ধ্বংসস্তূপে স্বজনের সন্ধান, নদীতে চলছে নিখোঁজদের খোঁজ

সুজন দে

আন্তর্জাতিক

নদীর পানি অনেকটাই নেমেছে। কিন্তু নেপালের ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদীর তীরজুড়ে এখনো থামেনি মানুষের আর্তনাদ। কোথাও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে স্বজনের

2026-08-28T20:02:41+00:00
2026-08-28T20:02:41+00:00
  শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬,
৮ কার্তিক ১৪৩৩
 
শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
থামছে না হিমালয়কন্যার কান্না
ধ্বংসস্তূপে স্বজনের সন্ধান, নদীতে চলছে নিখোঁজদের খোঁজ
সুজন দে
শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ৮:০২ পিএম 
ধ্বংসস্তূপে স্বজনের সন্ধান, নদীতে চলছে নিখোঁজদের খোঁজ
নদীর পানি অনেকটাই নেমেছে। কিন্তু নেপালের ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদীর তীরজুড়ে এখনো থামেনি মানুষের আর্তনাদ। কোথাও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে স্বজনের সন্ধান চলছে, কোথাও নদীর তীরে দাঁড়িয়ে নিখোঁজ মানুষের ফেরার অপেক্ষায় পরিবার। কেউ ফিরেছেন আহত অবস্থায়, কেউ ফিরেছেন স্বজনের মরদেহ হয়ে। আবার অনেকেই এখনো নিখোঁজ।

২৬ আগস্টের আকস্মিক বন্যার তৃতীয় দিনেও নেপালের দুর্গত জনপদগুলোর চিত্র একই—একদিকে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও উদ্ধারকারীদের নিরন্তর অভিযান, অন্যদিকে প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার আশায় মানুষের অপেক্ষা। ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদীঘেঁষা বিস্তীর্ণ এলাকায় বন্যার যে ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়েছিল, তিন দিন পরও তার পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট হয়নি।

শুক্রবার পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নেপালের পুলিশ জানিয়েছে, বন্যায় ৪৬৯ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। একই সঙ্গে শত শত মানুষ এখনো নিখোঁজ। নদীর স্রোতে ভেসে যাওয়া মানুষ ও ধ্বংসাবশেষের সন্ধানে তল্লাশি আরও নিচের দিকে বিস্তৃত করা হয়েছে।

প্রবল স্রোতে ঘরবাড়ি, যানবাহন, সেতু, সড়ক ও বিভিন্ন স্থাপনা ভেসে গেছে। অনেক এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা বিপর্যস্ত। ফলে দুর্গত মানুষের কাছে পৌঁছানো এবং নিখোঁজদের শনাক্ত করা উদ্ধারকারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বন্যার পানির সঙ্গে ভেসে যাওয়া মানুষ ও ধ্বংসাবশেষ নদীর স্রোতে অনেক দূর পর্যন্ত চলে গেছে। তাই উদ্ধার অভিযান এখন শুধু বন্যাকবলিত এলাকাকে ঘিরে নেই—নদীর নিম্নপ্রবাহের বিভিন্ন এলাকাতেও তল্লাশি চালানো হচ্ছে। ধ্বংসস্তূপ, নদীর তীর এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনায় জীবিত মানুষের সন্ধান করছেন উদ্ধারকারীরা।

তিন দিন পরও অনেক পরিবার জানে না, তাদের স্বজন বেঁচে আছেন কি না। কেউ শেষবার ফোনে কথা বলেছেন, এরপর আর যোগাযোগ নেই। কেউ জানেন, স্বজনটি বন্যাকবলিত এলাকায় ছিলেন—কিন্তু তিনি কোথায়, তার কোনো তথ্য নেই।

এই অনিশ্চয়তাই এখন নেপালের দুর্যোগের সবচেয়ে বড় মানবিক চিত্র।

উদ্ধার তৎপরতার সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে মাঠে রয়েছে নেপাল সেনাবাহিনী। দুর্গম এলাকা, কাদামাটি, ধ্বংসস্তূপ ও প্রবল নদীর স্রোতের মধ্যেও স্থল ও আকাশপথে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে তারা।

বন্যার পর আপার ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি টানেলে শত শত শ্রমিক ও স্থানীয় মানুষ আটকা পড়েন। ইতিমধ্যে নেপাল সেনাবাহিনী অভিযান চালিয়ে সেখান থেকে ৩৫০ জনকে জীবিত উদ্ধার করেছে। তবে টানেলের ভেতরে আরও ১০০ জনের বেশি মানুষ আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাদের উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

টানেল থেকে একে একে মানুষ বেরিয়ে আসার দৃশ্য যেমন স্বজনদের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়েছে, তেমনি দেশের অন্য প্রান্তে চলছে নিখোঁজদের সন্ধান। ফলে এই উদ্ধার অভিযান শুধু একটি সামরিক তৎপরতা নয়—হাজারো পরিবারের কাছে এটি এখন শেষ আশার জায়গা।

এদিকে দুর্যোগের পর সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছেন নিখোঁজদের স্বজনেরা। কোনো পরিবারের কাছে শেষ খবর এসেছে ফোনে, তারপর আর যোগাযোগ নেই। কেউ হাসপাতাল, কেউ উদ্ধারকেন্দ্র, কেউ পুলিশ স্টেশনে ঘুরছেন। তাদের প্রত্যাশা—হয়তো কোনো তালিকায় মিলবে স্বজনের সন্ধান।

আবার কোথাও পরিচয়হীন মরদেহের তালিকা তৈরি হচ্ছে। স্বজনেরা সেই তালিকায় খুঁজছেন পরিচিত একটি নাম।

নিখোঁজ বিদেশি পর্যটকরাও

নেপালের এই বিপর্যয়ে স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদের নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বন্যাকবলিত ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদীসংলগ্ন এলাকায় ওই সময় বহু পর্যটক ও যাত্রী চলাচল করছিলেন।

নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডও নিখোঁজ পর্যটকদের তথ্য যাচাই করছে। বিভিন্ন পর্যটন সংস্থা, ট্রাভেল এজেন্সি, স্থানীয় প্রশাসন ও নিরাপত্তা সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া তথ্য সমন্বয় করে তালিকা হালনাগাদ করা হচ্ছে। ফলে উদ্ধার অভিযান চলার সঙ্গে সঙ্গে নিখোঁজের সংখ্যাতেও পরিবর্তন আসছে।

ভেঙে পড়েছে যোগাযোগব্যবস্থা

বন্যার আঘাতে শুধু মানুষের জীবন নয়, নেপালের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামোও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুর্গত এলাকায় দ্রুত ত্রাণ ও উদ্ধার সরঞ্জাম পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

কোথাও রাস্তার ওপর জমে আছে কাদা ও পাথরের স্তূপ, কোথাও সেতু নেই। আবার কোথাও নদীর গতিপথের পরিবর্তনে পরিচিত পথও অচেনা হয়ে গেছে।

নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় বহু মোটরযোগ্য ও ঝুলন্ত সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রায় ৪০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে দুর্গত এলাকায় পৌঁছাতে উদ্ধারকারীদের অনেক ক্ষেত্রে আকাশপথের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

ধ্বংসস্তূপে খাবার-পানির সংকট

প্রাথমিক উদ্ধারপর্বের পর এখন সামনে আসছে আরেকটি মানবিক সংকট—বেঁচে থাকা মানুষের খাবার, পানি, চিকিৎসা ও আশ্রয়।

যেসব পরিবার ঘর হারিয়েছে, তাদের অনেকেই এখন নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে। বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থার ক্ষতি পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

আহতদের চিকিৎসা দেওয়া, নিখোঁজদের তথ্য সংগ্রহ করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া—সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন, নিরাপত্তা বাহিনী ও উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোকে।

ঝুঁকি নিয়েই চলছে উদ্ধার

বন্যার তিন দিন পরও উদ্ধার অভিযান ঝুঁকিমুক্ত নয়। নদীর স্রোত, ধ্বংসস্তূপের অস্থিতিশীলতা, কাদামাটি এবং পাহাড়ি এলাকায় নতুন করে ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে।

তাই জীবিতদের উদ্ধারের পাশাপাশি উদ্ধারকারীদের নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একটি ভুল পদক্ষেপে উদ্ধারকারী দল নিজেরাই বিপদের মুখে পড়তে পারে।

তারপরও থেমে নেই অভিযান। কারণ ধ্বংসস্তূপের নিচে, কোনো টানেলের অন্ধকারে কিংবা নদীর তীরের কোনো দুর্গম স্থানে একজন মানুষও যদি বেঁচে থাকার সম্ভাবনা থাকে, সেই সম্ভাবনাকেই সামনে রেখে সময়ের সঙ্গে লড়ছেন উদ্ধারকারীরা।

আর নদীর তীরে দাঁড়িয়ে স্বজনেরা অপেক্ষা করছেন—হয়তো আজই ফিরবে প্রিয় মানুষটি।


Loading...
Loading...

আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: