রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তান হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসই হত্যায় জড়িত বলে দাবি করেছে পুলিশ। দুই আসামির আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির বরাত দিয়ে মহানগর পুলিশ জানিয়েছে, পরিবারের তিন সদস্যকে বাড়ির ছাদে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরে ঘরের ভেতরে হত্যা করা হয় গণপতির ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীকে।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকালে রংপুর মহানগর পুলিশ সদর দপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মামলার তদন্তের অগ্রগতি তুলে ধরেন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ।
পুলিশের দাবি, ২১ আগস্ট ভোরে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ অতিরিক্ত ইয়াবা সেবন করে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে অবস্থান করছিলেন। পানির ট্যাংকের আড়ালে বসে থাকার সময় ভোর হয়ে যায়। এ সময় গণপতি ছাদে গিয়ে তাদের দেখতে পেয়ে ধমক দিলে নিজেদের পরিচয় ও ঘটনাটি প্রকাশ পাওয়ার আশঙ্কায় তাঁকে গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।
পরে গণপতির স্ত্রী ও মেয়ে চিৎকার শুনে ছাদে এলে তাদেরও শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। এরপর বাড়ির ভেতরে গিয়ে ঘুম থেকে ওঠা ছেলে প্রিয়মকে দেখতে পেয়ে তাকেও গলায় কাপড় পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য, হত্যার পর গণপতির মরদেহ ছাদের এক পাশে টিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। তাঁর স্ত্রী ও মেয়ের মরদেহ রাখা হয় ছাদের সিঁড়ির গেটের আড়ালে।
পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডকে চুরি বা ডাকাতির ঘটনা হিসেবে দেখাতে ঘরের ড্রয়ার ভাঙচুর ও জিনিসপত্র এলোমেলো করেন দুই আসামি। তারা বাড়ি থেকে স্বর্ণালঙ্কার ও ১৫ হাজার টাকা নিয়ে যান।
এ ছাড়া সিসি ক্যামেরা থাকার আশঙ্কায় প্লাস দিয়ে বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয় বলে পুলিশের দাবি। পরে দুই আসামি দেয়াল টপকে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান।
পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ জানান, ময়নাতদন্তে চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। নিহত দুই নারীর মরদেহের নমুনা পরীক্ষায় ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি বলেও জানান তিনি।
এদিকে গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসের ডোপ টেস্ট ও ডিএনএ পরীক্ষার প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি প্রতিবেশী, শ্মশানের কেয়ারটেকারসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে।
ক্রাইমসিন ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন
তবে এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ঘিরে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাস্থলের আলামত সংরক্ষণ, ছাদে পানি পড়ার ঘটনা এবং তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা হয়েছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দায়িত্বে থাকা সদস্য লাইট জ্বালাতে গিয়ে ভুল করে পানির মোটরের সুইচ চালু করে ফেলায় ছাদে পানি পড়ে। তবে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পুলিশের বক্তব্য নিয়েও অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে।
সংবাদ সম্মেলনে তদন্তের অগ্রগতি তুলে ধরার পর সাংবাদিকরা হত্যার উদ্দেশ্য, আলামত সংরক্ষণ ও অন্যান্য বিষয়ে প্রশ্ন করেন। কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পর পুলিশ কমিশনার আর কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সংবাদ সম্মেলনস্থল ত্যাগ করেন।
পুলিশ বলছে, জবানবন্দি, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা আলামত এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে তদন্ত আরও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।