দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অনুমোদনহীন ৮২৯ স্লিপার এসি বাস। যাত্রী পরিবহনের জন্য বিশেষভাবে তৈরি এসব বাসের বড় একটি অংশ প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও নিবন্ধন ছাড়াই পরিচালিত হওয়ায় সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) এসব বাসের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা শুরু করেছে। এর বিরোধীতা করে সারাদেশে চলা অবৈধ স্লিপার বাসের বৈধতার দাবিতে গতকাল রাজধানীর বনানী সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে বাংলাদেশ স্লিপার এসি বাস মালিক সমিতি ও শ্রমিকরা। তারা বলছেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহলের প্রভাবে স্লিপার বাসের বিরুদ্ধে অভিযান চলানো হচ্ছে। চলমান অভিযান বন্ধ করে তা বৈধতার দাবি জানিয়ে তারা বলছেন না হয় পরিবহন খাতের প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ এবং লক্ষাধিক মানুষের কর্মহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অনুমোদনহীনভাবে স্লিপার কোচ তৈরি, সাধারণ বাসের কাঠামো পরিবর্তন এবং অনিবন্ধিত গ্যারেজে এসব যানবাহন মেরামতের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে বিআরটিএ। রাজধানীর পাশাপাশি সিলেট ও কক্সবাজারেও অনুমোদনহীন স্লিপার বাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কোথাও গ্যারেজে জরিমানা, কোথাও বাস জব্দ ও ডাম্পিং, আবার কোথাও চলাচলরত বাসের বিরুদ্ধে মামলা ও অর্থদন্ড করা হয়েছে। তবে এসব অভিযান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, গ্যারেজে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। উৎপাদনস্থল ও মেরামতকেন্দ্রের পাশাপাশি সড়কে চলাচলরত অনুমোদনহীন বাসের বিরুদ্ধেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দীর্ঘপথের যাত্রীদের আরামদায়ক ভ্রমণের কথা বলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্লিপার বাসের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। বাসের ভেতরে শোয়ার জন্য পৃথক বার্থ, অতিরিক্ত আসন বিন্যাস এবং বিভিন্ন ধরনের আধুনিক সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এসব পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া হয়নি।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি সাধারণ বাসকে স্লিপার বাসে রূপান্তরের সময় যানবাহনের কাঠামো, ভারসাম্য, বডির নিরাপত্তা, যাত্রী ধারণক্ষমতা এবং জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা যথাযথভাবে পরীক্ষা করা জরুরি। অনুমোদন ছাড়া কাঠামোগত পরিবর্তন করা হলে দুর্ঘটনার সময় যাত্রীদের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
সড়ক পরিবহন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অনুমোদনহীন বাসের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে বাস্তবে এসব যানবাহন শনাক্ত করা, কাগজপত্র যাচাই এবং নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের মতে, স্লিপার বাসে শুয়ে থাকা যাত্রীদের দ্রুত বের হওয়ার সুযোগ সাধারণ বাসের তুলনায় সীমিত হতে পারে। ফলে দুর্ঘটনা বা অগ্নিকান্ডের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে নিরাপদে যাত্রী সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
এদিকে দূরপাল্লার যাত্রীদের মধ্যে স্লিপার বাসের চাহিদা বাড়ায় নতুন নতুন পরিবহন কোম্পানি এ ধরনের বাস নামাচ্ছে। প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকতে অনেক প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের প্রক্রিয়া এড়িয়ে দ্রুত সেবা চালু করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্লিপার বাসের সেবা পুরোপুরি বন্ধ করার চেয়ে এগুলোকে একটি নির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় আনা জরুরি। প্রতিটি বাসের কাঠামো ও নিরাপত্তা পরীক্ষা, অনুমোদন, ফিটনেস সনদ এবং নির্ধারিত যাত্রী ধারণক্ষমতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি চালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করতে হবে। অন্যথায় আরামদায়ক যাত্রার নামে অনুমোদনহীন স্লিপার বাসের সংখ্যা বাড়তে থাকলে একদিকে যেমন সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হবে, অন্যদিকে যাত্রীদের নিরাপত্তাও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে ৮২৯টি অনুমোদনহীন স্লিপার বাসের বিষয়ে দ্রুত কার্যকর নজরদারি ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশ স্লিপার এসি বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম বাবু বলেন, ২০১০ সাল থেকে দেশের মহাসড়কে স্লিপার বাস চলাচল করছে। বর্তমানে সারা দেশে প্রায় এক হাজার স্লিপার বাস চলাচল করছে এবং এ খাতে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে। চালক, হেলপার, সুপারভাইজারসহ লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান এ খাতের সঙ্গে জড়িত। দেশের পর্যটনকেন্দ্র ও দূরপাল্লার বিভিন্ন রুটে যাত্রীরা আরামদায়ক ও নিরাপদ ভ্রমণের জন্য স্লিপার বাস ব্যবহার করছেন উল্লেখ করে তৌহিদুল ইসলাম বাবু বলেন, মহাসড়কে স্লিপার বাসের দুর্ঘটনার হারও তুলনামূলক কম। তিনি অভিযোগ করেন, একটি সংঘবদ্ধ মহল ব্যবসায়িক স্বার্থে স্লিপার বাসের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে এবং প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তার করে অভিযান পরিচালনা করাচ্ছে। অথচ এসব বাসের টিকিট বিক্রি, ভ্যাট-ট্যাক্স ও অন্যান্য খাত থেকে সরকার নিয়মিত রাজস্ব পাচ্ছে। সমিতির এ সাধারণ সম্পাদক বলেন, স্লিপার বাসের বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টে একটি রিট বিচারাধীন রয়েছে। একইসঙ্গে বিষয়টি নিয়ে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়, বিআরটিএসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকেও স্লিপার বাসের নকশা ও নিরাপত্তা বিষয়ক মূল্যায়ন প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আদালতের রায় এবং সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের আগে হঠাৎ করে অভিযান চালিয়ে লাখ লাখ টাকা জরিমানা করা হচ্ছে, যা মালিকদের হয়রানির শামিল। স্লিপার বাস বন্ধের পরিবর্তে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, কোথাও কোনো ঘাটতি থাকলে সরকার গাইডলাইন দিক, আমরা তা মেনে চলব। কিন্তু হঠাৎ করে এই পরিবহনসেবা বন্ধ করে দিলে যাত্রীরা বিকল্প সেবা থেকে বঞ্চিত হবেন, সরকার রাজস্ব হারাবে এবং হাজার হাজার মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়বেন।