পরিবারের ভাগ্য বদলের স্বপ্ন নিয়ে মাত্র দুই মাস আগে স্পেনে পাড়ি জমিয়েছিলেন গাজীপুরের কালীগঞ্জের তরুণ ইউসুফ হাসান আলিফ (২৭)। দীর্ঘ অপেক্ষার পর অগ্নিকাণ্ডের মাত্র দুই দিন আগে পেয়েছিলেন কাঙ্ক্ষিত ওয়ার্ক পারমিট। নতুন কর্মজীবন শুরুর সেই আনন্দ কাটতে না কাটতেই মাদ্রিদের একটি বাইসাইকেল গ্যারেজে ভয়াবহ আগুনে প্রাণ হারালেন তিনি।
মৃত্যুর আগে গ্যারেজের ভেতর আটকা পড়ে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে সহকর্মীদের উদ্দেশে ইউসুফের শেষ আকুতি ছিল, ‘আমাদের বাঁচান ভাই, দম বন্ধ হয়ে আসছে।’ এরপর আর কোনো বার্তা পাঠাতে পারেননি তিনি।
রোববার (৩০ আগস্ট) স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ৩৭ মিনিটে স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের আরগানসুয়েলা জেলার মেট্রো পালোস দে লা ফ্রন্তেরা এলাকার কাইয়ে কানারিয়াস সড়কের একটি বাইসাইকেল গ্যারেজে আগুন লাগে।
নিহত ইউসুফ গাজীপুরের কালীগঞ্জ পৌরসভার উত্তরগাঁও এলাকার আব্দুল মোতালিব ও রহিমা খাতুনের ছেলে। তিনি পেশায় ফুড ডেলিভারি রাইডার ছিলেন।
স্বজনরা জানান, পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন এবং ভবিষ্যৎ গড়ার আশায় গত জুনে স্পেনে যান ইউসুফ। সেখানে গিয়ে কাজের অনুমতির জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেন। দীর্ঘ অপেক্ষার পর অগ্নিকাণ্ডের মাত্র দুই দিন আগে হাতে পান ওয়ার্ক পারমিট।
কাজের নতুন সুযোগ নিয়ে যখন ভবিষ্যৎ সাজানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই ঘটে যায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।
প্রতিদিনের মতো রোববার সন্ধ্যায় ফুড ডেলিভারির কাজে ব্যবহৃত সাইকেল নিতে ওই গ্যারেজে যান ইউসুফ। স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গ্যারেজে থাকা একটি ইলেকট্রিক বাইসাইকেলের ব্যাটারি বিস্ফোরিত হয়ে আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো গ্যারেজে।
আগুনের সঙ্গে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ঘন ধোঁয়া ও বিষাক্ত গ্যাস। এতে ইউসুফসহ তিনজন ভেতরে আটকা পড়েন। জীবন বাঁচানোর আশায় তখন সহকর্মীদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে বার্তা পাঠান ইউসুফ—‘আমাদের বাঁচান ভাই, দম বন্ধ হয়ে আসছে।’
এটাই হয়ে থাকে তাঁর শেষ বার্তা।
খবর পেয়ে মাদ্রিদ সিটি কাউন্সিলের ফায়ার সার্ভিসের ১৩টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার ও অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম শুরু করে। আগুন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি গ্যারেজে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাস অপসারণ করা হয়। নতুন করে আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় গ্যারেজে থাকা অন্য ইলেকট্রিক বাইসাইকেলগুলোও বাইরে সরিয়ে নেওয়া হয়।
তবে ততক্ষণে প্রাণ হারিয়েছেন ইউসুফ। ঘটনাস্থলেই চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। আগুনে দগ্ধ অপর দুই সহকর্মীকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
ইউসুফের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই স্পেনপ্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। একই সঙ্গে গাজীপুরের কালীগঞ্জের উত্তরগাঁও এলাকায় নেমে এসেছে শোকের আবহ।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ইউসুফকে ঘিরে তাদের অনেক স্বপ্ন ছিল। বিদেশে গিয়ে কাজ করে পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করবেন, একদিন সফল হয়ে দেশে ফিরবেন—এমন প্রত্যাশাই ছিল স্বজনদের। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই প্রবাসের মাটিতে থেমে গেল তাঁর জীবন।
কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ. টি. এম. কামরুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি আমরা অবগত হয়েছি। তবে পরিবারটি বর্তমানে শোকের মধ্যে থাকায় এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রশাসনকে জানায়নি। তারা প্রশাসনের সহযোগিতা চাইলে গাজীপুর জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ইউসুফের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তাঁর মামাতো ভাই ও বার্সেলোনা প্রবাসী শফিকুল ইসলাম রাসেল।
পরিবারের এখন একটাই অপেক্ষা, প্রিয় মানুষটির মরদেহ দেশে ফেরার। যে তরুণ স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন স্পেনে, জীবিত অবস্থায় আর দেশে ফেরা হলো না তাঁর।
মৃত্যুর আগে পাঠানো ইউসুফের সেই শেষ বার্তা—‘আমাদের বাঁচান ভাই, দম বন্ধ হয়ে আসছে’
স্বজনদের কাছে এখন কেবলই এক হৃদয়বিদারক স্মৃতি।