
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সম্প্রতি ভোরের ডাকের সঙ্গে আলাপকালে দাবি করেছেন, সরকার প্রথম ছয় মাসের নির্ধারিত লক্ষ্যের অধিকাংশই বাস্তবায়ন করেছে। কোথাও ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ, কোথাও ১০০ শতাংশ কাজ হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর মতে, প্রথম ছয় মাস ছিল প্রশাসন গুছিয়ে নেওয়া এবং বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রস্তুতির সময়।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিনও সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের অর্জন তুলে ধরেছেন। তিনি নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, জনসম্পৃক্ততা, বাক্স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের অগ্রগতিকে সরকারের বড় অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তবে সরকারের এই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত নয় বিরোধী দলগুলো।
প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়নে আর্থিক ব্যবস্থাপনা, গ্যাস-বিদ্যুৎ-তেল এবং সামগ্রিক প্রশাসনিক সক্ষমতার ঘাটতি স্পষ্ট হয়েছে। এর আগে জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও শিক্ষা ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন স্তরে দলীয়করণ হচ্ছে।
সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কঠোর সমালোচনা করেছেন এনসিপির নাহিদ ইসলাম। ২৪ আগস্ট এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বিএনপি সরকারের প্রথম ১৮০ দিনকে ‘অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা, অপরিণামদর্শিতা ও অসততার’ দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা ও জ্বালানি সরবরাহ- সরকারের ঘোষিত অগ্রাধিকার তিন ক্ষেত্রেই ব্যর্থতা রয়েছে।
সরকারের ছয় মাসের কর্মকাণ্ড নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)। দলটির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেছেন, ছয় মাসে সরকারের গতি ও অগ্রগতি হতাশাজনক। অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য, শাসনব্যবস্থা, উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও গণতান্ত্রিক চর্চার মতো বিভিন্ন সূচকে আশানুরূপ উন্নতি হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনাকেও হতাশাজনক বলে উল্লেখ করেন মঞ্জু। তবে তিনি বলেন, ছয় মাসেই সরকারের পূর্ণাঙ্গ সফলতা বা ব্যর্থতার হিসাব করা ঠিক হবে না।
এদিকে সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়নের পাশাপাশি রাজপথের কর্মসূচি নিয়ে প্রস্তুতি শুরু করেছে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট।
জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জ্বালানি সংকট, দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ ১১ দফা দাবিতে চারটি লংমার্চের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে জোটটি।
ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর, ১০ অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনা এবং ২৪ অক্টোবর ঢাকা থেকে সিলেট অভিমুখে লংমার্চ করবে ১১ দলীয় জোট।
এর মধ্যে ৫ সেপ্টেম্বরের ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কর্মসূচি সফল করতে জামায়াতের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে একাধিক প্রস্তুতি বৈঠক হয়েছে।
এর আগে ২৩ আগস্ট ১১ দলীয় ঐক্যের বৈঠকে সরকারের ছয় মাসের কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক থেকে মন্ত্রিসভায় আরও পরিবর্তনের দাবি জানানো হয়।
রাজপথের পাশাপাশি সংসদেও সরকারের বিরুদ্ধে সরব হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিরোধীরা। ত্রয়োদশ সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হচ্ছে ২৭ আগস্ট বিকেল ৩টায়।
সংসদে জামায়াতে ইসলামীর ৭৭টি আসন রয়েছে। ক্ষমতাসীন বিএনপির আসন ২৪৭টি। সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিক থেকে সরকার শক্ত অবস্থানে থাকলেও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে জামায়াতের সংসদ সদস্যরা আইন, সংবিধান সংস্কার, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন।
এদিকে রাজপথের কর্মসূচির সঙ্গে সংসদীয় কার্যক্রম সমন্বয় করার প্রস্তুতিও নিচ্ছে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট। আগামী অধিবেশনে সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিরোধী দলের অবস্থান আরও স্পষ্ট হতে পারে।
ফলে বিএনপি সরকারের ছয় মাস পূর্তিকে ঘিরে সরকার ও বিরোধী দলগুলোর পাল্টাপাল্টি মূল্যায়নের পাশাপাশি সংসদ ও রাজপথে রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে। ৫ সেপ্টেম্বরের ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ এবং ২৭ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া সংসদ অধিবেশনেই এর প্রথম বড় প্রকাশ দেখা যেতে পারে।
rate this