয়জন গুরুতর আহত। কয়েকজনের হাড় ভেঙে গেছে বলেও দাবি করেন তারা। হামলার সময় এক ইন্টার্ন চিকিৎসককে স্যালাইনের স্ট্যান্ড দিয়ে পিঠে আঘাত করা হয়। এতে তার মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাতসহ নিউমোথোরাক্স ও স্থায়ী পক্ষাঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে চিকিৎসকেরা জানান।
ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা আরও বলেন, শজিমেক হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮০০ করা হলেও সেই অনুপাতে জনবল বাড়ানো হয়নি। ফলে প্রতিদিন অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে চিকিৎসকদের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হচ্ছে। তাদের দাবি, একটি ইউনিটে যেখানে ২০ জনের বেশি রোগী থাকার কথা নয়, সেখানে প্রায় ১২০ জন পর্যন্ত রোগী রাখতে হচ্ছে।
এদিকে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতির প্রভাব পড়েছে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবায়। রোগী ও স্বজনদের মধ্যে এ নিয়ে উদ্বেগ ও ভোগান্তি দেখা দিয়েছে।
হাসপাতালে ভর্তি এক রোগীর স্বজন ছায়েদ আলী বলেন, ঘটনার পর থেকে চিকিৎসকদের নিয়মিত উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে না। বুধবার সকালে একবার রাউন্ড দিয়ে চিকিৎসকেরা চলে গেছেন। এরপর আর চিকিৎসাসেবা পাননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অন্যদিকে আলাল, নিতাই ও সামিউলসহ কয়েকজন রোগীর স্বজন বলেন, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কারও মৃত্যু হলে বিষয়টি নিয়ে স্বজনদেরও সহনশীল থাকা প্রয়োজন। কথা কাটাকাটি থেকে যেন সংঘর্ষের মতো পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে কর্মবিরতির কারণে অন্য রোগীরা যেন চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত না হন, সে বিষয়েও তারা দ্রুত সমাধানের দাবি জানান।
হাসপাতালের উপপরিচালক মনজুর ই মোর্শেদ বলেন, ঘটনার বিষয়ে কর্তৃপক্ষ আলোচনা করছে। ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতি চললেও হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা চালু রয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সিনিয়র ও মিড-লেভেল চিকিৎসকদের রোগীর সেবায় নিয়োজিত করা হয়েছে।