বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ছয় মাস পূর্তির মাথায় গত ২১ আগস্ট শুক্রবার নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শপথের পরপরই মন্ত্রিসভায় প্রথম রদবদল হয়েছে। নতুন মুখ যুক্ত হওয়া ও কয়েকটি দপ্তরে পরিবর্তন আসলেও, বেশ কয়েকজন বিতর্কিত ও কম সক্রিয় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী আপাতত রক্ষা পেয়েছেন। ঘরোয়া আলোচনায় অনেকে বলছেন, তাঁদের ‘কানের কাছ দিয়ে গুলি বেরিয়ে গেছে’। তবে এই স্বস্তি যে সাময়িক, তা নিয়ে সংশয় রয়েই গেছে। কারণ খুব দ্রুতই মন্ত্রিসভায় আরেকটি বড় রদবদলের সম্ভাবনা রয়েছে।
ছয় মাস পূর্তির রদবদলে মূলত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, শিক্ষা এবং যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের মতো দপ্তরে পরিবর্তনের চোখ ছিল সবার। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও দেশের নানাবিধ সিন্ডিকেটের কারনে গ্যাস, জ্বালানি সংকট ও লোডশেডিংয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল, যা সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়কে তীব্র চাপের মুখে ফেলেছে। এছাড়া শিক্ষাঙ্গনে নানা অস্থিরতা, এইচএসসির মত পাবলিক পরীক্ষায় বিতর্কিত বক্তব্য ও সিদ্ধান্তসহ নানা কারণে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা, অভিজ্ঞতা বিবেচনা এবং দলের প্রতি অতীত আনুগত্যের হিসাব-নিকাশ করে এসব মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তন আনা হয়নি।
একইভাবে উত্তরবঙ্গের দুজন বিতর্কিত প্রতিমন্ত্রী এবং ঢাকার একজন পূর্ণ মন্ত্রীর দিকেও নজর ছিল সবার। তাঁদের মধ্যে একজন প্রতিমন্ত্রীর ভিডিও ভাইরাল হলেও সেটি গ্রহণযোগ্য হয়নি। অন্য এক প্রতিমন্ত্রী নীরব থাকার নীতি অবলম্বন করে এবং ঢাকার ওই মন্ত্রী অতিকথন বন্ধ করে আপাতত টিকে গেছেন। কিন্তু রাজনৈতিক মহল বলছে, এটি তাঁদের জন্য শেষ সুযোগের মতো।
৬ মাসের ‘আমলনামা’ প্রধানমন্ত্রীর হাতে: সরকার গঠনের পরপরই ১৮০ দিনের একটি বিশেষ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছিল। এই সময়সীমা শেষ হওয়ায় প্রতিটি দপ্তরের কাজের গতি ও মন্ত্রীদের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের একটি নিবিড় মূল্যায়ন রিপোর্ট (আমলনামা) এখন সরাসরি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতে রয়েছে। গত ছয় মাসে কে কেমন পারফর্ম করেছেন, তার চুলচেরা খতিয়ান এখন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে সংরক্ষিত।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্র জানায়, বেশ কিছু মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ছোট-বড় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এই কার্যালয়ে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী ধাপে ধাপে সকলের কর্মকান্ড পর্যালোচনা করে তা নোট রাখছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করে বলেছেন, অনিয়মের অভিযোগ পেলে যে যত বড় পদেই থাকুন, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। দলের সংসদীয় কমিটির বৈঠকেও তিনি মন্ত্রী ও এমপিদের তৃণমূলের সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করার কড়া নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রতি তিন মাস অন্তর বৈঠকের মাধ্যমে মন্ত্রীদের ইতিবাচক ও নেতিবাচক কর্মকাণ্ড পর্যালোচনার সিদ্ধান্তও রয়েছে।
কাজের গতি বৃদ্ধি ও জবাবদিহির তীব্র চাপ: বর্তমানে প্রশাসনের উপর কাজের গতি বাড়ানোর জন্য নজিরবিহীন চাপ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা দাপ্তরিক কাজ করছেন এবং সকাল ৯টা থেকে ১০টার মধ্যেই সচিবালয়ে উপস্থিত হচ্ছেন বলে একাধিক মন্ত্রী-সচিব জানিয়েছেন। তাঁর এই কঠোর কর্মগতির সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন মন্ত্রিসভার সদস্য এবং আমলারা। সকালে দেওয়া নির্দেশনার বাস্তবায়ন কতটুকু হলো, তা সন্ধ্যা বা পরের দিন সকালের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীকে বাধ্যতামূলকভাবে অবহিত করতে হয়।
এই ‘কুইক রেসপন্স’ সংস্কৃতির কারণে ছুটির দিনেও দাপ্তরিক কাজ চলছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মন্ত্রী ও আমলাদের বিদেশ সফরেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রধানমন্ত্রীর বেঁধে দেওয়া কঠিন ডেডলাইন ও কাজের গতির সাথে মানিয়ে নিতে নাভিশ্বাস উঠছে অনেকের।
সামনে আসছে আরও বড় রদবদল: গত ২১ আগস্টের রদবদলে মন্ত্রিসভায় নতুন ৫ জন সদস্য যুক্ত হওয়ায় সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫১ জনে। তবে এটিকে চূড়ান্ত রদবদল হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, অতীত-বর্তমান কর্মের মূল্যায়ন, দল ও সরকারের মধ্যে সমন্বয় এবং আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্ব বিবেচনায় নিয়ে যেকোনো সময় প্রধানমন্ত্রী রদবদলের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তবে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বা সেপ্টেম্বর নাগাদ দ্বিতীয় দফায় আরেকটি বড় দপ্তর পুনর্বণ্টন ও মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ হতে পারে।
বিশেষ করে যেসব মন্ত্রীর অধীনে একাধিক বড় মন্ত্রণালয় রয়েছে, যেমন সড়ক পরিবহন ও সেতু, মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের গুরুদায়িত্বে একাই রয়েছেন শেখ রবিউল আলম; কৃষি, মৎস, প্রাণিসম্পদ ও খাদ্য মন্ত্রনালয়ে একাই মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন আমিন উর রশিদ ইয়াছিন; বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট এই তিন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। এসব মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ভাগ করে নতুন প্রতিমন্ত্রী বা মন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। এছাড়া সরকারের ভেতরের ৭-৮টি মন্ত্রণালয়ের কাজে প্রত্যাশিত গতি না থাকায় আগামী রদবদলে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরী বলেন, রাষ্ট্রপরিচালনা সুশৃঙ্খল করতে মন্ত্রিসভায় সৎ ও যোগ্য লোকের অন্তর্ভুক্তি অত্যন্ত জরুরি। আর তাই আসন্ন এই রদবদলকে কেন্দ্র করে বিতর্কিত ও পিছিয়ে পড়া মন্ত্রীদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর হচ্ছে।